Logo
Logo
×

সারাদেশ

কুড়িগ্রামে এসিল্যান্ডের গোপন নিলাম: ২১ টির বদলে কাটা হয়েছে ২৮টি গাছ

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩৩ পিএম

কুড়িগ্রামে এসিল্যান্ডের গোপন নিলাম: ২১ টির বদলে কাটা হয়েছে ২৮টি গাছ

প্রকাশ্য নিলাম আহ্বান করেও গোপনে ও বেনামে সরকারি গাছ কাটার নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে।  নিলামের নামে অতিরিক্ত সরকারি গাছ বিক্রির অভিযোগও পাওয়া গেছে।  ঘটনাটি ঘটেছে সম্প্রতি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিস চত্বরে।

সর্বোচ্চ দরদাতাই জানেন না কবে, কোথায় নিলাম হয়েছে

অভিযোগ উঠেছে, আর্থিক সুবিধা নিয়ে পছন্দের ব্যক্তির কাছে নামমাত্র মূল্যে সরকারি গাছ বিক্রি করতেই এই গোপন নিলামের আয়োজন করা হয়েছে। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত নুর আলম নিজেও জানেন না কবে এবং কোথায় নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তিনি নিলামে উপস্থিত ছিলেন না বলেও জানিয়েছেন।

সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত নুর আলম বলেন, “আমি জানি না কবে, কোথায় নিলাম হয়েছে। আমি উপস্থিত ছিলাম না। শুনেছি, আমার নামে আমার মামা নিলামে অংশ নিয়েছিলেন।”

নিলাম বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা গেছে, কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নতুন ভবন, পার্কিং ও রাস্তা নির্মাণের জন্য অফিস চত্বরে থাকা ১৭টি মেহগনি ও ১টি কাঁঠাল গাছসহ ছোট-বড় মোট ২১টি গাছ প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে কেটে অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়। এ নিয়ে গত ৫ মার্চ প্রকাশ্য নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে গাছ নিলাম কমিটি। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কমিটির সভাপতি এবং এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম কমিটির সদস্য সচিব।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ১৫ মার্চ কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিস চত্বরে প্রকাশ্য নিলাম ডাকের মাধ্যমে এসব গাছ বিক্রি করা হবে। ২১টি গাছের নিলাম ডাক মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ১ হাজার ৪১০ টাকা। তবে নির্ধারিত তারিখে ইউনিয়ন ভূমি অফিস চত্বরে গিয়ে আগ্রহীরা কোনো নিলামের আয়োজন দেখতে পাননি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোনো ঘোষণা ছাড়াই গোপনে নিজ কার্যালয় সদর উপজেলা ভূমি অফিসে বেনামে নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম। মাত্র তিনজন ব্যক্তিকে উপস্থিত ও নিলামে অংশগ্রহণকারী দেখিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার টাকায় নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন দেখানো হয়।

২১টি নয়, কাটা হয়েছে ২৮টি গাছ

এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিলামে ২১টি গাছ বিক্রি করা হলেও ঈদের ছুটির সুযোগ নিয়ে ২৮টি গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত এসব গাছের জন্য বাড়তি সুবিধা নিয়েছেন নিলাম সংশ্লিষ্টরা। গাছ কাটার সময় ভূমি অফিসের কোনো কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন না। ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মঞ্জুরুল ইসলাম গাছ কাটার সময় উপস্থিত না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

অতিরিক্ত গাছ কাটার কথা স্বীকার করে সদর উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জুল জালাল বলেন, “বন বিভাগ ২১টি গাছ চিহ্নিত করলেও লে-আউটের জন্য ২ থেকে ১টি গাছ বেশি কাটা হয়েছে। তবে তা এসিল্যান্ড স্যারের অনুমতি সাপেক্ষে।”

তদন্তের দাবি

স্থানীয় বাসিন্দা সাদেকুল ইসলাম মিলন বলেন, “বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ্য নিলাম হওয়ার কথা ছিল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে, কিন্তু গোপনে নিলাম হয়েছে উপজেলা ভূমি অফিসে। এটা সম্পূর্ণ অনিয়ম ও দুর্নীতি। সরকারি রেটের বাইরে অতিরিক্ত টাকা লেনদেন হয়েছে। আমরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছি।”

আশরাফুল হক বলেন, “তিন লাখাধিক টাকা মূল্যের গাছ গোপনে নামমাত্র মূল্যে নিলাম করা হয়েছে। নিলাম ডাকা হলো এক জায়গায়, আর সম্পন্ন হলো অন্য জায়গায়। গাছও কাটা হয়েছে বেশি।”

কাঁঠালবাড়ী বাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল হক বলেন, “এসিল্যান্ড গোপনে নিজ অফিসে নিলাম করেছেন। নিলামে অংশ নিতে আগ্রহীরা কিছুই জানতে পারেননি। ২১টি গাছের নিলাম ডেকে ২৮টি গাছ বিক্রি করা হয়েছে। এত বড় দুর্নীতি মেনে নেওয়া যায় না। তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তি চাই।”

অভিযোগ অস্বীকার করে এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম বলেন, “নিলাম প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যারা নিলামে অংশ নিয়েছেন, তাদের আমাদের স্টাফরা সঙ্গে করে ভূমি অফিসে নিয়ে এসে নিলাম ডাক সম্পন্ন করেছেন। ২১টি গাছের নিলাম হয়েছে। বেশি গাছ কাটা হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সর্বোচ্চ দরদাতা নিলামে অংশ না নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কেউ যদি কারও নামে নিলামে অংশ নেন, সেটা জাস্টিফাই করা সম্ভব নয়। তিনি না থাকলে তাঁর প্রতিনিধি হয়তো ছিলেন।”

নিলাম কমিটির সভাপতি ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসমাইল হোসেন ছুটিতে থাকায় তাঁর মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন