Logo
Logo
×

অভিমত

পুরানো কৌশলে নয়া সরকারকে হিরক রাজা বানাতে চাইছে স্তাবকরা

কাকন রেজা

কাকন রেজা

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম

পুরানো কৌশলে নয়া সরকারকে হিরক রাজা বানাতে চাইছে স্তাবকরা

স্তুতি আর স্তাবকতা আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট হতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। এই স্তুতি ছিল গণমাধ্যমের, স্তাবক ছিলেন সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা। সেই প্রবণতা আবার দেখা যাচ্ছে চব্বিশ পরবর্তী বাংলাদেশে। সংখ্যায় অল্প হলেও, এই শ্রেণির স্তুতি ও স্তাবকদের আবার ভোকাল হতে দেখা যাচ্ছে, শোনা যাচ্ছে, পড়া যাচ্ছে। 

একটা দেশ সঠিক চলতে গেলে জবাবাদিহিতার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। শুধু সংসদ নয়, বিরোধী দল নয়, এই জবাবদিহিতার বড় অংশই তৈরি হয় সংসদের বাইরে। গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবীরা এই অংশ। তারা প্রেসার গ্রুপ হিসেবে তৈরি করে বিকল্প সংসদ। যাকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। চার পিলারের এক পিলার। যা ছাড়া রাষ্ট্র নামক ঘরটি দাঁড়াতে পারে না। রাষ্ট্র নামক ঘরটি যেন দাঁড়াতে না পারে তার প্রচেষ্টা বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্মলগ্ন থেকেই চালু রয়েছে। ঘর এবং বাইরের শত্রুরা নানান ভাবে এই রাষ্ট্রটিকে অকার্যকর করে আধিপত্যবাদের পোষ্য রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে। আর এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে কার্যকর পন্থা হচ্ছে স্তাবক সৃষ্টি। 

‘হিরক রাজার দেশে’ এর বড় উদাহরণ। বিদ্যালাভে লোকসান, নাই অর্থ নাই মান। আমাদেরও অবস্থা তাই।  ১০০ শতাংশ পাশের চক্করে শিক্ষা ব্যবস্থাটাই নাই করে দিয়েছে বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিম। এখনও যে খুব বেশি উন্নতি হবে তার লক্ষণ নেই। কারণ আমাদের কাণ্ডারি, যারা হাল ধরেছেন তারা এখনও নব্বইয়ের রাজনৈতিক কালচারে টিউনড। কিন্তু বিশ্ব এগিয়ে গেছে অনেকদূর। ছাব্বিশের এই কালে যদি নব্বইয়ের কানুন চালু করা হয়, তা হবে হাস্যকর। সুতরাং যা হচ্ছে, তা দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পাল্টানো সম্ভব নয়। 

জেনারেশন জেড যারা বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে। বাক্‌স্বাধীনতা দিয়েছে, দেশকে গড়ে তোলার একটা সুযোগ দিয়েছে। তাদেরকে বেয়াদব বলার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে এগিয়ে আছেন বাংলাদেশের মাথামোটা সেলিব্রেটিদের কেউ কেউ। এই শ্রেণির মর্কটদের কার্যকলাপে হিরক রাজার সেই সংলাপটি মাথায় আসে। ‘ওরা যত বেশি পড়ে, তত বেশি জানে, তত কম মানে’। জেনারেশন জেডকে এই মর্কটদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে। ওদের দোষ, ওদেরকে যুক্তিতে হারানো যায় না। আরোপিত কিছুতে বিশ্বাস করানো যায় না। ধমক দিয়ে থামানো যায় না। সুতরাং স্তাবকদের জেনারেশন জেড নিয়ে সমস্যা হওয়ারই কথা। সেই স্তাবকদের যারা দেশটাকে ‘হিরক রাজার দেশ’ বানাতে চায় এবং নয়া সরকারকে ‘হিরক রাজা’। সুতরাং সরকারকে এদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে। 

‘অনাহারে নাহি খেদ, বেশি খেলে বাড়ে মেদ’। হিরক রাজার আরেকটি প্রিয় সংলাপ। চব্বিশ পরবর্তী বাংলাদেশে স্তাবকগণ এই সংলাপটি চালু করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। কার যেন আলাপ শুনলাম, বলছেন, ‘নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দ্রব্যমূল্য কমেছে’। এই ধরনের স্তাবকের স্তুতিতে সরকার যদি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন, তাহলে সেই নিঃশ্বাস দীর্ঘশ্বাস হতে সময় নেবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে তুলনা করলে, এবারের রোজায় দ্রব্যমূল্য বেশি, অনেকটাই বেশি। সুতরাং এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে যদি কেউ বলে নিয়ন্ত্রণের কথা, সেই কণ্ঠস্বর সরকারের জন্য বেশি জরুরি। স্তুতির বদলে, স্তাবকদের চেয়ে সমালোচকরাই কখনো বড় বন্ধু হয়ে ওঠে, এ কথা সরকার যত বেশি উপলব্ধি করতে পারবে, সরকারের আয়ু তত বাড়বে। 

সরকারের বড় বিপদ হলো এই স্তাবকদের আশ্কারা দেয়া। আওয়ামী রেজিমে একপাল সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী নামধারী মন্দবুদ্ধির মানুষেরা ফ্যাসিস্ট সুপ্রিমোকে যেভাবে তোয়াজ করতো তাতে সে ভেবে নিয়েছিল তারচেয়ে শ্রেষ্ঠ শাসক পৃথিবীতে নেই। ফলে চব্বিশের ৩৬ জুলাই পতনের দিনেও সেই ফ্যাসিস্ট সুপ্রিমো বিশ্বাস করতে পারেনি, আসলেই রেভ্যুলেশন ঘটে গিয়েছে। এই স্তাবকরা এমন ভয়াবহ ইউটোপিয়া সৃষ্টি করে রেখেছিল সেই সময়। 

এখনও সেই চেষ্টা চলছে। এই সময়েও দেখতে পাচ্ছি সেই একই রকম স্তুতি, স্তাবকতা। তারা বলতে চেষ্টা করছে, বলাতে চেষ্টা করছে, ‘যায় যদি যাক প্রাণ, হিরকের রাজা ভগবান’। অর্থাৎ নতুন সরকারকে তারা ‘হিরক রাজা’ বানানোর সকল চেষ্টা জারি রেখেছে। এদের থেকে সাবধান হতে হবে, দূরে থাকতে হবে। না-হলে নয়া সরকারকেও তারা দ্রুত অজনপ্রিয় বানিয়ে ছাড়বে। যার নমুনা দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। দখল, খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজির ঘটনা মানুষের জানার বাইরে নেই। 

অবশ্য কেউ কেউ গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করছে, যাতে এসব খবর খুব বেশি প্রকাশ না হয়। আগেই বলেছি, দেশটা আর নব্বুই দশকে নেই। এখন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করলেও খবর ছড়াতে সময় নেয় না। সোশ্যাল-মিডিয়া এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। সিটিজেন জার্নালিজম এখন মেইনস্ট্রিম জার্নালিজমকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। স্তুতি ও স্তাবকতা অ্যাস্টাব্লিশ করার চেষ্টায় মেইনস্ট্রিম জার্নালিজম এখন বারোটা বাজার দ্বারপ্রান্তে। বিপরীতে সোশ্যাল-মিডিয়া বন্ধ করার উপায়ও নেই। বন্ধ করার চেষ্টা বরং উল্টো ফল দেবে। 

স্তুতির স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়ার মতন বড় বিপদ আর কিছু নেই। পতিত রেজিম যার প্রমাণ। স্তাবকদের দূরে থাকার কোনো বিকল্প নেই। নয়া সরকার এই বিষয়টা যত দ্রুত অনুধাবন করতে পারবে, যত দ্রুত স্তাবকদের সরিয়ে দিতে পারবে, ততই তাদের আয়ু বৃদ্ধি পাবে। নইলে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। মনে রাখতে হবে, জেনারেশন জেড এর নেতৃত্বে আপামর মানুষ একটি ভয়াবহ রেজিম, জগদ্দল পাথরের মতন যা আমাদের বুকের উপর চেপে বসেছিল, তাকে তাড়াতে পেড়েছে। অতএব, মানুষের ভয় ভেঙে গেছে, তাদেরকে আর বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিমের মতন ভয় দেখিয়ে জয় করা যাবে না, ভালোবেসে এবং কাজ দেখিয়েই জয় করতে হবে।

Logo

ই-মেইল: [email protected]

অনুসরণ করুন