Logo
Logo
×

সংবাদ

রাকসুর ক্ষমতায় ছাত্রশিবির

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৫, ০১:০৮ পিএম

রাকসুর ক্ষমতায় ছাত্রশিবির

রাকসুর এজিএস পদে জয়ী শিবির প্যানেলের এস এম সালমান সাব্বির এবং নবনির্বাচিতি ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এতদিন ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রভাব ছিল কেবল সংগঠন ও উপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ। এবার সেই প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হলো ক্ষমতা।

প্রায় তিন দশক পর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। ২৩টি পদের মধ্যে ভিপি ও এজিএসসহ ২০টি পদে তাদের প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। এর মাধ্যমে তারা ঢাকাসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো রাজশাহীতেও জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখল।

বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল এবারও শিবিরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা টিকিয়ে রাখতে পারেনি। কেবল ক্রীড়া সম্পাদক পদে তারা জয় পেয়েছে। জিএস পদে জয়ী হয়েছেন ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেলের সালাহউদ্দিন আম্মার, যিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আলোচিত মুখ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী তোফায়েল আহমেদ তোফা।

বৃহস্পতিবার দিনভর শান্তিপূর্ণভাবে রাকসু, হল সংসদ ও সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন হয়। প্রায় ২৯ হাজার ভোটারের মধ্যে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী ভোট দিয়েছেন বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে। রাত সাড়ে ৮টার পর ভোট গণনা শুরু হয় এবং পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এফ নজরুল ইসলাম ফল ঘোষণা করেন।

ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’-এর মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। তিনি পেয়েছেন ১২ হাজার ৬৮৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের শেখ নূর উদ্দীন আবীর পেয়েছেন ৩ হাজার ৩৯৭ ভোট। এজিএস পদে ৬ হাজার ৯৭১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন শিবিরের এস এম সালমান সাব্বির। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের জাহিন বিশ্বাস এষা পেয়েছেন ৫ হাজার ৯৪১ ভোট।

শিবিরের নির্বাচিত ২০ জনের মধ্যে আছেন—ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, এজিএস এস এম সালমান সাব্বির, সহক্রীড়া সম্পাদক আবু সাঈদ মুহাম্মদ নুন, সংস্কৃতি সম্পাদক জায়িদ হাসান জোহা, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক সাইয়িদা হাফছা, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুছ সাকিব, বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান মিয়া লস্করসহ আরও অনেকে।

নির্বাচনে জয়লাভের পর জাহিদ বলেন, তিনি সবাইকে নিয়েই কাজ করতে চান। যারা পরাজিত হয়েছেন, তাদের মতামতও গুরুত্ব পাবে। তার ভাষায়, ‘জয়-পরাজয় স্বাভাবিক বিষয়। আমরা সবাই মিলে এই ক্যাম্পাসকে গড়ে তুলব।’

নবনির্বাচিত জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আমাকে যে বিশ্বাস করেছে, সেটার মর্যাদা রাখব। দীর্ঘদিন যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, তাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞ।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক্যাম্পাসে আমাদের কোনো শত্রু নেই। সবাই সহযোদ্ধা। আমরা একসঙ্গে কাজ করতে চাই।’

আম্মার তার বিজয় উৎসর্গ করেছেন ‘আধিপত্যবিরোধী’ লড়াইয়ে থাকা সবার উদ্দেশে। তিনি বলেন, ‘এই বিজয় আমি উৎসর্গ করছি ফিলিস্তিনের নির্যাতিত মানুষদের, আমার বাবাকে, যিনি নির্যাতিত হয়ে কারাভোগ করেছেন, আর আমার মাকে, যিনি সব সময় আমার পাশে থেকেছেন।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি একসময় ছিল বামপন্থিদের শক্ত ঘাঁটি। পঞ্চাশ থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রমৈত্রী ও জাসদ ছাত্রলীগের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। তখন ছাত্রলীগও সমানতালে রাজনীতি করত। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কিছু পদে জয় পেলেও বাম সংগঠনগুলোর প্রভাবই ছিল প্রধান। ইসলামী ছাত্রশিবির তখন নতুন, নির্বাচনে অংশ নিলেও ক্ষমতায় আসতে পারেনি।

কিন্তু সময় বদলে গেছে। নব্বইয়ের পর বাম রাজনীতি ক্রমে দুর্বল হয়, বিভাজন বাড়ে। ফলে এবারের নির্বাচনে তাদের উপস্থিতি থাকলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার মতো সংগঠনশক্তি আর দেখা যায়নি। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ছাত্রলীগ কার্যত ক্যাম্পাস ছেড়ে যায়। ফলে এবারের ভোটে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না।

এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি ছিল মূলত শিবির ও ছাত্রদলের দিকে। তবে ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, দুই সংগঠনের মধ্যে ব্যবধান অনেক।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ৭২ বছরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে মাত্র ১৬ বার। এর মধ্যে পাকিস্তান আমলে ১০ বার, স্বাধীনতার পর সাতবার। ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রতিবছর ভোট হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এবারের নির্বাচন তাই দীর্ঘ বিরতির পর বড় ধরনের অংশগ্রহণে সম্পন্ন হলো।

এই ভোটে মোট ভোটার ছিলেন ২৮ হাজার ৯০১ জন—এর মধ্যে নারী ১১ হাজার ৩০৫ এবং পুরুষ ১৭ হাজার ৫৯৬ জন। রাকসুর ২৩টি পদে প্রার্থী ছিলেন ২৪৭ জন। একই দিনে হল সংসদ ও সিনেট প্রতিনিধি নির্বাচনের ভোটও সম্পন্ন হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ফলাফল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। মতিহারের রাজনীতি বদলে যাচ্ছে—প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন ক্ষমতার বাস্তবতা।


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন