Logo
Logo
×

অভিমত

খালেদা জিয়া: মাথা নত না করা এক জীবনের গল্প

Icon

জোবায়ের হোসেন

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৪৬ এএম

খালেদা জিয়া: মাথা নত না করা এক জীবনের গল্প

বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেত্রী নন। তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের অংশ, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল এবং মানুষের ভালোবাসা ও আস্থার প্রতীক। তার মৃত্যুতে যে লাখো মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত জানাজায় অংশ নিয়েছেন, তা কোনো রাজনৈতিক আয়োজনের ফল ছিল না। এটি ছিল মানুষের অন্তঃসত্তা থেকে উদ্ভূত শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। বাংলাদেশে এমন দৃশ্য বিরল, কারণ এই ভালোবাসা কোনো কৃত্রিম প্রচেষ্টা, প্রলোভন বা ভয়ের মাধ্যমে তৈরি হয়নি। এটি মানুষের বিশ্বাস ও ত্যাগের ওপর গড়ে ওঠা এক অনন্য সম্পর্ক।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা ছিল প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। তিনি কোনো ছাত্ররাজনীতির  গড়ে উঠা সোনালি ফসল ছিলেন না, কিংবা কোনো রাজনৈতিক পরিবারের সক্রিয় সদস্যও ছিলেন না। একজন গৃহবধূ হিসেবে তার জীবন নিরবেই চলছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় কোনো রাজনৈতিক সভা সমাবেশে বিএনপির কর্মী হিসেবে তাঁর উপস্থিতি চোখে পড়েনি। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতিকে শূন্যতায় ফেলে দেয়। সেই শূন্যতার মাঝে ইতিহাসের দরজায় দাঁড়ান খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি মাত্র ৩৬ বছর বয়সে বিএনপিতে যোগ দিয়ে তিনি দ্রুত প্রমাণ করেন, তিনি কারও ছায়া নন; তিনি নিজেই শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা।

স্বৈরশাসক হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে চলা আপসহীন আন্দোলনই তাঁকে সত্যিকারের নেত্রী হিসেবে গড়ে তোলে। গ্রেপ্তার, হুমকি, দমন-পীড়ন এই সব বাধা তাকে পিছনে ঠেলতে পারেনি। নয় বছরের দীর্ঘ আন্দোলনে তিনি হয়ে ওঠেন আপসহীন নেতা, কিন্তু সেই আপসহীনতা কখনো উগ্রতা ছিল না। বরং এটি ছিল নৈতিক দৃঢ়তার প্রতীক। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জনগণ তাকে শুধু ক্ষমতায় বসায়নি, বরং দায়িত্ব দিয়েছে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ইতিহাস গড়েন।

ক্ষমতায় থেকেও খালেদা জিয়া রাষ্ট্রকে নিজের সম্পত্তি মনে করেননি। তিনি জানতেন, গণতন্ত্র মানে শুধু ক্ষমতা নয়; গণতন্ত্র মানে সীমা, আমানত এবং জবাবদিহি। নির্বাচনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রমাণ। নিজের রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি জনদাবিকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যা বাংলাদেশে খুব কম নেতা তৈরি করতে পেরেছেন।

খালেদা জিয়ার রাজনীতি ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং বাংলাদেশি পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে।  দেশপ্রেমে অবিচল এই নেত্রীর মধ্যে কখনো প্রতিহিংসার স্থান হয়নি। বরং তিনি  ছিলেন অন্তর্ভুক্তিমূলক। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্র টিকে থাকে ঐক্যের মাধ্যমে, ভয় দেখিয়ে নয়। এই কারণে দীর্ঘ নিপীড়নের পরও তিনি কখনো প্রতিশোধের ডাক দেননি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর তার বার্তা “ধ্বংস নয়, প্রতিহিংসা নয়”—আজকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল উচ্চারণ হিসেবে রয়ে গেছে।

তার জীবনের শেষাংশ ছিল এক গভীর ট্র্যাজেডি। একের পর এক মিথ্যা মামলা, কারাবাস, চিকিৎসার অভাব, ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, ছোট ছেলের অকাল মৃত্যু এবং বড় ছেলের দীর্ঘ নির্বাসন এই সবকিছু কোনো ব্যক্তিগত দুঃখের গল্প নয়। এটি ছিল রাষ্ট্র কতটা ভয় বা নৈরাশ্য দিয়ে একজন নেত্রীকে ভাঙতে চায় তার প্রমাণ। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, তিনি ভাঙেননি। কখনো কাউকে আঘাত করার ভাষা ব্যবহার করেননি। তিনি বারবার বলেছেন, দেশের মানুষই তার পরিবার।

এই কারণে তাঁর মৃত্যুতে শোক শুধু বিএনপির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দল-মত নির্বিশেষে মানুষ নীরবে কেঁদেছে। তার জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, জনপ্রিয়তা প্রচারে তৈরি হয় না; জনপ্রিয়তা জন্ম নেয় ত্যাগ, সাহস এবং মানুষের আস্থার মাধ্যমে। মৃত্যুকালে তিনি ক্ষমতায় ছিলেন না, বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবেও সংসদে সক্রিয় ছিলেন না। তবু রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে তার শেষ যাত্রা ছিল একজন জাতীয় নেত্রীর মর্যাদাপূর্ণ বিদায়।

সার্কভুক্ত দেশের সিনিয়র মন্ত্রীদের উপস্থিতি এবং বিশ্বনেতাদের শোকবার্তা প্রমাণ করে, খালেদা জিয়া কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চরিত্র ছিলেন না। তিনি উন্নয়নশীল গণতন্ত্রে নারীর নেতৃত্ব, আপসহীনতা এবং সহনশীলতার একটি আন্তর্জাতিক উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক নীতি ও দর্শন সবসময় রাষ্ট্রের সেবা, নাগরিক অধিকার এবং গণতন্ত্রের মূলনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাঁর আপসহীনতা কখনো ব্যক্তিগত লোভ বা ক্ষমতার জন্য ছিল না। বরং এটি ছিল নৈতিক দৃঢ়তার প্রকাশ। দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থকে রাজনীতির ওপর প্রাধান্য দেননি।

শেষ পর্যন্ত বেগম খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছেন, ক্ষমতা হারানো যায়, শরীর ভেঙে পড়ে, কিন্তু আদর্শ হারায় না। তিনি এখন আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু শেষ হয়ে যাননি। তিনি থেকে গেছেন মানুষের স্মৃতিতে, রাষ্ট্রের ইতিহাসে এবং গণতন্ত্রের নৈতিক মানদণ্ডে। বাংলাদেশের ইতিহাস যতদিন গণতন্ত্রের কথা বলবে, ততদিন খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারিত হবে। কারণ কিছু মানুষের মৃত্যু হয়, আর কিছু মানুষ ইতিহাসে প্রবেশ করে। খালেদা জিয়া সেই শ্রেণির মানুষ, যিনি শুধুমাত্র জীবনকালে নয়, ইতিহাসেও চিরস্থায়ী হয়ে থাকবেন।

বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন সাহস, নৈতিকতা এবং নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, ধৈর্য, সহনশীলতা এবং মানুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা তাকে ইতিহাসের একটি বিরল চরিত্রে পরিণত করেছে। বাংলাদেশি সমাজ, রাজনীতি এবং সাধারণ মানুষের মনে তিনি চিরকাল একজন অবিস্মরণীয় নেতা হিসেবে থাকবেন।

জোবায়ের হোসেন: কান্ট্রি-কোঅর্ডিনেটর (মালয়শিয়া ও সিঙ্গাপুর), আ্যমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইউকে। ইমেইল: [email protected]


Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন