আল জাজিরার মতামত প্রতিবেদন
সময় এসেছে, বিশ্বের উচিত যুক্তরাষ্ট্রকে বয়কট করা
ডোনাল্ড আর্ল কলিন্স
প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৩২ পিএম
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র বারবার আন্তর্জাতিক নিয়ম ও আইনকে উপেক্ষা করেছে। কখনো শুল্কযুদ্ধের ওঠানামা, কখনো রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দেখনদারি আলোচনা, আবার ইসরায়েলের সঙ্গে তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’—সবকিছুর মাঝেই গাজাকে ‘সমুদ্রঘেঁষা সম্পত্তি’ বানানোর কল্পনা প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন। এসব ঘটনাই একা একা যথেষ্ট উদ্বেগের ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। খ্রিস্টানদের রক্ষার অজুহাতে নাইজেরিয়ায় বোমা হামলা চালানো হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার আগে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভেনেজুয়েলার নৌযান উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান, গ্রিনল্যান্ড ও মেক্সিকোকে প্রকাশ্যে সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও পরিস্থিতি স্বস্তিকর নয়। অভিবাসন প্রত্যাবাসনের নামে ট্রাম্প প্রশাসনের আইসিই বাহিনী আইনবহির্ভূত সহিংসতায় জড়াচ্ছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলিতে অন্তত তিনজন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় ৪৩ বছর বয়সী কিথ পোর্টার জুনিয়র এবং মিনেসোটায় ৩৭ বছর বয়সী রেনে নিকোল গুড ও অ্যালেক্স প্রেটি ক্যামেরার সামনে নিহত হন। এসব দৃশ্য জনমনে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছে।
যদি এমন ঘটনা ইরানের মতো অন্য কোনো দেশে ঘটত, পশ্চিমা বিশ্ব ইতোমধ্যেই নিষেধাজ্ঞা আর অবরোধের ডাক দিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। তাই এখন বিশ্বকে মনে করতে হচ্ছে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের সেই পথ। অর্থনৈতিক চাপের পথ। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি, পণ্য ও তাদের নেতৃত্বাধীন আয়োজন বর্জনের পথ।
নাগরিক যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাত ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন থামানোর বাস্তবসম্মত উপায় এখন একটাই—বিশাল অর্থনৈতিক চাপ। ১৯৫০-এর দশকে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানরা যেমন মন্টগোমেরি বাস বর্জনের মাধ্যমে অন্যায় ব্যবস্থার অর্থনৈতিক ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৫৫ সালের ১ ডিসেম্বর রোজা পার্কসের গ্রেপ্তারের পর শুরু হওয়া সেই আন্দোলন ৩৮১ দিন চলেছিল। তখন মার্টিন লুথার কিং বলেছিলেন, ‘অপমান সহ্য করে বসে থাকার চেয়ে মর্যাদা নিয়ে হাঁটা বেশি সম্মানের।’
আজ যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ‘ন্যায়কে ব্যবসায় বসানো’ দরকার। ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বে ২০০৫ সালে শুরু হওয়া আন্দোলন সেই পথ দেখিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত এই উদ্যোগ ইসরায়েলের দখলদারি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা তৈরি করেছে।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও তেমন বৈশ্বিক উদ্যোগের কথা উঠছে। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ বর্জনের ডাক ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। আইসিই এজেন্টের গুলিতে রেনে নিকোল গুড নিহত হওয়ার পর এই আহ্বান আরও জোরালো হয়েছে। পর্যটন, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রকে একঘরে করার আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে শুধু একটি বিশ্বকাপ বর্জন যথেষ্ট নয়। গুগল, অ্যামাজন, প্যালান্টিরের মতো প্রতিষ্ঠান, যারা নজরদারি ও দমননীতিতে যুক্ত, সেখান থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার জরুরি। বড় বড় মার্কিন গণমাধ্যমের একচেটিয়া প্রভাব ভাঙাও দরকার। আমেরিকা২৫০ উদযাপন, ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক কিংবা কোচেলা ও মেট গালার মতো আয়োজন বর্জন করাও চাপ বাড়াতে পারে।
একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সাম্রাজ্যবাদী’ বলে আখ্যা দিত। তখন সেটিকে প্রোপাগান্ডা বলা হতো। কিন্তু জীবনের শেষদিকে মার্টিন লুথার কিং বুঝেছিলেন, সেই সমালোচনার অনেকটাই বাস্তব। ১৯৬৭ সালে তিনি বলেছিলেন, পুঁজিবাদ, সামরিকবাদ ও বর্ণবাদের অশুভ শক্তি একসঙ্গে কাজ করে।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বিশ্বকে আবারও সেই কথাই যুক্তরাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিতে হবে। সম্মিলিত বর্জন আর বিনিয়োগ প্রত্যাহারের মাধ্যমেই।
