Logo
Logo
×

অনুসন্ধান

শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ‘২৪-এর রঙে গ্রাফিটি’ প্রতিযোগিতার পুরস্কারের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

মুক্তাদির রশীদ

মুক্তাদির রশীদ

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:২৩ পিএম

শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ‘২৪-এর রঙে গ্রাফিটি’ প্রতিযোগিতার পুরস্কারের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

সারাদেশের স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত ‘২৪-এর রঙে গ্রাফিটি ও চিত্রাংকন’ প্রতিযোগিতায় পুরস্কারের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। গণঅভ্যুত্থানের প্রথম বছর পূর্তিতে, সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতা আয়োজন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। 

উপজেলা থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিযোগিতা সম্পন্ন হলেও বিভিন্ন স্তরের বিজয়ী শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত পুরস্কারের অর্থ পাননি—এমন একাধিক অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রতিযোগিতার প্রতিটি ধাপে সরকারিভাবে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেই অর্থের ব্যবহার নিয়ে রয়েছে চরম অস্পষ্টতা, স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং সম্ভাব্য আর্থিক অনিয়ম।

খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেলেও বাংলা আউটলুক এখন পর্যন্ত কেবল খুলনা বিভাগের মাগুরা জেলার ঘটনাগুলো যাচাই ও নিশ্চিত করতে পেরেছে।


পুরস্কারের টাকা কোথায় গেল?

উপজেলা পর্যায় | ১৭ জুলাই ২০২৫

২০২৫ সালের ১৭ জুলাই মাগুরায় উপজেলা পর্যায়ের ‘২৪-এর রঙে গ্রাফিটি ও চিত্রাংকন’ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।  মাগুরা সদর উপজেলা থেকে দুটি কলেজ অংশগ্রহণ করে।  প্রতিযোগিতায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ প্রথম স্থান অর্জন করে।  নিয়ম অনুযায়ী, উপজেলা পর্যায়ে প্রথম পুরস্কারের অর্থ ছিল ৭ হাজার টাকা।  কিন্তু সংশ্লিষ্ট কলেজের শিক্ষার্থী ও সূত্রগুলোর অভিযোগ—এই অর্থ এখনো তাদের হাতে পৌঁছায়নি। 


জেলা পর্যায় | ১৯ জুলাই ২০২৫

উপজেলা পর্যায়ের মাত্র দুই দিন পর, গত ১৯ জুলাই মাগুরা জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।  এতে জেলার মোট ১০টি কলেজ অংশ নেয়।  প্রতিযোগিতা শেষে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী তিনটি কলেজ বিভাগীয় পর্যায়ের জন্য যোগ্যতা অর্জন করে।

জেলা পর্যায়ে প্রথম পুরস্কারের অর্থ নির্ধারিত ছিল ১০ হাজার টাকা।  কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিজয়ী কলেজগুলোর প্রতিনিধিরা আজও পূর্ণ অর্থ পাননি।  বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, তাদের বারবার বলা হচ্ছে—“পরে দেওয়া হবে।”

মাগুরা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন— আমরা টাকা চাইতে চাইতে এতটাই হয়রান হয়ে গেছি যে এখন আর কিছু বলতে পারছি না। কিছু বললে পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ করে দেওয়ার ভয় আছে।”

তিনি আরও জানান— আজ দেব, কাল দেব—এইভাবে সময় পার করে এখন বলা হচ্ছে, পুরস্কার বিতরণের দিনে শিক্ষকদের যাতায়াত আর খাওয়াদাওয়ার খরচ কেটে বাকি টাকা কলেজ ফান্ডে জমা দেওয়া হবে।

অভিভাবকরা বলছেন শিক্ষার্থীদের অর্জিত পুরস্কারের টাকা থেকে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক ব্যয় কাটা কতটা যুক্তিসঙ্গত।

বিভাগীয় পর্যায় | ১ আগস্ট ২০২৫

সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ ছিল বিভাগীয় পর্যায়ে। ১ আগস্ট ২০২৫ খুলনা বিভাগে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় ৩০টি কলেজ।

ঘোষিত পুরস্কারের অঙ্ক ছিল—

প্রথম: ৩,০০,০০০ টাকা

দ্বিতীয়: ২,০০,০০০ টাকা

তৃতীয়: ১,০০,০০০ টাকা

মোট বরাদ্দ: ৬,০০,০০০ টাকা

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারিভাবে এই অর্থ সংশ্লিষ্ট কলেজগুলোর নামে চেকের মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ হলো—এই টাকা সরকার ইতোমধ্যে বরাদ্দ করলেও মাগুরার সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছায়নি।

"আমরা খোঁজ নিয়েছি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্তৃপক্ষ এই টাকা অংশগ্রহণকারী ছাত্র-ছাত্রীদের  ইতোমধ্যে ভাগ করে দিয়েছেন," জানান অংশগ্রহণকারী একজন শিক্ষার্থী। 

তিনি জানান বিভাগীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষকদের কাছে অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিতে ৯ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে চেক হস্তান্তর করে। 

মাগুরা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ আলহাজ উদ্দিন বাংলা আউটলুককে স্বীকার করেন— প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখনো পুরস্কারের টাকা বিতরণ করা হয়নি।

তিনি বলেন, টাকাটি কীভাবে ব্যয় করা হবে সে বিষয়ে তিনি “নির্দেশনা দিয়েছেন”—কিন্তু সেই নির্দেশনার কোনো লিখিত কপি বা নীতিমালা দেখাতে পারেননি।

স্কুল পর্যায়েও একই চিত্র

কেবল কলেজ পর্যায়েই নয়, মাগুরা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, তাদের দল উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রথম হয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে।

পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, খুলনা জেলা থেকে যারা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন, তারা নাকি নিজেদের মধ্যে পুরস্কারের টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।

শিক্ষার্থীর ভাষায়— আমরা টাকা চাইতে গেলে আমাদের প্রধান শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন—এই টাকা স্কুল ফান্ডে এসেছে, আমরা এটা দিয়ে পিকনিক করব।

উল্লেখ্য, প্রধান শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম এর আগেও গোপনে স্কুলের গাছ বিক্রি করার অপরাধে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ১৭ দিন জেল খেটেছিলেন। তিনি নিজেকে বর্তমানে বৈষম্যের শিকার শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দেন। 

সে সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগের এক সংসদ সদস্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি পুনরায় স্বাভাবিক দায়িত্বে ফেরেন।  সম্প্রতি স্কুল অ্যাসেম্বলিতে স্থানীয় জামায়াত প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ঘটনায়ও তিনি ফের আলোচনায় আসেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বাংলা আউটলুককে বলেন— নতুন প্রতিযোগিতা হওয়ায় ছাত্রদের টাকা দিতে হবে—এমন কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না।

একজন অভিভাবক জানান, প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়—এই টাকার একটি অংশ দিয়ে শিক্ষকরা সম্প্রতি শিক্ষা সফরে গেছেন।


প্রশাসনের অবস্থান: দায় এড়ানোর চেষ্টা?

খুলনা অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা পরিচালক অধ্যাপক ড. আনিস আর রেজা বাংলা আউটলুককে বলেন— এই প্রতিযোগিতার টাকায় দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই।

তবে যখন অন্তত ছয়জন শিক্ষার্থী টাকা না পাওয়ার অভিযোগ করেন।  তখন তিনি বলেন— কারা টাকা পাবে—এ বিষয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না। প্রতিষ্ঠান নেবে নাকি শিক্ষার্থীদের দেবে, তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানই ঠিক করেছে।

এই বক্তব্য প্রশাসনিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার একটি স্পষ্ট উদাহরণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এ বিষয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরারের মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

হিসাব চাইলে নীরবতা

শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের একাধিক অনুরোধ সত্ত্বেও অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন—ঘটনাটি  আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক ও অপমানজনক। শিক্ষক হিসেবে টাকা আত্মসাৎ এর যে অভিযোগ তা থেকে শিক্ষার্থীরা  আমার কাছ থেকে কি শিখবে তা নিয়ে আমি সন্ধিহান। 

আইনগত দৃষ্টিকোণ

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি প্রমাণিত হয় যে প্রতিযোগিতার পুরস্কারের অর্থ বা বরাদ্দকৃত তহবিল আত্মসাৎ করা হয়েছে, তাহলে তা দণ্ডবিধির ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ), ৪০৯ (সরকারি কর্মচারীর আত্মসাৎ) ও ৪২০ (প্রতারণা) ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক অর্থ হলে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর এখতিয়ারভুক্ত।

টিআইবির মন্তব্য

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন— শিক্ষকেরা শিক্ষার্থী ও সমাজের জন্য আদর্শ। শিক্ষার্থীদের পুরস্কারের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা ক্ষমতার জঘন্য অপব্যবহার এবং সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য অপরাধ।

তিনি আরও বলেন— যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। দোষী শিক্ষকরা শিক্ষকতা পেশার জন্য লজ্জাজনক—তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

পুরস্কারপ্রাপ্তদের অভিভাবকরা বলছেন, একটি সৃজনশীল ও শিক্ষামূলক প্রতিযোগিতা কীভাবে প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সম্ভাব্য দুর্নীতির শিকার হলো—‘২৪-এর রঙে গ্রাফিটি’ তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ।  এখন দেখার বিষয়, অভিযোগগুলো কেবল সংবাদেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর কোনো দায় ও বিচার নিশ্চিত হবে।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন