বিবিসির প্রতিবেদন
গেম প্ল্যান কী?: ইরানযুদ্ধ চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষায় নতুন অস্বস্তি
বিবিসি
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ০২:২৯ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখনো সরাসরি বড় ধাক্কা দেয়নি চীনকে। তবে এর ঢেউ ইতিমধ্যে দেশটির অর্থনীতি ও কৌশলগত হিসাবকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্বল্পমেয়াদে চীনের কাছে কয়েক মাসের জন্য যথেষ্ট তেলের মজুত রয়েছে। প্রয়োজনে পরে তারা প্রতিবেশী রাশিয়ার দিকেও ঝুঁকতে পারে। কিন্তু বেইজিং এখন দীর্ঘমেয়াদি হিসাব কষছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বড় বিনিয়োগ আছে, আর বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজেদের ভূমিকা নিয়েও তাদের বড় পরিকল্পনা রয়েছে।
এই সময়েই বেইজিংয়ে কমিউনিস্ট পার্টির হাজারো প্রতিনিধি বৈঠকে বসেছেন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে সেখানে আলোচনা চলছে। কারণ চীন এখন কম ভোগব্যয়, দীর্ঘস্থায়ী সম্পত্তি খাতের সংকট এবং বিপুল স্থানীয় ঋণের চাপের সঙ্গে লড়ছে।
বৃহস্পতিবার চীন তাদের বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়েছে। ১৯৯১ সালের পর এটিই সবচেয়ে কম লক্ষ্য। একই সঙ্গে বেইজিং উচ্চপ্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দ্রুত উন্নয়ন চালিয়ে যাচ্ছে।
এক সময় চীন ভেবেছিল রপ্তানি বাড়িয়ে তারা অর্থনৈতিক চাপ কাটিয়ে উঠবে। কিন্তু গত এক বছর ধরে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িত। এখন আবার মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারণ এই অঞ্চল দিয়ে চীনের গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ যায়, আবার এখান থেকেই তারা বিপুল জ্বালানি পায়।
যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয় এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত থাকে, তাহলে চীনের জন্য সমস্যা বাড়বে।
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ফিলিপ শেটলার-জোনস বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময় অস্থিরতা থাকলে চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অন্য অঞ্চলও প্রভাবিত হবে।’ তিনি উদাহরণ দেন আফ্রিকার অর্থনীতির। উপসাগরীয় দেশগুলোর বড় বিনিয়োগ সেখানে প্রবাহিত হয়। যদি সেই অর্থের প্রবাহ কমে যায়, তাহলে অস্থিরতা বাড়তে পারে এবং এতে চীনের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক কেরি ব্রাউন বলেন, চীন এখন অন্য অনেক দেশের মতোই ভাবছে—এই যুদ্ধের পরিকল্পনা আসলে কী। তার ভাষায়, ‘হয়তো সবাই ভাবছে, যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চয়ই কোনো পরিকল্পনা ছাড়া এতে যায়নি। আবার একই সঙ্গে তারা হয়তো এটাও ভাবছে, যদি সত্যিই কোনো পরিকল্পনা না থাকে?’
তিনি বলেন, চীন এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চায় না। কিন্তু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উপেক্ষাও করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক দীর্ঘদিন ধরেই ইরানকে চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে দেখেছেন। দুই দেশের সম্পর্ক সত্যিই উষ্ণ ছিল। ১৯৮৯ সালে তেহরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি বেইজিং সফর করেছিলেন। সে সময় চীনের প্রেসিডেন্ট ইয়াং শাংকুনের সঙ্গে তার ছবি তোলা হয়।
২০১৬ সালে শি জিনপিং তেহরান সফর করলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। পরে ২০২১ সালে তারা ২৫ বছরের একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে। ওই চুক্তিতে চীন ২৫ বছরে ইরানে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। বিনিময়ে ইরান তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখবে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলেন, প্রতিশ্রুত অর্থের সামান্য অংশই ইরানে পৌঁছেছে। কিন্তু তেল সরবরাহ বন্ধ হয়নি।
সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীন প্রতিদিন প্রায় ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। এটি চীনের মোট তেল আমদানির প্রায় ১২ শতাংশ। এসব তেলের অনেক চালান মালয়েশিয়ার নামে পুনরায় লেবেল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ায় ভাসমান গুদামে ইরানের ৪ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল রয়েছে। এর বাইরে দালিয়ান ও ঝৌশান বন্দরে চীনা গুদামেও আরও তেল মজুত আছে, যেখানে ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি ট্যাংক ভাড়া নিয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে অস্ত্র সহযোগিতার অভিযোগও উঠেছে। চীন অবশ্য তেহরানকে জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলেছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে চীন প্রকৌশলী প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রাংশ সরবরাহের মাধ্যমে সহায়তা দিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ইরানে বিক্ষোভ দমনেও চীনা নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীন ও ইরানের সম্পর্ক মূলত বাস্তব স্বার্থভিত্তিক। কেরি ব্রাউন বলেন, ‘আদর্শ বা সংস্কৃতিগত কারণে চীনের ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার কোনো বড় কারণ নেই।’ তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে বিরক্ত রাখার একটি উপায় হিসেবেও কখনো কখনো ইরানকে ব্যবহার করেছে চীন।
এই সম্পর্ক তাই খুব গভীর নয়।
সংঘাত বাড়লেও বেইজিং নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে। চীন যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। একটি সার্বভৌম দেশের নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা করা এবং শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা আরও অগ্রহণযোগ্য।’
তবু বাস্তবতা হলো, ভেনেজুয়েলা ও এখন ইরানের ঘটনায় চীনের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। বেইজিং অনেক সময় ঘটনাপ্রবাহের বাইরে পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় থেকে গেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, অর্থনৈতিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও চীন এখনো সামরিকভাবে সেই মাত্রার বৈশ্বিক শক্তি নয়।
এই অবস্থায় শি জিনপিং নিজেকে স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। অনেক চীনা বিশ্লেষকের মতে, এভাবে তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত নেতৃত্বের বিপরীতে নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে চায়।
একই সঙ্গে বেইজিং কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়াচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইতিমধ্যে ওমান ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে একজন বিশেষ দূত পাঠানোর কথাও জানিয়েছে চীন।
মাসের শেষ দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করলেও বেইজিং সরাসরি ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, এই বৈঠক চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ তাইওয়ানসহ অন্য সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, সে বিষয়ে ধারণা পেতে চায় বেইজিং।
এই যুদ্ধ নিয়ে চীনের ভেতরে আরেক ধরনের আলোচনাও চলছে। কেউ কেউ এটিকে সুযোগ হিসেবে দেখছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধপ্রবণ শক্তি হিসেবে তুলে ধরা যায়।
তবে অধ্যাপক কেরি ব্রাউনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি খুব অস্থির ও অনির্দেশ্য আচরণ করে, সেটিও চীনের জন্য স্বস্তির বিষয় নয়। তার কথায়, ‘চীন হয়তো যুক্তরাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বিশ্ব চায় না। কিন্তু তারা এমন এক বিশ্বও চায় না, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র খুব অস্থিতিশীল এক শক্তি হয়ে ওঠে।’
