Logo
Logo
×

বিশ্লেষণ

নির্বাচনের ছায়ায় সংখ্যালঘু সহিংসতা: দুই দশকের অভিজ্ঞতা ও আসন্ন ঝুঁকির সতর্কবার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:২১ পিএম

নির্বাচনের ছায়ায় সংখ্যালঘু সহিংসতা: দুই দশকের অভিজ্ঞতা ও আসন্ন ঝুঁকির সতর্কবার্তা

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্বাচনকালীন সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি দীর্ঘস্থায়ী ও কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। 

রাজনৈতিক ইতিহাস, ক্ষমতার পালাবদল এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে জাতীয় নির্বাচনের মতো সংকটপূর্ণ সময়ে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবেই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। 

বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি এই ঝুঁকিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। 

রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যখন চরমে পৌঁছায়, তখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে প্রায়শই কোনো না কোনো পক্ষের প্রতীকী সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, উচ্ছেদ, শারীরিক হামলা, ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় ভাঙচুর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেওয়া কিংবা জমি দখলের সহজ লক্ষ্য বানানো হয়।

এই কাঠামোগত পর্যালোচনাটি ২০০১ ও ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন এবং ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত একতরফা জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে। 

উপাত্ত সংগ্রহে দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের আর্কাইভ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটগ্রহণের আগের ১০ দিন এবং ভোটগ্রহণের পরের ১০ দিন সময়কাল বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। 

সহিংসতার ঘটনাগুলো শারীরিক আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, যৌন সহিংসতা এবং ভুক্তভোগী সম্প্রদায় অনুযায়ী শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলনায় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সহিংসতার ধরনে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। 

সহিংসতা এখন কেবল মাঠপর্যায়ের উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একটি অতিরিক্ত ঝুঁকির স্তর তৈরি করেছে। 

গুজব, পুরোনো ভিডিও ও আবেগপ্রবণ বর্ণনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয় বিরোধকে সাম্প্রদায়িক হুমকিতে রূপ দিচ্ছে। এতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার গুরুদায়িত্ব তৈরি হয়েছে।

গত দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্বাচনী সহিংসতার ভৌগোলিক চিত্র গতিশীল ও প্রেক্ষিতনির্ভর। চট্টগ্রাম ও রংপুর দীর্ঘ সময় ধরেই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। 

২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামে রাজনৈতিক ক্যাডারদের হামলা ও লুটপাটে বহু মানুষ গ্রামছাড়া হন। সাম্প্রতিক সময়ে মিরসরাই ও রাউজানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে একের পর এক অগ্নিসংযোগের ঘটনাও উদ্বেগজনক। 

একইভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দিনাজপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও কক্সবাজার নতুন করে উচ্চ ঝুঁকির এলাকায় পরিণত হয়েছে। 

লালমনিরহাটে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এবং কক্সবাজারে তৌহিদী জনতার হামলায় ঢাকাইয়া মেলা পণ্ড হওয়ার ঘটনা এই ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। 

বিপরীতে ভোলা, বরিশাল ও পটুয়াখালী পূর্ববর্তী নির্বাচনে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সেখানে তুলনামূলকভাবে ঝুঁকি কম দেখা গেছে।

এই ভৌগোলিক প্রবণতা বিশ্লেষণে দুটি প্রধান ঝুঁকিপ্রবণ করিডোর স্পষ্ট হয়। একটি উত্তরবঙ্গ করিডোর, যেখানে রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট যুক্ত। 

অন্যটি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় করিডোর, যা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে। এসব এলাকায় সংখ্যালঘুদের ঘনবসতি, ঐতিহাসিক প্রতিহিংসা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহিতার অভাবের কারণে সহিংসতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভূমি বিরোধ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এই ঝুঁকিকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা ঘটে। সে সময় ৭৮টি বড় ধরনের ঘটনার খবর পাওয়া যায়, যা দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। 

পরবর্তী সময়ে ঘটনার সংখ্যা ওঠানামা করলেও হামলার ধরন আরও লক্ষ্যভিত্তিক হয়েছে। সহিংসতার ৪২.৭ শতাংশ ছিল সরাসরি শারীরিক আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ড। প্রায় ২৯.৭ শতাংশ ঘটনায় প্রাণনাশের হুমকি, উচ্ছেদের আল্টিমেটাম ও জমি দখল দেখা গেছে। ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয় লক্ষ্য করে হামলার হার ছিল ২৩.৮ শতাংশ। যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ছিল ৩.৮ শতাংশ, যার মধ্যে ২০১৮ সালে সুবর্ণচরের ঘটনা একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ।

তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ভোটের দিনের চেয়ে নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়েই সহিংসতার ঘনত্ব বেশি। এই বাস্তবতায় আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। 

চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি জোরদার, সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ, অনলাইন গুজব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি, দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য ইমার্জেন্সি রেসপন্স ইউনিট গঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সবশেষে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু সুরক্ষা শুধু মানবাধিকারের প্রশ্ন নয়, এটি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মৌলিক পূর্বশর্ত।

সূত্র: সকল প্রাণের নিরাপত্তার প্রেস বিজ্ঞপ্তি

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন