রয়টার্সের প্রতিবেদন
ভারতের ছায়া সরে গেছে, বাংলাদেশের বুকে চীনের ছায়া আরও গাঢ়
রয়টার্স
প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:০৫ পিএম
বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীনের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের পর এই প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারতের ঘনিষ্ঠ এই নেত্রী দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন, কিন্তু বর্তমানে তিনি দিল্লিতে নির্বাসনে আছেন, আর তার দল আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে দেশের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল—বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামি—ইতোমধ্যেই ভারত-বিরোধী মনোভাবের ইঙ্গিত দিয়েছে। এদের কেউই ভারতের সঙ্গে অতীতে তেমন ঘনিষ্ঠ ছিল না।
এদিকে, চীন দ্রুত গতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করছে। সদ্য চুক্তিবদ্ধ এক প্রকল্পে ভারত সীমান্তের কাছেই একটি ড্রোন কারখানা নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।
ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন নিয়মিত দেখা করছেন বাংলাদেশি রাজনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে। তিনি কয়েক বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্পসহ দ্বিপাক্ষিক নানা বিষয়ে আলোচনায় ব্যস্ত।
বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ মনে করে, শেখ হাসিনার অপরাধে ভারতও জড়িত।’ তার ভাষায়, ‘যে দেশ একজন সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দিয়েছে এবং আমাদের অস্থির করে তুলেছে, তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়া মেনে নেওয়া যায় না।’
তবে তারেক রহমান আরও সতর্ক সুরে বলেছেন, ‘সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই, তবে আমার দেশের স্বার্থ আগে।’
সম্প্রতি ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে ক্রিকেট নিয়েও। বাংলাদেশের এক জনপ্রিয় ক্রিকেটারকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার প্রেক্ষিতে আইপিএল দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এরপর ঢাকা সরকার ভারতের ওই লিগের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয় এবং পুরুষদের ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় সরানোর অনুরোধ জানায়। কিন্তু আইসিসি তা প্রত্যাখ্যান করে।
উভয় দেশ একে অপরের ভিসা দেওয়া সীমিত করেছে। দুই দেশের সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগও কমে গেছে। তবে ডিসেম্বর মাসে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে তারেক রহমানকে তার মা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর জন্য সমবেদনা জানান।
বাংলাদেশ সরকার বারবার ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছে। গত বছরের শেষ দিকে ঢাকার এক আদালত শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই আহ্বান আরও জোরালো হয়। জাতিসংঘের মতে, সেই সময়কার বিক্ষোভ দমনে অন্তত ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিল। যদিও হাসিনা হত্যার নির্দেশ দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামি একে অপরের বিরুদ্ধে বিদেশি প্রভাব গ্রহণের অভিযোগ তুলেছে। জামায়াত বলছে বিএনপি ভারতের ঘনিষ্ঠ, আর বিএনপি বলছে, জামায়াত পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে আছে।
এক নির্বাচনী সভায় তারেক রহমান বলেন, ‘না দিল্লি, না রাওয়ালপিন্ডি—সবার আগে বাংলাদেশ।’
ভারতের সরকারি কর্মকর্তারা বেসরকারিভাবে স্বীকার করেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থাকায় যে দলই জয়ী হোক, তাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে।
চীন গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। বছরে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়, যার ৯৫ শতাংশই চীনা পণ্যে পূর্ণ।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর চীনা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কয়েক শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। আগে ভারতীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী আদানি গ্রুপ বাংলাদেশে সক্রিয় থাকলেও সম্প্রতি নতুন কোনো চুক্তি হয়নি।
দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক প্রোগ্রেস’-এর ফেলো কনস্টানটিনো জেভিয়ার বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যখন সংকট, তখন চীন ধীরে ধীরে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে।’
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ চীনের দিকে আরও ঝুঁকবে। কারণ, চীন বেশি অর্থনৈতিক সুযোগ দেয় এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়, তাতে চীন জড়ায় না।
‘যদি ঢাকা ও দিল্লি সম্পর্ক মেরামত না করতে পারে, তাহলে নতুন সরকার বেইজিংয়ের দিকে আরও জোরালোভাবে আগাবে,’ বলেন থমাস কিয়ান, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক।
তবে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো মানেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের উভয়ের দরকার—চীন ও ভারত। বাস্তবতার দিক থেকে ভাবতে হবে। যে দলই জিতুক, তারা এতটা অপরিণামদর্শী হবে না যে ভারতকে উপেক্ষা করবে।’
ভারতের তিন দিকে ঘেরা বাংলাদেশ বাণিজ্য, ট্রানজিট ও নিরাপত্তার জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, ভারতও স্থিতিশীল সীমান্ত রক্ষার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চায়।
তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য স্থির রয়েছে ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে, যার বড় অংশই ভারতের রপ্তানি। বিদ্যুৎ ঘাটতি সামাল দিতে আদানি সম্প্রতি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়েছে, যদিও দাম নিয়ে ঢাকার আপত্তি রয়েছে।
ভারত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহযোগিতা করলেও পানিবণ্টন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং শেখ হাসিনার শাসনকে ভারতের সমর্থন অনেক বাংলাদেশির মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
জামায়াতপন্থী এবং নতুন প্রজন্মের সমর্থনে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির নেতা নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এটা কেবল নির্বাচনী স্লোগান নয়। আমাদের তরুণ সমাজ দিল্লির আধিপত্য স্পষ্টভাবে টের পাচ্ছে। এটা এই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু।’
