এশিয়া টাইমসের প্রতিবেদন
বিএনপির ভূমিধস জয়: বাংলাদেশের জন্য এক নতুন সূচনা ও কঠিন পরীক্ষা
ফয়সাল মাহমুদ
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৫৭ পিএম
বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এক বিরল সময়ের সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। মানুষের দীর্ঘদিনের ক্লান্তি আর দলের কৌশলগত ধৈর্য—এই দুইয়ের মিলনে তৈরি হয়েছে এই ফলাফল।
এই বড় জয় হঠাৎ করে আসেনি। প্রায় দুই দশক ধরে প্রস্তুতির ভেতর দিয়ে যে সময় গেছে, তার ফসল এটি। এই জয়ের কেন্দ্রে ছিল একটি জাতীয় মনোভাব। সেটি আশাবাদের চেয়ে বেশি ছিল অবসাদে ভরা।
অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা, গণভোট, প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তা আর মতাদর্শিক সংঘাতের পর মানুষ নতুন পরীক্ষা চায়নি। তারা চেয়েছে পরিচিত কিছু। চেয়েছে এমন কিছু, যা বোঝা যায়, ধরা যায়।
অস্থিতিশীলতার অনুভূতি যখন বাড়ে, তখন ভোটাররা সাধারণত অচেনা বিকল্পে ঝুঁকি নেয় না। তারা ফিরে যায় পরিচিত শক্তির কাছে। এমন প্রতিষ্ঠানের দিকে, যার স্মৃতি আছে, ইতিহাস আছে—যদিও তা নিখুঁত নয়। বিএনপি এই মানসিক প্রবণতা থেকে লাভবান হয়েছে।
দলটি নিজেকে অজানার দিকে লাফ হিসেবে উপস্থাপন করেনি। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকলেও দলটি মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। বরং টিকে ছিল। ফলে তারা ফিরে এসেছে এমন এক শক্তি হিসেবে, যারা টিকে থেকেছে, সহ্য করেছে।
এই নির্বাচনী ফলাফলের পেছনে তিনটি শক্তি কাজ করেছে।
প্রথমত, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আগের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতনে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। প্রভাবশালী কোনো ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে সেখানে নিরপেক্ষ জায়গা তৈরি হয় না। তৈরি হয় বিভ্রান্তি।
এমন অনিশ্চয়তার সময়ে সুবিধা পায় সবচেয়ে পরিচিত রাজনৈতিক শক্তি, নতুন কেউ নয়। বিএনপির শাসন-অভিজ্ঞতা, পুরোনো নেতৃত্বের উত্তরাধিকার এবং ত্যাগের গল্প সেই শূন্যতা পূরণ করেছে।
ভোটাররা অতীতের ভুল একেবারে ভুলে গেছে—এমন নয়। তারা হিসাব করেছে। তুলনা করেছে। ব্যালটে থাকা অন্য বিকল্পের চেয়ে বিএনপির অভিজ্ঞতাকে নিরাপদ মনে হয়েছে। দলের আবেদন বড় স্বপ্নের প্রতিশ্রুতিতে ছিল না। ছিল প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতিতে। তারা পুনর্গঠনের কথা বলেছে, নতুন করে সবকিছু বানানোর কথা নয়।
দ্বিতীয় শক্তি ছিল নেতৃত্বের সংহতি। তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর সম্পন্ন করেছেন।
একসময় তাকে ‘বিতর্কিত’ উত্তরসূরি বলা হতো, যিনি নির্বাসন থেকে রাজনীতি পরিচালনা করেছেন। এখন তার হাতে রয়েছে স্পষ্ট ও স্বাধীন জনসমর্থনের ম্যান্ডেট। এই বিজয় তাকে শক্ত অবস্থান দিয়েছে। জোটের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়েছে। একই সঙ্গে অজুহাতের পথও বন্ধ করেছে।
এখন তিনি বাধা বা প্রান্তিককরণের অভিযোগ তুলতে পারবেন না। তার হাতে যে ম্যান্ডেট এসেছে, সেটিই তার পরীক্ষা। তিনি কি আগের নেতাদের পতনের ধারা থেকে বের হতে পারবেন? বড় জয় ক্ষমতা দেয়, কিন্তু দায়ও কেন্দ্রীভূত করে।
তৃতীয় শক্তি ছিল সাংগঠনিক স্থায়িত্ব। রাজনৈতিক নির্বাসন অনেক সময় দলকে ভেঙে দেয়। বিএনপির ক্ষেত্রে সেটি দলকে আরও কঠিন করেছে।
ক্ষমতার বাইরে থাকার বছরগুলোতে দলটি তৃণমূলে আনুগত্য জোরদার করেছে। অবিচারের বর্ণনাকে গভীর করেছে। নির্বাচনী প্রস্তুতিও শাণিত করেছে।
নির্বাচন যখন এসেছে, বিএনপি তখন তাৎক্ষণিক কিছু করেনি। বহু বছরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। সমর্থকেরা ছিল প্রস্তুত। তাদের ভেতরে জমে ছিল ক্ষোভ, আনুগত্য আর প্রত্যাশা। এই সঞ্চিত শক্তিই শেষ পর্যন্ত ব্যালটে রূপ নিয়েছে।
তবে এই নির্বাচনের গভীর তাৎপর্য লুকিয়ে আছে বিরোধী রাজনীতির রূপান্তরে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচনী ফল অর্জন করেছে। প্রান্তিক অবস্থান থেকে উঠে এসে তারা এখন জাতীয় রাজনীতিতে অস্বীকার করার উপায় নেই—এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়েছে।
তাদের উত্থানের পেছনে ছিল শৃঙ্খলা ও স্পষ্ট অবস্থান। সাম্প্রতিক শাসনের দায়ে তারা আক্রান্ত নয়—এমন একটি বিকল্প হিসেবে জামায়াত নিজেদের উপস্থাপন করতে পেরেছে।
দেশকে রাতারাতি বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি তাদের দিতে হয়নি। তাদের শুধু বোঝাতে হয়েছে যে তারা আলাদা। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক অভিজাতদের থেকে নৈতিকভাবে ভিন্ন—এই বার্তাটি তারা সামনে এনেছে। মূলধারার দলে হতাশ নাগরিকদের প্রতিবাদী ভোট তারা টেনে নিতে পেরেছে।
পরিকল্পিত ডিজিটাল প্রচার এবং তৃণমূলে সুসংগঠিত কর্মীবাহিনী সেই বার্তাকে নিখুঁতভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে। জামায়াতের এই অগ্রগতি দেখিয়েছে, প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তির প্রতি জনআস্থা কতটা ক্ষয়ে গেছে।
একই সময়ে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) আবির্ভাব রাজনীতিতে নতুন ও অনিশ্চিত এক শক্তির জন্ম দিয়েছে। তারা ক্ষমতায় না এলেও তাদের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। এমন একটি অংশ গড়ে উঠেছে, যারা পুরোনো ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তিও চায় না, আবার মতাদর্শিক রক্ষণশীলতার দিকেও ঝুঁকছে না।
এনসিপির সমর্থকভিত্তি মূলত শহুরে, তরুণ এবং সংস্কারমুখী। তারা ভিন্ন এক রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয়। যে দ্বিমেরু কাঠামো এতদিন বাংলাদেশের রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছিল, সেটি আর অটুট নেই। এটি ভেঙে আরও জটিল ও কম নিয়ন্ত্রিত এক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
এই ভাঙন একদিকে সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে ঝুঁকিও বাড়ায়। বিএনপির বড় জয় তাকে সংসদে প্রভাবশালী করেছে। কিন্তু এই প্রাধান্যই কখনও কখনও দায়ে পরিণত হতে পারে। বিপুল ম্যান্ডেট অনেক সময় স্থায়িত্বের ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে। সরকার তখন ভাবতে শুরু করে, বিজয় মানেই জনগণের স্থায়ী আনুগত্য। অথচ বাস্তবে তা সাময়িক রাজনৈতিক সম্মতি মাত্র।
বাংলাদেশের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, এমন ভ্রান্ত ধারণা দ্রুত ভেঙে পড়ে। এখন বিএনপির সামনে কিছু তাৎক্ষণিক পরীক্ষা রয়েছে। এই পরীক্ষাই ঠিক করবে, তাদের জয় স্থিতিশীলতার ভিত্তি হবে, নাকি নতুন অস্থিরতার সূচনা।
প্রথম পরীক্ষা সংযমের। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘সব অথবা কিছুই নয়’ ধরনের শাসনপ্রবণতা দেখা গেছে। যে দল জিতেছে, তারা এমনভাবে শাসন করেছে যেন পরাজয় অসম্ভব। পরে দেখা গেছে, বাদ দেওয়ার রাজনীতি প্রতিক্রিয়া ডেকে আনে। বিএনপি যদি সেই পথেই হাঁটে, তবে তাদের বড় জয়ও ক্ষণস্থায়ী হবে।
দ্বিতীয় পরীক্ষা দুর্নীতি। দুর্নীতির প্রতি জনসহনশীলতা এখন অনেক কমে গেছে। যারা বিএনপিকে আবার ক্ষমতায় এনেছে, তারা আংশিকভাবে বিশ্বাস করেছে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার মেরামত দরকার। যদি আবার অতীতের অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেখা যায়, তবে যে কোনো বিরোধী প্রচারের চেয়েও দ্রুত তাদের বৈধতা ক্ষয়ে যাবে।
শেষ পরীক্ষা সংস্কার। এই নির্বাচনের আগে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা জাগিয়েছে। গণভোটের বিতর্ক ও সংবিধান নিয়ে প্রশ্ন নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর সম্ভাবনা সামনে এনেছিল। যদি সেই প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করা হয়, তবে ভোটাররা মনে করতে পারে, মৌলিক কিছুই বদলায়নি।
সব মিলিয়ে, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়। এটি আস্থার পুনর্গঠন, নেতৃত্বের পরিমাপ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির নতুন পরীক্ষার মুহূর্ত। বিএনপির হাতে এখন সুযোগ আছে। সেই সুযোগ তারা কীভাবে ব্যবহার করবে, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশের পরবর্তী অধ্যায়।
ফয়সাল মাহমুদ, প্রেস মিনিস্টার, বাংলাদেশ হাইকমিশন, নয়াদিল্লি।
