Logo
Logo
×

বিশ্লেষণ

জুলাই সনদ: নতুন অধ্যায়ের শুরু না অতীতের পুনরাবৃত্তি?

ডেস্ক রিপোর্ট

ডেস্ক রিপোর্ট

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৫, ১২:৩২ পিএম

জুলাই সনদ: নতুন অধ্যায়ের শুরু না অতীতের পুনরাবৃত্তি?

‘জুলাই সনদ সারা বিশ্বের কাছে এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে’—এই কথায়ই শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্য শুরু করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার মতে, এই সনদ শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের নিদর্শন নয়, বরং গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের ‘নতুন জন্ম’।

ড. ইউনূস বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের কারণে। এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান সেই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় অংশ।’ তিনি যারা এই পরিবর্তনের জন্য আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানান।

সনদ স্বাক্ষরের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই দিনটিকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেন। বলেন, ‘রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সব রাজনৈতিক দল এক হয়ে কাজ করতে পারে—আজকের দিন তার প্রমাণ।’

তবে সবাই একমত হয়নি। গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সনদে স্বাক্ষর করেনি, এমনকি অনুষ্ঠানে গিয়েও না। এনসিপির মতে, আইনি ভিত্তি পরিষ্কার নয়, সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ যথেষ্ট শক্ত নয়, এবং জাতীয় ঐক্যের নামে ‘কাগজে সই’ করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে—এই ভাবনার সঙ্গে তারা একমত নয়।

এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ‘সনদের বিষয়ে শহীদ পরিবার ও আহতদের মতামত নেওয়া হয়নি। তাদের ওপর পুলিশের হামলা হয়েছে। সরকার ও রাষ্ট্রের ভেতরের একটা অংশ এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এর দায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে এনসিপির ওপর চাপানো হচ্ছে।’

এদিকে চারটি বামপন্থী দল—সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ—জুলাই সনদের পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস ‘ভুলভাবে উপস্থাপন’ করা হয়েছে বলে দাবি করে সই করেনি। যদিও ঐক্যমত্য কমিশন পরে সেই অংশ সংশোধন করেছে।

গণফোরাম সই করেনি মূলত অনুলিপির চূড়ান্ত কপি না পাওয়ার কারণে। তারা জানিয়েছে, সংশোধন নিশ্চিত হলে পরে সই করতে প্রস্তুত।

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—এই সনদ কি সত্যিই ঐক্যের দলিল, নাকি নতুন এক বিভক্তির ইঙ্গিত?

বাস্তবায়নের প্রশ্ন

ঐক্যমত্য কমিশন বলছে, জুলাই সনদ ৮৪টি দফায় প্রস্তাবিত সংস্কারের খসড়া। এর অন্তত অর্ধেক সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্যে রয়েছে:

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ

নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সীমিতকরণ

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যেহেতু বাস্তবায়নের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা, রোডম্যাপ বা আইনগত কাঠামো এখনো প্রকাশ হয়নি, তাই আশঙ্কা থেকেই যায়—এটি যেন আরেকটি ‘টাস্কফোর্স রিপোর্ট’ না হয়ে ওঠে।

অতীতের শিক্ষা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন বহু সনদ হয়েছে—১৯৯০ সালের ‘তিন জোটের রূপরেখা’, ২০০৭ সালের রেগুলেটরি রিফর্মস কমিশন—যেগুলো শুরুতে বিস্তর আশা জাগিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি।

গণঅভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া এই সনদ যদি বাস্তব রূপ পায়, তবে এটি হতে পারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে যদি দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস, বিলম্ব ও আইনগত অস্পষ্টতা থেকেই যায়—তাহলে এই সনদও অতীতের মত একদিন ভুলে যাওয়া কাগজে পরিণত হতে পারে।


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন