আ. লীগের ঘনিষ্ঠ আলী আফজাল এখন জামায়াতের মনোনয়ন প্রত্যাশী
জামায়াত আমিরের সঙ্গে ড. মো. আলী আফজাল (সবার বাঁমে গোল চিহ্নিত)। ছবি: সংগৃহীত
কৃষিবিদ সীডের চেয়ারম্যান এবং কৃষিবিদ গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর কৃষিবিদ ড. মো. আলী আফজাল একসময় ছিলেন আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ। ৫ আগস্টের আগে তাকে নিয়মিতই দেখা যেত আওয়ামী লীগের নানা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে। আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মঞ্চ শেয়ার করার ছবি নিজেই প্রচার করতেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা গেছে আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে কামালকে। তাকে দেখা যেত মুজিব কোট পরে ঘুরে বেড়াতে। টকশোতে অংশ নিয়ে স্তুতি করতেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীদের।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তাকে এখন নিয়মিত দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে এবং জামায়াত ও ছাত্র শিবির আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে মঞ্চ শেয়ার করতে। এসব ছবিও নিজেই পোস্ট করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। মাগুরায় নিজ এলাকায় চালাতে দেখা গেছে জনসংযোগ।

আলী আফজালকে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে দেখা গেছে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরোয়ার, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নুরুল ইলাম বুলবুলের সঙ্গে। ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ও কেন্দ্রীয় অফিস সম্পাদক সিবাগাতুল্লাহ সিবগাকে দেখা গেছে উপহার নিয়ে আলী আফজালের সঙ্গে দেখা করতে। এছাড়া পায়ে আঘাত পেয়ে অসুস্থ হওয়ার পর তাকে দেখতে যান ডাকসুর ভিপি শিবির নেতা সাদিক কায়েম ও জামায়াতের সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরোয়ার।
সম্প্রতি শিবিরের শেরে বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা আয়োজিত নবীন বরণে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে আলী আফজালকে। গত ২৮ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্র শিবির আয়োজিত ১৪তম ব্যাচ ও ১৫তম ব্যাচের মেরিট অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আলী আফজাল। গত ১৩ নভেম্বর ছাত্রশিবির, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি পশ্চিম শাখার উদ্যোগে ISMAIL AL- ZAZARI ROBOTICS FEST- 2025 এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিতে দেখা যায় তাকে।

আলী আফজাল মাগুরা-২ আসন থেকে জামায়াতের মনোনয়ন পাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। সে লক্ষ্যে এলাকায় নিয়মিত নানা জনসংযোগমূলক কর্মসূচিতে হাজির থাকছেন তিনি।
তার এই রূপ বদলানোতে ক্ষোভ জানিয়েছেন তার এলাকার বাসিন্দারা ও কৃষিবিদরা। কারণ আলী আফজালের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন কোম্পানি ও সমবায় সমিতি গঠন করে আকর্ষণীয় মুনাফার লোভ দেখিয়ে কৃষিবিদদের কাছ থেকে বিনিয়োগ নিয়ে মুনাফা ও আসল টাকা ফিরিয়ে না দেওয়ার। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে ব্যাংক থেকে শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফিরিয়ে না দেওয়া ও শেয়ারবাজার থেকে টাকা আত্মসাতের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ভুক্তভোগী বলেন, ‘উনি আকর্ষণীয় মুনাফার লোভ দেখিয়ে ২৬ কোম্পানি ও সমবায় সমিতি করে শত শত কৃষিবিদের কাছ থেকে বিনিয়োগ নিয়েছে। এখন প্রফিট মূল বিনিয়োগ কিছুই ফেরত দিচ্ছে না, ফোন করলে ফোন ধরেন না। আইনগতভাবে বা মিডিয়ায় কথা বললে কিছুই না দেওয়ার হুমকি দেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আলী আফজাল সমিতির প্লট ফ্ল্যাট বিক্রি করে টাকা নিয়েছেন কিন্ত যারা বিনিয়োগকারী তাদেরকে প্লট ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিচ্ছে না। বছরের পর বছর ধরে ঘুরাচ্ছেন। ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা লোন নিয়েছেন উনি, যার অধিকাংশই খেলাপী। এছাড়াও তিনি লোকসানী কোম্পানিকে লাভজনক দেখিয়ে শেয়ার মার্কেট থেকে টাকা আত্মসাৎ করেছেন।’

এই ভুক্তভোগী ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের টাকা মারার জন্যই উনি রাজনৈতিক দলের আশ্রয় নেন। আগে আওয়ামী লীগের শেল্টার নিয়েছেন, আর এখন জামায়াতের শেল্টার নিচ্ছেন যেন কেউ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিতে পারে।’

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক হুমায়ুন কবির কৃষিবিদ গ্রুপের প্রতারণার একজন ভুক্তভোগী। তিনি ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘২০১১ সালে কৃষিবিদ গ্রুপের এপার্টমেন্ট বুকিং দিয়েছিলাম। মিরপুরে চিড়িয়াখানার পাশে তারা এপার্টমেন্ট করবে। তখন আমি বিদেশে ছিলাম। পরে শুনি ওই স্থানে আর এপার্টমেন্ট হয়নি। পরে আমি কষ্ট করে ওদের কাছ থেকে একটা এপার্টমেন্ট নিই টপফ্লোরে। নরমালি তো কেউ টপ ফ্লোরে এপার্টমেন্ট নেয় না, আমি বাধ্য হয়ে নিয়েছি। পাশাপাশি তাদের কাছে একটা জমিও নিয়েছিলাম। ২০১১ সালে ৩ কাঠা জমি ২১ লাখ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম। যেটা এখন পর্যন্ত খতিয়ান বা এটাই যে আমার জমি এটা নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা আছে।’

‘আমরা যারা শেয়ার কিনেছি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের তো ২, ৩, ৫ টা পর্যন্ত শেয়ার ছিল। তারা এখন খুবই মনক্ষুন্ন তার প্রতি। কারণ তারা প্রফিট ডিক্লেয়ার করে না ঠিকমত। আমি একটা শেয়ার কিনেছিলাম ২০১৬ সালে। আমি মনের দুঃখে জানারও চেষ্টা করিনা আসলে আমার শেয়ারটা আছে কিনা। কত টাকা আছে সেটাও আমি ক্লিয়ার না। কারণ উনারা জুমে এজিএম করেন। তাদের কিছু লিস্টেড গৎবাঁধা লোক আছে, তারা বাহবা দেন, পাস করিয়ে নিয়ে যান। কেউ কথা বলে না। সর্বশেষ শুনেছি তারা দশমিক ৫ শতাংশ প্রফিট ডিক্লেয়ার করেছে। এটা কখনো হয়? দশমিক ৫ শতাংশ প্রফিট এটা কখনো হয়?’ যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি যে এপার্টমেন্ট কিনেছি, গ্যাসের লাইনটাইন বুঝিয়ে দেননি। এখনো কিছুটা কাগজপত্রের ঘাটতি আছে। আমি তাদের সহজেই বিশ্বাস করেছিলাম। বিশ্বাস করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা প্রতারিত হয়েছেন। আমরা সীমিত আয় থেকে সেভ করে এগুলার পেছনে দিয়েছি। এখন আসলে আমাদের মনোকষ্ট আছে। হদিস পাচ্ছি না। আমরা আসলে আশংকায় আছি আমাদের টাকাগুলো ফেরত পাব কিনা।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে আলী আফজালের ৩টি মুঠোফোন নাম্বারে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে নাম্বারগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া তার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে বার্তা পাঠিয়েও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

