ফাগুন চলে যাওয়ার একাশি মাস
এ মাটি শস্য নয়, কবরের যোগ্য হয়ে উঠেছে
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে শহিদ আনাস। যার চিঠি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উপহার দিয়েছিলেন এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলাম। যে চিঠি ইতিহাসের এক কিংবদন্তি। সেই শহিদ আনাসের মা প্রশ্ন রেখেছেন, ‘কী লাভ এ দেশকে ভালোবেসে? দেশপ্রেমিকরা জীবন দেয়, আর রাজনৈতিক নেতারা ফায়দা লুটে’। এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই। আমাদের জানা নেই প্রায় দু’হাজার শহিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশটা কী পেলো? শত শত মানুষ চোখ হারালো, হাজার হাজার মানুষের অঙ্গহানি হলো, আহত হলো। কী লাভ হলো? আগামীতে প্রশ্নটা আরও জোরালো হতে থাকবে। বাড়তে থাকবে মানুষের বিক্ষুব্ধতা।
ফাগুন, ইহসান ইবনে রেজা, ফাগুন রেজা, তোকে হত্যার মাধ্যমে, তোর মৃত্যুতে আসলে কী হলো? তোর শহিদানে গণমাধ্যম কি স্বাধীনতা পেলো? নাকি সেই পুরানো বন্দোবস্তই চালু রইলো? হওয়ার মধ্যে সত্য বলার জন্য চাকরিচ্যুতি। মূলত এখনো কিছুই হয়নি। সেই পুরানো বন্দোবস্তই চালু। হওয়ার মধ্যে শুধু নতুন প্রভু খুঁজে নেয়ার প্রতিযোগিতা। আর কারো কারো প্রভু হয়ে ওঠার বাসনা। সেই ভৃত্য আর মনিব সমাচারের আবর্তেই বাংলাদেশ। জানি না, হয়তো আগামীতে উত্তরণ ঘটবে এ অবস্থা থেকে। কিন্তু পুরানো মানসিকতা পুষে কি নতুনে উত্তরণ সম্ভব? প্রশ্ন আছে অনেক, উত্তরও তো জানা।
ফাগুন তোর চলে যাওয়ার একাশিতম মাস আজ। একুশ তারিখ। একুশে ফেব্রুয়ারি। শোক দিবস। কিন্তু দেখ চারিদিকে ফুল বিক্রির উৎসব। আমরা তো মৃত্যুকেও উৎসব বানিয়ে ফেলি। প্রায় দু’হাজার শহিদের প্রাণের বিনিময়ে যেমন ভোট উৎসব। ক্ষমতার পালাবদল। ক্ষমতাবানদের আনন্দিত মুখ। শপথ অনুষ্ঠান। ফুলের মালা। উৎসব নয়?
কিন্তু যে পরিবারগুলো থেকে ফাগুন তোর মতন অনেকেই চলে গেল, শহিদ হলো, তাদের পরিবারে, আমার পরিবারে কি উৎসবের ছোঁয়া আছে? নেই। আমরা শুধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’র মতন দেখি, ভেতর বাড়ির রাস উৎসব। আমরা মূলত ভিখিরি। আর ভেতরের রাস উৎসবে মাতোয়ারা সামন্তরা। সেই ভৃত্য আর মনিবের আখ্যান। জানি, এর থেকে বেরোনোর কোনো উপায় নেই আপাতত। অথচ বেরুনোটা ভীষণ জরুরি।
ফাগুন তোর নিথর হয়ে যাওয়া বিস্মিত চোখ আমার স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছে। তোর চোখে প্রশ্ন আর বিস্ময় ছিল। আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের চোখও ধারণ করবে সেই বিস্ময় আর প্রশ্ন। সেই প্রশ্নে শুধু একটি শব্দ, ‘কেন?’ কেন ফাগুন তথা শহিদেরা জীবন দেয়। কেন শহিদের লাশ হয়ে ওঠে ক্ষমতার সিঁড়ি!
শহিদ আনাসের মা’র প্রশ্নের পর মূলত আর কোনো প্রশ্ন, কিছু লেখার থাকে না। শুধু থাকে অপেক্ষা। শেষ করি নিজের লেখা কবিতা থেকে উদ্ধৃত করে।
‘এ ভূখণ্ড মৃতদের
এ মাটি শস্য নয়, কবরের যোগ্য হয়ে উঠেছে’।

