নরসিংদীতে তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৫, হোতা এখনো পলাতক
নরসিংদী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম
গ্রেপ্তারকৃতদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
নরসিংদীর মাধবদীতে কিশোরীকে ধর্ষণ ও পরিকল্পিতভাবে হত্যার ঘটনায় এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন ঘটনার মূল হোতা নূর মোহাম্মদ ওরফে নুরা। ঘটনার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পার হলেও নুরাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এদিকে দুই ধর্ষক ও ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগে সালিশ বৈঠকের বিচারক ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ানসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে মাধবদীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নুরা পেশায় একজন রিকশাচালক।
অভিযোগ রয়েছে, ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় বাবার হাত থেকে অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নিয়ে কিশোরী মেয়েকে পুনরায় ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ সরিষা ক্ষেতে ফেলে দেওয়া হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- মহিসাষুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও মহিসাষুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি ও মাধবদী কোতয়ালীরচর নাজির দেওয়ানের ছেলে আহাম্মদ আলী মেম্বার ওরফে আহাম্মদ দেওয়ান (৬৫)। আহাম্মদ আলীর ছেলে মো. ইমরান দেওয়ান (৩২), হোসেন বাজার এলাকার মৃত মজিবুরে ছেলে গাফ্ফার (৩৪)। ধর্ষক নুরার চাচাতো ভাই ও একই এলাকার মৃত সাহাবুদ্দিনের ছেলে এবাদুল্লাহ (৪০) ও মো. আজগর আলীর ছেলে মো. আইয়ুব (৩০)।
এদিকে কিশোরীকে ধর্ষণ ও ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে পরিকল্পিতভাবে হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ জেলাজুড়ে চাঞ্চলের সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক।
এদিকে, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ ও ধর্ষকসহ সকলকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও নরসিংদী সদর আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন।
তিনি বলেন, ধর্ষক ও হত্যাকারীসহ সকল অপরাধীদের জন্য আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। অপরাধী যে দলেরই হোক, তাদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইতোমধ্যেই ধর্ষক নুরাসহ সকল অপরাধীদের গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মহিষাসুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ান এর আগে বিগত সময় অওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
পুলিশ, নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা জানায়, নিহতের বাবা আশরাফ হোসেন শেরপুরের বাসিন্দা। মাধবদী এলাকায় একটি ট্রেক্সটাইলে কাজ করতেন। সম্প্রতি নিহত কিশোরীর মা ফাহিমা বেগমকে বিয়ে করেন। স্ত্রী, সৎ কন্যা ও ছেলেসহ মাধবদীর বিলপাড় এলাকায় ভাড়ায় বসবাস করতেন। গত ১৫ দিন আগে স্থানীয় বখাটে নুরার নেতৃত্বে ৫/৬ জনের একটি দল এলাকা থেকে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। পরে ধর্ষণের পর বিচার চেয়ে নিহতের পরিবার মহিসাষুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আহাম্মদ আলী মেম্বার ওরফে আহাম্মদ দেওয়ান এর দ্বারস্থ হয়। সেখানে ধর্ষক ও তাদের সহকর্মীরা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে রফাদফার চেষ্টা করেন। ওই সময় রফদফা না হওয়ায় ধর্ষিতা নিহতের পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন আহাম্মদ আলী মেম্বার।
এরপর গেল বুধবার রাতে বাবা আশরাফ হোসেন তার কাজ শেষ মেয়েকে নিয়ে তার খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে বড়ইতলা এলাকায় পৌঁছলে নুরার নেতৃত্বে আরও ৫ জন তাদের গতিরোধ করেন। ওই সময় নুরা নিহতের বাবাকে ছুরির মুখে জিম্মি করে ফেলে। পরে তার কাছ থেকে মেয়েটিকে জোরপূর্বক তোলে নিয়ে যায়। পরে পরিবারের লোকজনসহ বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুজির পর না পেয়ে বাড়ি ফিরে যায়। বৃহস্পতিবার দুপুরে একই এলাকার একটি সরিষাক্ষেত থেকে গলায় ওড়না পেঁচানো মরদেহটি দেখতে পায় স্থানীয়রা। পরে মাধবদী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। আজ শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে নিহত কিশোরীর মরদেহ মাধবদী স্থানীয় একটি কবর স্থানে দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় নুরাকসহ ৯ জনকে আসামি করে মাধবদী থানায় মামলা দায়ের করেন নিহতের মা ফাহিমা বেগম। এ ঘটনায় পুলিশ বিএনপি নেতাসহ ৫ জনকে আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালতের বিচারক আগামী রবিবার শুনানির দিন ধার্য করেন। পরে গ্রেপ্তারকৃতদের কারাগারে পাঠানো হয়।
চঞ্চল্যকর এই ঘটনায় ঢাকা থেকে ঘটনাস্থলে ছুটে এসেছেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক ও বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও নরসিংদী সদর আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন।
নিহত মেয়ের বাবা মো. আশরাফ বলেন, নুরার নেতৃত্বে ৫/৬ জন লোক আমাকে ছুরির মুখে জিম্মি করে আমার মেয়েকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে রাতে আর পাইনি। সকালে মরদেহ পাই। আমার সন্তানকে যারা হত্যা করেছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন জানিয়েছেন, ধর্ষণের ঘটনায় ৯ জনকে আসামি করে মামলা দায়েরের পর মোট ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক জানিয়েছেন, ১০ ফ্রেব্রুয়ারি মেয়েটিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবার তখন পুলিশের কাছে আসেনি। থানায় আসলে এ ঘটনাটা ঘটতো না। তবে হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার সাথে সাথে পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে মাঠে নামে। দুই ধর্ষকসহ মোট ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মূল অভিযুক্ত নুরাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের কয়েকটি টিম কাজ করছে। স্বল্প সময়ে মধ্যেই সব আসামিকে আইনের আওতায় আনা হবে।
