Logo
Logo
×

অভিমত

স্বল্পমেয়াদি সরকার, বাইফোকাল পাবলিক এবং চশমাহীনতা

কাকন রেজা

কাকন রেজা

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:১২ পিএম

স্বল্পমেয়াদি সরকার, বাইফোকাল পাবলিক এবং চশমাহীনতা

অনেকে বলছেন, নির্বাচন হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। প্রশ্ন যদি করেন কীভাবে, উত্তর হবে স্বল্পমেয়াদের সরকারের ওপর বহির্বিশ্ব নির্ভর করে না। আমাদের দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না, শর্টটার্ম সরকারের জন্য। সুতরাং দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে হলে একটি নির্বাচিত সরকার প্রয়োজন। 

কথাটা সর্বাংশে মিথ্যা নয়। তবে পুরোপুরি সত্যিও নয়। নির্বাচনের নামে প্রহসন করে বিগত সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। সরকার নির্বাচিত নয় বিশ্বও তা জানতো। এক বছর না যেতেই সেই সরকার প্রধানকে পালিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু সেই সরকারের সাথেও চুক্তিতে গিয়েছিল বিদেশিরা। কেন গিয়েছিল, গিয়েছিল এই কারণে যে, ফ্যাসিস্ট সরকার দেখাতে পেরেছিল তাদের সময়ে দেশ স্থিতিশীল রয়েছে। তেমন কোনো রাজনৈতিক সংঘাত ছিল না। বিএনপি-জামায়াত মাঝেমধ্যে মাথা বের করার চেষ্টা করলে, তা নিষ্ঠুরভাবে দমনের মাধ্যমে কথিত স্থিতিশীলতা রক্ষা করেছে সরকার। বিদেশিরা এটাই চায়। রাজনৈতিক ক্যাওস এর মধ্যে তারা কাজ করতে চায় না। তারা চায় কমফোর্ট জোন। ফ্যাসিস্ট রেজিম বিগত দেড় দশকে বিদেশিদের সেই কমফোর্টটা ধরে রাখতে পেরেছিল। অর্থাৎ এখানে কমফোর্টটাই মূল বিষয়। 

ফ্যাসিস্টরা এটা বোঝে। তাই তারা এই সরকারকে নানাভাবে আনরেস্ট করার চেষ্টা করছে। যাতে কমফোর্টটা বিঘ্নিত হয়। বিদেশিরা যেন জানে দেশটা আর কমফোর্ট জোনে নেই। অস্থিতিশীল একটা পরিবেশে বিদেশিরা কেন দেশি বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগ করতে ভয় পায়। ব্যবসায়ীরা লাভ খোঁজে, লোকসান নয়। অস্থিতিশীলতা মানে লোকসান। বর্তমান ইন্টেরিম সরকার প্রথম থেকেই নানান ধরনের আন্দোলনের সম্মুখীন হচ্ছে। রিকশা-ব্যাটারি রিকশার দ্বন্দ্ব থেকে শুরু করে, আনসার, চিকিৎসক, নার্স, শিক্ষকসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর আন্দোলন মোকাবিলা করতে হয়েছে সরকারকে। ফলে প্রতি মুহূর্তেই একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে সরকারকে। সরকার চালনার প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় প্রায়শই অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। সে অর্থে বিদেশিদের কাছে বার্তা গেছে, যেখানে সরকার পরিচালনার প্রাণকেন্দ্রই মাঝেমধ্যে অচল হয়ে পড়ছে তখন নিশ্চিত সেখানে বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। 

এই পরিবেশ বিঘ্নিত করার, দেশকে অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা হলো ক্ষমতাহারা এবং ক্ষমতার আশায় থাকাদের সম্মিলিত প্রয়াসে। একটু ভেবে দেখুন, একদল চিন্তা করছে এই সরকারকে অস্থিতিশীল করতে পারলে আইনশৃঙ্খলা থেকে অর্থনীতি সব ভেঙে পড়বে। আর তখন সবাই বলবে ‘আপা’ই ভালো ছিল। পতিতদের এই প্রয়াসের সাথে যুক্ত হয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। কারণ তাদের স্বার্থ রক্ষার প্রধান স্টেকহোল্ডার হলো বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিম। সুতরাং তারা সর্বতোভাবে চাইবে, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে ফ্যাসিজমকে পুনরায় ইনস্টল করতে। অন্যদিকে যারা ক্ষমতায় যেতে চায়, তারা দেশকে অস্থিতিশীল দেখাতে পারলে, বলতে পারবে, দেখো, নির্বাচিত সরকার না আসলে, দেশ স্থিতিশীল হবে না। সুতরাং আমাদের ক্ষমতায় আসতে দাও তবেও সব ঠিক হয়ে যাবে। 

এই যে ঠিক হয়ে যাওয়ার চিন্তা, এই চিন্তা কতটা দূরদর্শিতা প্রসূত। সত্যিই নির্বাচিত সরকার আসলেই দেশ স্থিতিশীল হবে? ভেবে বলুন তো, বাংলাদেশে একমাত্র নেতা হলেন বেগম খালেদা জিয়া যিনি দেশের হাল ধরতে পারলে হয়তো একটা কিছু হতো। কারণ, দেশের মানুষ তো রয়েছেই, বিদেশিরাও তার ওপর নির্ভর করতে পারে নিশ্চিন্তে। গ্লোবাল পলিটিক্সে তার একটা অবস্থান রয়েছে। তার একটা ইমেজ রয়েছে। সেই নির্ভরতার জায়গাটি আমাদের নেই। কারণ বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ। বয়স হয়েছে তার, তিনি তাই অনেকটাই নিভৃতে। ভেবে বলুন তো, আর কে আছেন, যিনি গ্লোবাল পলিটিক্সে গ্রহণযোগ্য অবস্থানে রয়েছেন? বিএনপি, জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলোতে কে আছেন, যিনি এসময়ে হাল ধরতে পারবেন? 

বাংলাদেশ এখন একটা সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। না, এখানে পতিত ফ্যাসিস্টরা কোনো ফ্যাক্টর নয়। ফ্যাক্টর হলো সেই দেশটি, যে দেশের অহংয়ে আঘাত দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। তাদের চিন্তাকে ব্যর্থ করে দিয়ে তরুণদের নেতৃত্বে প্রতিবেশী দেশটির প্রিয় সরকারকে বিতাড়িত করা হয়েছে। ফ্যাসিজমের পক্ষে সকল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ হয়েছে তাদের সকল ইন্টেলিজেন্সিয়া। মরার উপর খাড়াল ঘা’র মতন বাংলাদেশ তাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার তাদের মূল স্টেকহোল্ডার এখন বাংলাদেশ, ভারত নয়। চারিদিক থেকেই খারাপ খবর আসছে ভারতের জন্য। ট্রাম্পের জন্য পূজা-অর্চনা করেছে ভারতীয় বিজেপি, সেই ট্রাম্পই তাদের বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে। সব মিলিয়ে বলতে গেলে গ্লোবাল পলিটিক্সে ভারত ভীষণ এক বৈরী সময় পার করছে। এই আহত সাপের সাথে লড়তে হচ্ছে বাংলাদেশকে। সুতরাং নির্বাচন হয়ে গেলেই যে, অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট, তা ভাবা হবে নেহাতই রোমান্টিজম বা গোঁয়ারতুমি। বরং নির্বাচনের পর জটিলতা আরো বাড়বে। বলে রাখলাম, মিলিয়ে নিয়েন। আগে যখন বলেছি, ফ্যাসিস্ট রেজিম নির্বাচনের এক বছরের মধ্যেই পড়ে যাবে, তখন অনেকেই পাগল বলেছিলেন। হয়েছে তাই প্রহসনের নির্বাচনের একবছর পার করতে পারেনি ফ্যাসিস্ট সরকার। আমাকে যারা ব্যঙ্গ করেছিলেন, তারা এখনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক তকমা লাগিয়ে টকশো করেন, কাগজে কলাম লেখেন। এখন যা লেখেন এবং বলেন তারও অধিকাংশ ভুলভালে ভরা। দূরদর্শিতা বলে একটা শব্দ আছে। যা অর্জন করতে হয় এবং অর্জন করতে দৃষ্টিটা প্রসারিত করা লাগে। সেই ভুলভাল বকনেওয়ালাদের প্রকৃত অর্থে দূরের দৃষ্টি নেই, কাছের দৃষ্টিও কমজোরি। তারা মূলত বাইফোকাল পাবলিক, কিন্তু চশমা পরেন না অহং এর চোটে। পরলে বুঝতেন, স্থিতিশীলতাই মূল আলাপ অন্তত বিদেশিদের কাছে। কিন্তু আমাদের অগোছালো রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন পরবর্তীতে দেশটা স্থিতিশীল করতে পারবে কিনা সেটাই আগামীর জন্য বড় প্রশ্ন। সাথে বড় চ্যালেঞ্জটা আগামী নেতৃত্বের জন্য।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন