Logo
Logo
×

বিশ্লেষণ

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

ছয় আসন, বড় লক্ষ্য: ছাত্র নেতৃত্বে গড়া এনসিপির সামনে এখন কোন পথ?

Icon

মাসুম বিল্লাহ

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:২৬ পিএম

ছয় আসন, বড় লক্ষ্য: ছাত্র নেতৃত্বে গড়া এনসিপির সামনে এখন কোন পথ?

রুহুল আমিন অনেক দিন ধরেই দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে হতাশ ছিলেন। তার মনে হতো, একই চক্র ঘুরে ফিরে ক্ষমতায় আসে। তিনি অপেক্ষায় ছিলেন এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় শক্তির, যাকে নিজের দল বলতে পারবেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রনেতারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিলে দেশজুড়ে নতুন আশার জন্ম হয়। সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ছাত্ররা যখন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ বা এনসিপি গঠন করে, তখন ত্রিশের কোঠায় থাকা আমিন মনে করেন, অবশেষে তিনি এমন একটি দল পেলেন, যাকে ভোট দেওয়া যায়। যাকে নিজের দল বলা যায়।

দলটি আত্মপ্রকাশের সময় দাবি করেছিল, তাদের পেছনে রয়েছে ব্যাপক জনসমর্থন। তারা ভবিষ্যতে সরকার গঠনের ইঙ্গিতও দিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। আন্দোলনের সময় ছাত্রনেতারা যে জনসমর্থন পেয়েছিলেন, তা সাংগঠনিক শক্তিতে রূপ দিতে পারেনি এনসিপি। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, দলটির সমর্থন এক অঙ্কের নিচের দিকে ঘোরাফেরা করছে।

শেষ পর্যন্ত এনসিপি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে। তারা ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৩০টিতে নির্বাচন করে এবং জেতে ৬টি আসন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল ব্যবধানে ২১২ আসন পায়। জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট পায় ৭৭টি আসন।

তবু আমিনের মন ভাঙেনি। কুষ্টিয়া জেলা থেকে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘নতুন দল হিসেবে আমরা ভালো করেছি। আমাদের পথচলা তো সবে শুরু। আগামী কয়েকটি নির্বাচনী চক্রে এনসিপিই হবে নতুন বড় শক্তি।’

২০২৪ সালের আন্দোলনে যেসব নেতা সামনে এসেছিলেন, তাদের কয়েকজন এখন সংসদ সদস্য। সমর্থকদের কাছে ৬টি আসনই বড় সাফল্য। সমালোচকদের কাছে এটি প্রমাণ করে, আন্দোলন থেকে মূলধারার রাজনীতিতে আসা কত কঠিন।

দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ, যিনি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ছিলেন, ফলাফলকে উৎসাহব্যঞ্জক বলেছেন। তার ভাষায়, ‘মাত্র ১১ মাসের একটি দলের জন্য এটি খুব ভালো ফল। অবশ্যই আরও ভালো হতে পারত। আমরা আরও আশা করেছিলাম। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা সন্তুষ্ট।’

তিনি দাবি করেন, ভোট গণনায় অনিয়মের কারণে আরও দুই বা তিনটি আসন তারা অল্প ব্যবধানে হারিয়েছে। প্রমাণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, নির্বাচন চলাকালেই দল তাদের উদ্বেগ জানিয়েছে।

মাহমুদ স্বীকার করেন, নির্বাচনে টিকে থাকতে হলে আপস করতে হয়েছে। শুরুতে তারা এককভাবে নির্বাচন করতে চেয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক কাঠামো বিবেচনায় প্রতিনিধিত্ব ও টিকে থাকার জন্য জোটে যেতে হয়েছে। এই জামায়াত জোটই এখন এনসিপির ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জামায়াত, যা দেশের সবচেয়ে বড় ধর্মভিত্তিক দল, দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী আইন সমর্থন করে এসেছে এবং নারীর অধিকার বিষয়ে রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান মেনে চলার অঙ্গীকার করেছে। এমনকি এবার প্রথমবারের মতো এক হিন্দু প্রার্থীও দিয়েছে। তবু এই জোট ঘোষণার পর এনসিপির ভেতরে ভাঙন দেখা দেয়।

জোট ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যে ডজনখানেক জ্যেষ্ঠ নেতা পদত্যাগ করেন। তাদের মতে, জামায়াতের সঙ্গে জোট এনসিপির আদর্শ ও ২০২৪ সালের আন্দোলনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে দলের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

মাহমুদ এসব আশঙ্কা উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ছায়া রাজনীতি করছি না। আমাদের বক্তব্য জামায়াতের মতো নয়।’ তার ভাষায়, এটি নির্বাচনী জোট, রাজনৈতিক একীভবন নয়।

এনসিপি জানিয়েছে, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তারা এককভাবে লড়তে চায়। তবে জামায়াতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সমঝোতার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়নি।

