Logo
Logo
×

বিশ্লেষণ

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

ভোট হয়ে গেল, এরপর কী?

Icon

সারাহ শামীম

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম

ভোট হয়ে গেল, এরপর কী?

বাংলাদেশে ঐতিহাসিক নির্বাচন শেষ হয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটাই ছিল প্রথম জাতীয় নির্বাচন।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, বিএনপি, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। 

হাসিনা সরকারের আমলে নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামী এবার তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করেছে। জাতীয় সংসদে তারা প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে এসেছে।

ছাত্র আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির নেতা নাহিদ ইসলাম নিজের আসনে জিতেছেন। তিনি নতুন সংসদের কনিষ্ঠ সদস্যদের একজন। এনসিপি এই নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোট করে লড়েছে।

আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। টানা ১৫ বছর কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে যান।

এই সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে ‘জুলাই চার্টার’ নিয়ে একটি জাতীয় গণভোটও হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯.৮৮ শতাংশ। বহু দশকের মধ্যে এটি সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের একটি বলে দাবি করা হচ্ছে।

খালেদা জিয়ার ছেলে, ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন। ২০০৮ সালে তিনি রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিযোগ তুলে দেশ ছাড়েন। তিনিই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন।

ফল জালিয়াতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এনসিপি ও বিএনপি অনিয়ম ও ফল কারচুপির অভিযোগ করেছে। তারা বলেছে, কিছু দল ‘নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর সুবিধা পাচ্ছে। তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো সীমিত।

জামায়াতও তাদের ফেসবুক বিবৃতিতে উদ্বেগ জানিয়েছে। তারা বলেছে, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা বিভিন্ন আসনে অল্প ব্যবধানে ও সন্দেহজনকভাবে হেরেছেন। ফল ঘোষণায় অসঙ্গতি ও গড়মিল ছিল। ভোটার উপস্থিতির হার প্রকাশে নির্বাচন কমিশনের অনীহাও প্রশ্ন তুলেছে। প্রশাসনের একটি অংশ বড় একটি দলের পক্ষে ঝুঁকেছে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে তারা। 

কে জিতলেন, কে হারলেন—এ নিয়েও আগ্রহ আছে। তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন। 

জামায়াত নেতা শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে জিতেছেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে জয় পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতের দেলওয়ার হোসেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল আল জাজিরাকে বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। তাদের লক্ষ্য থাকবে পরের নির্বাচনে জয়।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক বিএনপি সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা জয় পেয়েছেন।

ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৩টিতে বিএনপি জিতেছে। জামায়াত পেয়েছে ৪টি। তাদের মিত্র এনসিপি পেয়েছে ১টি।

সালাহউদ্দিন আহমেদ, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, লুৎফোজ্জামান বাবর, মির্জা আব্বাস, ফজলুর রহমান, রেজা কিবরিয়া ও ববি হাজ্জাজ—এই বিএনপি নেতাদের জয়ের খবরও স্থানীয় গণমাধ্যমে এসেছে।

২০২৪ সালের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই এনসিপির জন্ম। 

আসিফ নজরুল বলেন, ‘এনসিপি বড় সাফল্য না পেলেও, নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে গঠিত একটি দলের জন্য তাদের অর্জন ছোট নয়। যদি তারা নীতিনিষ্ঠ ও গঠনমূলক বিকল্প হিসেবে নিজেদের দাঁড় করাতে পারে, ভবিষ্যতে অবস্থান আরও শক্ত হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএনপির জয় অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল। নির্বাচনের আগে তারা বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতির মতো ইস্যুতে বড় বড় সমাবেশ করেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ঢেউয়েও তারা সক্রিয় ছিল।

২০২৫ সালের মে মাসে তারা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধেও দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে।

আসিফ নজরুল বলেন, ‘বিএনপির সারা দেশে শক্ত সমর্থনভিত্তি আছে। তাদের জয়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও শাসন অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা দলের গতি আরও বাড়িয়েছে।’

জুলাই চার্টার নিয়ে গণভোটেও ভোটাররা মত দিয়েছেন। সাদা ব্যালটে সংসদ নির্বাচন, আর গোলাপি ব্যালটে গণভোট হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৬০.২৬ শতাংশ ভোটার জুলাই চার্টারের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাত্র আন্দোলনের পর এই সনদ খসড়া করে। এতে সংবিধান সংশোধন, আইনি পরিবর্তন ও নতুন আইন প্রণয়নের রূপরেখা আছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা আইডিয়া বলছে, ৮০টির বেশি প্রস্তাব রয়েছে এতে। এর মধ্যে আছে নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুরক্ষা।

এতে ৩৫০ সদস্যের বর্তমান একক সংসদের পাশাপাশি ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবও আছে।

ডেইলি স্টার জানিয়েছে, গণনা করা ভোটের ৭২.৯ শতাংশ চার্টারের পক্ষে, আর ২৭.১ শতাংশ বিপক্ষে।

বিএনপি বলেছে, তারা চার্টার বাস্তবায়নে সমর্থন দেবে। তবে উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ আছে। বিএনপি চায় সংসদীয় আসনের অনুপাতে। জামায়াত ও এনসিপি চায় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে। এই বিরোধ মেটানোই বড় চ্যালেঞ্জ।

এখন সামনে কী?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনি বলেছেন, বিএনপির জয় ‘গণতান্ত্রিক শক্তির বিজয়’।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। এখন চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

আসিফ নজরুলও আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘প্রায় ১৬ বছর ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে একদলীয় সংসদ চালিয়েছে আওয়ামী লীগ। এখন সেই দল ছাড়া সংসদ চলবে। এক অর্থে এটি কবিতার মতো ন্যায়বিচার।’

তার মতে, নতুন সংসদে মতের বৈচিত্র্য ও প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি থাকবে। এতে সংসদের কার্যকারিতা বাড়বে। আওয়ামী লীগের উচিত আত্মসমালোচনা করা, অনুতাপ প্রকাশ করা এবং অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়া।

গত বছরের নভেম্বরে হাসিনাকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আন্দোলন দমনে প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত ও ২০,০০০-এর বেশি আহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণ চাইলেও ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এতে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। 

সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে সবকিছু সুষ্ঠু রাখার বিষয়ে।


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন