প্যারিস থেকে ঢাকার ব্যারাক পর্যন্ত কারা সেনাবাহিনীকে বিতর্কে ঠেলতে চাইছে?
আমার সাংবাদিকতার শুরু আদালত কাভারেজ দিয়ে। বিডিআর বিদ্রোহ মামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, খালেদা জিয়াসহ বহু আলোচিত মামলার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নিয়মিতই সাক্ষাৎ হতো অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা, গোয়েন্দা কর্মকর্তাসহ নানা চরিত্রের সঙ্গে।
২১ আগস্ট মামলার প্রতিদিনের আদালত প্রাঙ্গণে দেখা হতো জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের সঙ্গে। সালাম দিলে তিনি হাসিমুখে জবাব দিতেন। বিএনপির বাবরসহ তখনকার অনেক প্রভাবশালী নেতাও নিয়মিত বিচারের আসামি ছিলেন। মুফতি হান্নান আমাকে দেখলেই ‘সাংবাদিক সাহেব’ বলে সালাম দিতেন।
ডিজিএফআই-এর তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তা রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীর বিচার চলাকালে তার ছেলের সঙ্গে পরিচয় হয় কারাগারের সামনে। হতাশ মুখে জানাতেন—বারবার পরীক্ষা ফেল করা তার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত বানিয়ে দিচ্ছে। রায় ঘোষণার পর আর যোগাযোগ হয়নি।
পরিবারকে কতটা অসহায় করে রেখেছিল তৎকালীন সরকার। বেসামরিক পর্যায়ে এমন হলেও সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের সবকিছু পেরে ওঠেনি।
আবার আমার এক বন্ধুর শ্বশুর, যিনি নিজেও রাজনৈতিক নেতা, তার রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর জামাইয়ের পদোন্নতি আটকে রাখেনি। প্রশ্ন আসে—যদি ‘স্বাধীনতা-বিরোধী’ পরিচয় এতই প্রভাব ফেলত, তবে ১৯৯৬–২০০১ সালের মধ্যেই তো সংশ্লিষ্টদের সেনাবাহিনী থেকে বের করে দেওয়া হতো।
সেনাবাহিনীকে আগে বুঝতে হবে আমাদের অনেক সুশীল সমাজভুক্ত ব্যক্তি সেনাবাহিনী সম্পর্কে না বুঝেই অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট অবস্থান দেখাতে চান। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কাউকে যখন গ্রহণ করে, তখন সে আর সাধারণ কারও সন্তান থাকে না; সে হয় ফোর্সের সন্তান। তার পরিচয় নির্ধারণ করে তার যোগ্যতা—ট্রেস মার্কস, প্রশিক্ষণ, পারফরম্যান্স। বাইরে সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বা সচিবের সন্তান—এটি কোনো গুরুত্বই পায় না। এক অর্থে এটাই তাদের সিরাতুল মুস্তাকিম—যোগ্যতার পথে অটল থাকা।
অনেকে ‘পয়েন্ট’ তোলার জন্য ‘আপার প্রতি আনুগত্য’ দেখিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে বেশিরভাগ কর্মকর্তার বলার সুযোগ খুব সীমিত। ফোর্সের মধ্যে শৃঙ্খলাই প্রধান হওয়া উচিত।
এক কর্নেলকে নরসিংদীর মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর টয়লেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। ছাত্রলীগ করতেন, পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হয়েছেন। মানুষের শুরুটা যাই হোক, সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যোগ্যতার প্রাধান্য থাকা প্রয়োজন। না হলে ন্যায্যতা হারতে বসে।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ফল ভালো হয় না শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীকে ‘জাতীয় রক্ষী বাহিনী’ মতো বানানোর চেষ্টা করতে গিয়ে জেনারেল আজিজ আহমেদ বা তার গোয়েন্দাপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সেলিম মাহমুদের মতো কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়েছেন। আজ দেশে যা পরিস্থিতি—তার ফল আমরা দেখছি। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি বা বিএমএ আরও কঠোর। সামান্য মিথ্যা কথা বা নকলের অভিযোগেই টার্মিনেট হওয়ার নজির আছে। বাইরে থেকে আমরা অনেকেই এর কঠোরতা বুঝতে পারি না।
সোর্ড অব অনার পাওয়া মানেই যে সবাই সঠিক পথে থাকবেন—এমন নয়; অনেকেই পথভ্রষ্টও হন। কিন্তু শুরুটা যেন বৈষম্যহীন হয়, সেই নীতিতে প্রতিষ্ঠান অটল।
ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল হামিদুল হকের ছেলের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা একই। সেখানে তিনি আর কোনো ব্যক্তির ছেলে নন; তিনি প্রতিষ্ঠানের সন্তান। সিস্টেমই তাকে গড়ে তোলে। তার প্রতি কোনো অন্যায্য আচরণ আমাদের সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। বরং তার যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। তা না হলে তো আপনি সেই মেধা না কোটা রাজনীতিতে চলে গেলেন। নতুন করে বৈষম্য সৃষ্টি করা শুরু করলেন।
তাহলে ফরাসি-পীর—বা তাদের অনুসারীরা—কেন এত হৈচৈ করছে? আমি মনে করি এর তিনটি কারণ—
১. সামরিক ম্যানুয়াল এখনও ব্রিটিশ-স্টাইল; ধর্মভিত্তিক র্যাডিক্যালাইজেশনের সুযোগ নেই। তিন বাহিনীর বেশিরভাগ মৌলিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল আইয়ুব খানের সময়, যখন তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে ছিলেন। আইয়ুব খান ধর্মপ্রচারমূলক রাজনৈতিক দলকে ‘ফেতনাবাজ’ মনে করতেন। ফলে এখানে ইরান-ইরাক স্টাইলের বিপ্লবী গার্ড তৈরির কোনো অবকাশ নেই। ৭১ সালে হেরে যাওয়া শক্তিও ধর্মকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীকে র্যাডিকালাইজ করতে পারেনি।
২. সেনাবাহিনীর বাস্তব পররাষ্ট্রদৃষ্টি ফরাসি-পীরের অনুসারীদের পছন্দ নয়। আমাদের প্রকাশ্যে ভারত-মৈত্রী করা কিছু জেনারেলকে ব্যক্তিগতভাবে ভারতকে সমালোচনা করতে দেখেছি। তারা চীনকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মিত্র ভাবেন, আবার পশ্চিমাদের সঙ্গেও সম্পর্ক চান। কিন্তু ফরাসিপীরদের অনুসারীরা—যাঁরা বিদেশে থাকেন—একেবারেই চীনবিরোধী। ফলে তারা ৭৫–পরবর্তী ‘ভারতীয় এজেন্ট’ তত্ত্ব পুনরুজ্জীবিত করে সেনাবাহিনীকে বিতর্কে ঠেলে দিতে চাইছে, যেন নিজেদের মনমতো বিপ্লবী গার্ড বানানোর সুযোগ তৈরি হয়।
৩. মিসরের মতো পরিস্থিতি ঠেকাতেই সেনাবাহিনী তাদের কাছে প্রধান বাধা—যাদের লক্ষ্য বাংলাদেশে দক্ষিণ এশীয় ব্রাদারহুড-ধাঁচের একটি রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করানো। ফলে তিন বাহিনীকে টার্গেট করে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে যাতে একটি ‘জেলেনস্কি-মডেল’ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়, এবং ভারত বা মিয়ানমারের সঙ্গে ইউক্রেন-রাশিয়ার মতো সংঘর্ষাত্মক স্ট্র্যাটেজি চালানো যায়। মূল উদ্দেশ্য—চীনকে ঠেকানো।
জামায়াত নেতাদের চীনের সঙ্গে মিটিংয়ে গিয়ে ‘স্বাধীন আরাকান’ গড়তে সহযোগিতা চাওয়ার কথাও তারই ইঙ্গিত।
বাংলাদেশের আসল সংকট: বৈষম্য, তাই মব তৈরি নয়
বাংলাদেশের অন্যতম ক্রাইসিস—বৈষম্য। এ কারণেই ২০২৪ সালে জনগণ কোটা সংস্কারের চেয়ে ‘বৈষম্য বিরোধী’ আন্দোলনে ন্যায্যতার স্বপ্ন দেখেছে নাহিদ-আসিফ-হাসনাতদের নিয়ে। তারা সফল হয়নি—এটা বাস্তব। কিন্তু তাই বলে মব তৈরি করে (হোক সে সাইবার কিংবা সরাসরি) দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ফরাসি পীররা প্যারিসে নিরাপদে বসে নিজেদের পরিবার-সন্তানের বিলাসি জীবনের মাঝে আমাদের দেশে মব তৈরি করতে চায়—যাতে এখানে তারা নিজেদের পছন্দের ‘পুতুল সরকার’ বসাতে পারে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য একটাই হওয়া উচিত—জনগণের স্বার্থ রক্ষাকারী, ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সরকার নিশ্চিত করা।
লেখক: সাংবাদিক
