Logo
Logo
×

অনুসন্ধান

হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে বিচারিক ক্ষমতার কেন্দ্রে একটি আইন সংস্থা, তৈরি করেছে অনেক প্রশ্ন

জুলকারনাইন সায়ের

জুলকারনাইন সায়ের

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০১:৩৩ এএম

হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে বিচারিক ক্ষমতার কেন্দ্রে একটি আইন সংস্থা, তৈরি করেছে অনেক প্রশ্ন

ছবি: সংগৃহীত

শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক দৃশ্যপট দ্রুত এবং কখনও কখনও অস্বচ্ছ পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

যে সংস্থাগুলো ‘অস্বাভাবিক মনোযোগ’ পেয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে প্রভাবশালী আইন সংস্থা সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস (এসআইএঅ্যান্ডএ)। পূর্বে এই চেম্বারের সুনাম থাকলেও, বর্তমানে এটি আইনি পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের অংশবিশেষের কাছে তীব্র নজরদারির মধ্যে পড়েছে। 

দেশের অন্যতম সম্মানিত সাংবিধানিক আইনজীবী এবং আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ অ্যাডভোকেট প্রয়াত সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের হাতে প্রতিষ্ঠিত এসআইএঅ্যান্ডএ কয়েক দশক ধরে বিশিষ্ট আইনজীবীদের কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে।

২০০৩ সালে ইশতিয়াক আহমেদের মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠ অংশীদার নিহাদ কবির, সৈয়দ আফজাল হাসান উদ্দিন ও মো. আসাদুজ্জামানের মতো জ্যেষ্ঠ অংশীদারদের নেতৃত্বে ফার্মটি চলে আসে। প্রকাশ্যে থাকে তথ্যানুযায়ী কবির দীর্ঘদিনের একজন কর্পোরেট ও বাণিজ্যিক আইন বিশেষজ্ঞ। অন্যদিকে প্রাক্তন অংশীদার মো. আসাদুজ্জামানকে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল নিযুক্ত হন। 

আর প্রতিষ্ঠাতার ছেলে বিচারপতি সৈয়দ রিফাত আহমেদ এখন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকাশ্যে থাকা জীবনবৃত্তান্ত বিষয়টি প্রমাণিত যে, বিচারপতি হওয়ার আগে এসআইএঅ্যান্ডএ-এর সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। 

এই যে সংশ্লিষ্টাতা—যেখানে বেসরকারি একটি চেম্বারের প্রাক্তন অংশীদাররা এখন রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর সবচেয়ে ক্ষমতাধর দুটি পদে আছেন—তা থেকেই প্রমাণিত অসদাচরণের না থাকা সত্ত্বেও সমালোচকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

তারা যুক্তি দিচ্ছেন, এই ধরনের নৈকট্য অনিবার্যভাবে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন বিচার বিভাগে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলা, দুর্নীতির বিচার এবং অনেব বছরের শাসনতান্ত্রিক অস্থিরতার পরে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের মতো বড় কাজটি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমান বিচারিক নেতৃত্বের সমর্থকরা পাল্টা যুক্তি দেন, এই উদ্বেগগুলো প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এজেন্ডাকে উপেক্ষা করছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রধান বিচারপতি বিচার প্রশাসনের ব্যাপক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যার মধ্যে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং বিচার বিভাগের ভেতরে দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্সও রয়েছে। 

প্রধান বিচারপ্রতি হিসেবে তিনি অসদাচরণের অভিযোগের পরে সম্প্রতি হাইকোর্টের কয়েকজন বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠিয়েছেন। জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ হিসেবে বেশ আলোচিত হয়েছে। 

সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতিদের তদন্ত ও অপসারণের সাংবিধানিক সংস্থা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল করেছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার উপর প্রধান বিচারপতির ক্ষমতাকে আরও জোরদার করেছে।

তা সত্ত্বেও বহু পর্যবেক্ষকের জন্য উদ্বেগ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ওভারল্যাপিং করা সেই বিস্তৃত নেটওয়ার্কের প্রতি যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতিকে তুলে ধরে। 

২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ইংরেজি দৈনিব ‘দ্য ডেইলি স্টার’ এ প্রকাশিত প্যান্ডোরা পেপার্স প্রতিবেদনের পর এই আশঙ্কাগুলো আরও তীব্র হয়। কারণ ওই প্রতিবেদনে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে ছয় বাংলাদেশির মালিকানায় থাকা অফশোর কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে এসআইএঅ্যান্ডএ-এর জ্যেষ্ঠ অংশীদার নিহাদ কবিরের নামও ছিল।

একটি অফশোর কোম্পানির অস্তিত্ব কোনো অপরাধের প্রমাণ না হলেও, সমালোচকরা এই তথ্যটিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তি দিচ্ছেন যে, বাংলাদেশের অভিজাত আইনি ও কর্পোরেট মহল আগের প্রশাসনের অধীনে শক্তিশালী হওয়া আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে জড়িত ছিল।

রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় এসআইএঅ্যান্ডএ-এর অংশীদারদের উপস্থিতি সেই জল্পনাকে আরও বাড়িয়েছে।

ভাইরাল হওয়া ছবিগুলোর মধ্যে একটি ছবি ছবিতে সংস্থাটির অংশীদার নাজিয়া কবিরকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্নার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। জেড আই খান শেখ হাসিনার আইনজীবী হিসেবে তখন কথা বলছিলেন। সমালোচকরা এটিকে আগের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সাথে অব্যাহত যোগসাজশের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে এই ব্যাখ্যাগুলো সমন্বিত পদক্ষেপের প্রমাণ নয়, বরং অনুমানভিত্তিক শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা উদাহরণ। 

অনলাইনে নির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দাবি করা হচ্ছে, এসআইএঅ্যান্ডএ-এর অংশীদাররা আগের এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষে যায় এমন আইনি আদেশের জন্য কাজ করছে। যদিও মূলধারার সংবাদ মাধ্যম বা পাবলিক কোর্ট রেকর্ডে এসব এখনো যাছাই হয়নি। 

লুক্সেমবার্গের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মো. জামিরের স্ত্রী নাসরিন জামিরের ওপর আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের কথিত ঘটনাটি প্রায়ই উদাহরণ হিসেবে বলা হয়। যাছাই করা হয়নি, তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পোস্ট  এবং বিভিন্ন ভাষ্যকারদের ভিডিও’র বক্তব্য অনুযায়ী, তাকে ২০২৫ সালের ৬ জুলাই বিমানবন্দরে আটকানো হয়। কিন্তু পরের দিনই একটি রিট পিটিশন দাখিল করার পর দ্রুতই স্থগিতাদেশ পাওয়া যায়। 

এই দাবি আরও জোরালো হয় এই কারণে যে, রিটটি এসআইএঅ্যান্ডএ-এর একজন অংশীদার পরিচালনা করেছিলেন। আর পরে মামলার নথি পাওয়া যায়নি। তবে, নির্ভরযোগ্য মিডিয়া আর্কাইভ এবং কোর্ট রেকর্ড অনুসন্ধান করে এমন কোনো কিছুর সত্যতা মেলেনি। যার অর্থ বিচারিক ব্যাপারের চেয়ে এটি বরং গালগল্প হিসেবেই রয়ে গেছে। 

আরও বড় অভিযোগ হলো বিচারে কি রায় হবে তা ‘নিয়ন্ত্রণ’ করে ওই ফার্মটি। শুধু তাই নয়, ফার্মটি প্রসিকিউটরিয়াল সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে বা বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা ভোগ করার সময় রুটিনমাফিক রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল আসামিদের প্রতিনিধিত্ব করে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ্যে নেই। 

তা সত্ত্বেও ফার্মটিকে ঘিরে বিতর্কটি এমন গভীর কাঠামোগত উদ্বেগকে সামনে নিয়ে আসে যা কোনো একক ফার্মের বাইরেও কথা থেকে যায়। 

বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থা এই অঞ্চলের অন্যদের মতোই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, অভিজাত সংযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতার মধ্যেই রয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল এবং প্রধান বিচারপতির মতো সিনিয়র পদগুলো যখন একই বেসরকারি চেম্বার থেকে আসে, তখন কোনো অন্যায় না থাকলেও, এই দৃষ্টিভঙ্গি গুটি কয়েকের হাতে বিচার ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ আছে বলে ধারণা তৈরি করতে পারে। আর ফার্মটি ঐতিহাসিকভাবে বেক্সিমকো এবং সামিট গ্রুপের মতো প্রধান কর্পোরেট সংস্থাগুলোর আইনি প্রতিনিধিত্ব করেছে যার কারণে এই ধারণা আরও তীব্র হয়। কারণ আগের সরকারের সঙ্গে এই দুটি শিল্পগোষ্ঠীর সম্পর্ক অনেকদিন ধরে রাজনৈতিক সমালোচনার বিষয়।

ফলশ্রুতিতে এমন এক জটিল পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি জনমনে ক্রমবর্ধমান সংশয়ও তৈরি করে। আর এই সংশয় হলো নতুন নেতৃত্ব সত্যিই আদালতকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতা কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে কিনা।

বৃহত্তর প্রশ্নটি হলো এসআইএঅ্যান্ডএ আক্ষরিক অর্থেই বিচারিক ব্যবস্থা ‘নিয়ন্ত্রণ’ করছে কিনা। তবে এই দাবির সমর্থনে কোনো যাচাইকৃত প্রমাণ নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত, পেশাগত এবং রাজনৈতিক সংযোগের এই ওভারল্যাপিংয়ের মুখে বাংলাদেশ কীভাবে নিশ্চিত করবে যে এর প্রতিষ্ঠানগুলো স্থিতিশীল এবং স্বাধীন থাকবে।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন