আল জাজিরার বিশ্লেষণ
মোদির ইসরায়েল সফর: কী থাকছে আলোচনায়, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
সারাহ শামীম
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৪১ পিএম
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বুধবার থেকে ইসরায়েল সফর করছেন। এই সফর দুই দিনের।
ইসরায়েলে তার প্রথম সফর ছিল ২০১৭ সালে। তখন তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী, যিনি ইসরায়েল সফর করেন।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল যেসব দেশ, ভারত ছিল তাদের একটি। বহু বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের নীতির কঠোর সমালোচক ছিল ভারত। ১৯৯২ সালে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তবে ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক দ্রুত গভীর হয়।
মোদি স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে তেল আবিবের বাইরে বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখানে তাকে স্বাগত জানান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। ২০১৭ সালেও তিনি একইভাবে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। এরপর দুই নেতা বৈঠকে বসেন।
বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে মোদি জেরুজালেমে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে ভাষণ দেন। রাতে তিনি তেল আবিবে ফেরেন।
২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে তিনি হলোকাস্টের স্মৃতিসৌধ ইয়াদ ভাশেম জাদুঘর পরিদর্শন করবেন। পরে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এরপর মোদি ও নেতানিয়াহু আবার বৈঠক করবেন এবং দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন চুক্তি স্বাক্ষরের তদারকি করবেন। বিকেলে মোদি ইসরায়েল ত্যাগ করবেন।
দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সফরের লক্ষ্য কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা।
ইসরায়েলে ভারতের রাষ্ট্রদূত জেপি সিং অল ইন্ডিয়া রেডিওকে বলেন, ‘আমরা প্রতিযোগিতা করি না, বরং একে অপরকে পরিপূরক করি। ইসরায়েল উদ্ভাবন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে খুবই এগিয়ে। তাই এআই, সাইবার নিরাপত্তা ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হবে।’
গত বছরের সেপ্টেম্বরে দুই দেশ নতুন দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি সই করে, যা ১৯৯৬ সালের চুক্তির জায়গা নেয়। এর লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের ‘নিশ্চয়তা ও সুরক্ষা’ দেওয়া। বিদ্যমান নিরাপত্তা চুক্তিও হালনাগাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ভারতে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজার বলেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এখন গতি পেয়েছে। আমরা দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তি সই করেছি এবং আশা করছি এ বছর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও সই হবে।’ তিনি জানান, ইসরায়েল চায় ভারতীয় অবকাঠামো কোম্পানিগুলো সেখানে বিনিয়োগ করুক। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তা চুক্তি হালনাগাদ করে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর করব।’
নেতানিয়াহু এক পোস্টে লেখেন, ‘আমরা উদ্ভাবন, নিরাপত্তা ও অভিন্ন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির অংশীদার। একসঙ্গে আমরা স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির পক্ষে থাকা দেশগুলোর একটি অক্ষ গড়ে তুলছি।’ তিনি আরও লেখেন, ‘এআই থেকে আঞ্চলিক সহযোগিতা—আমাদের অংশীদারত্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে।’
ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের ইতিহাস জটিল। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে ভারত ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছিল। ১৯১৭ সালে যুক্তরাজ্য বালফোর ঘোষণা দেয়, যেখানে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য আবাসভূমির প্রতিশ্রুতি ছিল। ভারত তখন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ছিল এবং এ ঘোষণার বিরোধিতা করেছিল।
মহাত্মা গান্ধী ১৯৩৮ সালের ২৬ নভেম্বর তার সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘হরিজন’-এ লেখেন, ‘ফিলিস্তিন আরবদেরই, যেমন ইংল্যান্ড ইংরেজদের, বা ফ্রান্স ফরাসিদের।’
১৯৪৯ সালে ভারত জাতিসংঘে ইসরায়েলের সদস্যপদের বিরোধিতা করে। ১৯৫০ সালে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও ১৯৯২ সালে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এরপর দুই দশকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়তে থাকে।
বর্তমানে চীনের পর এশিয়ায় ইসরায়েলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ভারত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সালে বাণিজ্য ছিল ২০০ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
ভারত ইসরায়েলে মুক্তা, মূল্যবান পাথর, অটোমোটিভ ডিজেল, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম রপ্তানি করে। ইসরায়েল থেকে আমদানি করে পেট্রোলিয়াম, রাসায়নিক যন্ত্র ও পরিবহন সরঞ্জাম।
মিডল ইস্ট আইয়ের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক এবং ‘হোস্টাইল হোমল্যান্ডস: দ্য নিউ অ্যালায়েন্স বিটুইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইসরায়েল’-এর লেখক আজাদ এসা বলেন, গত এক দশকে সম্পর্ক অনেক দূর এগিয়েছে। তিনি বলেন, ‘মোদি আসার আগে অংশীদারত্ব ছিল, তবে সীমিত। এখন নয়াদিল্লি ইসরায়েলের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পশ্চিমা মিত্রে পরিণত হয়েছে। একে এখন বিশেষ সম্পর্ক বলা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই সফর নেতানিয়াহুর জন্য সুযোগ, যাতে তিনি দেখাতে পারেন যে তিনি গ্লোবাল সাউথে সম্মানিত নেতা।’
মোদি আমলে ভারত ইসরায়েলের বড় অস্ত্র ক্রেতা হয়েছে। ২০২৪ সালে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের সময় ভারতীয় অস্ত্র কোম্পানিগুলো রকেট ও বিস্ফোরক সরবরাহ করেছে বলে এক তদন্তে উঠে আসে।
এসা বলেন, ‘এই জোট শুধু অস্ত্র বা বাণিজ্য নয়। এটি জাতীয়তাবাদ ও নিরাপত্তার ভাষা ব্যবহার করে কঠোর নীতিকে স্বাভাবিক করার গল্পও।’
এই সফর এমন সময়ে হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। সম্প্রতি ভারত অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সম্প্রসারণের নিন্দা জানানো ১০০টির বেশি দেশের বিবৃতিতে সই করেছে।
নেতানিয়াহু ‘হেক্সাগন’ নামে একটি আঞ্চলিক জোট গঠনের কথা বলেছেন, যেখানে ইসরায়েল, ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাসসহ কয়েকটি দেশ থাকবে। তবে ভারতসহ সংশ্লিষ্ট কোনো দেশ আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেয়নি।
এসা বলেন, ‘নেতানিয়াহুর নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পরোয়ানা থাকার পরও বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের নেতার সফর অনেকের কাছে তার নীতির প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখা হবে।’
এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনাও বেড়েছে। ২০১৬ সালে মোদি ইরান সফরে গিয়ে চাবাহার বন্দর উন্নয়নে চুক্তি করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর ভারত সেখান থেকে সরে আসছে বলে খবর রয়েছে।
২০২৫ সালের জুনে ইরানের ওপর ইসরায়েলের হামলার নিন্দায় এসসিওর বিবৃতিতে ভারত সই করেনি। তবে পরে ব্রিকস জোটের বিবৃতিতে সই করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ইরানের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তি না হলে হামলার কথা তিনি ভাবছেন। ইরান বলেছে, তারা কূটনৈতিক সমাধান চায়, তবে আক্রমণ হলে আত্মরক্ষা করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত বাড়লে ইসরায়েল সামনের সারিতে থাকবে। এমন প্রেক্ষাপটে মোদির এই সফর কেবল কূটনৈতিক নয়, ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।