বান্দরবান থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে হেরে যাওয়া এনসিপি নেতা এস এম সুজা উদ্দিন বলেন, তখন তাদের বিকল্প খুব সীমিত ছিল। তার মতে, জামায়াতের সঙ্গে জোট ছিল রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নেওয়া। তিনি বলেন, দেশের সব দলে নেতৃত্ব সংকট আছে। তরুণ রাজনীতিকরা হতাশ। মানুষ পরিবর্তন চায়। ‘এনসিপিই আশা, এনসিপিই বিকল্প’— এমনটাই তার বিশ্বাস।

তবে সবাই একমত নন। গত বছর পদত্যাগ করা সাবেক নেতা অনিক রায় মনে করেন, এই জোট কাঠামোগতভাবে এনসিপিকে জামায়াতের সঙ্গে বেঁধে ফেলেছে। তার মতে, এখন জোট থেকে বের হওয়া বাস্তবে কঠিন। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনই হবে আসল পরীক্ষা। আবার যদি জামায়াতের সঙ্গে যায়, তাহলে তাদের দিক স্পষ্ট হবে।’

তিনি প্রশ্ন তোলেন দলের আদর্শ নিয়েও। ‘তারা যদি নিজেদের মধ্যপন্থী বলে, তাহলে সেটা কি মধ্য-ডান, না মধ্য-বাম?’ তার মতে, বাংলাদেশে এসব পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এনসিপি এখনো পরিষ্কার অবস্থান দেয়নি। জামায়াতের সমর্থন ছাড়া দলটি হয়তো কোনো আসনই পেত না বলেও তিনি মনে করেন।

মাহমুদ অবশ্য দাবি করেন, তৃণমূল সংগঠনে তাদের শক্তি নিয়ে ভুল ধারণা রয়েছে। তার মতে, জেলা ভেদে বাস্তবতা আলাদা। কিছু আসনে স্থানীয় ইস্যু ও দীর্ঘমেয়াদি কমিউনিটি কাজের কারণে তারা প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করেছে। বড় দলগুলোর প্রচলিত প্রভাবের বাইরে গিয়ে এই মডেল বিস্তারের কথাও বলেন তিনি।

২০২৪ সালের আন্দোলন থেকেই এনসিপির রাজনৈতিক পুঁজি এসেছে। তখন নাহিদ ইসলাম ও মাহমুদের মতো নেতারা দল-মতের ঊর্ধ্বে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন। আন্দোলনের অন্যতম মুখ নাহিদ ইসলাম এখন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি ঢাকার একটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং বিরোধী জোটের চিফ হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মাহমুদের ভাষায়, আন্দোলনের সময়ের ঐক্য আর দলীয় রাজনীতি এক নয়। দল গঠনের পর সংঘাত অনিবার্য। ২০২৪ সালের আন্দোলনে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের মানুষ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে এক হয়েছিল। কিন্তু দল গঠনের পর এনসিপি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলি মনে করেন, এনসিপি এখনো স্বতন্ত্র তৃতীয় শক্তি হওয়ার স্পষ্ট ইচ্ছা দেখায়নি। তার মতে, নির্বাচনের পর দলটি জামায়াতের ছায়াতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। তিনি বলেন, এটি যেন নতুন মুখের একটি প্রচলিত দল।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, সংসদে প্রবেশ ইতিবাচক সূচনা। তবে সংগঠনগত দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে শক্ত, স্বাধীন তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা সীমিত। তবু ২০২৪ সালের আবেগ এখনো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। দিকনির্দেশ স্পষ্ট করতে পারলে কিছু সম্ভাবনা রয়ে গেছে।

এই মুহূর্তে এনসিপি এক অদ্ভুত জায়গায় দাঁড়িয়ে। তারা সংসদে আছে। একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রতীক হিসেবেও পরিচিত। আবার গভীর মেরুকৃত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জোট রাজনীতির হিসাবও মেলাতে হচ্ছে।

মাহমুদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল বড় পরীক্ষা। তার দাবি, এনসিপি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

কিন্তু ৬টি আসন কি সত্যিই তৃতীয় শক্তিতে রূপ নেবে? বিশ্লেষকদের মতে, সেটি নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। দলটি কি জোটের গণ্ডি পেরিয়ে তৃণমূলে শক্ত সংগঠন গড়তে পারবে? আদর্শিক অবস্থান পরিষ্কার করতে পারবে?

রুহুল আমিন এখনো আশাবাদী। তার কাছে ৬টি আসন শেষ কথা নয়। বরং এটি প্রমাণ, রাজপথের ছাত্র আন্দোলন সংসদ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তার দৃঢ় কথা, ‘আমরা রাস্তায় শুরু করেছি। এখন সংসদে। আমরা আর পেছনে ফিরব না।’


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন