• ঢাকা
  • ঢাকা, শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ২ মিনিট পূর্বে
এটিএম মহিবুল্লাহ
লেখক, শিক্ষক ও গবেষক
প্রকাশিত : ১০ মে, ২০২৬, ০৮:৫৮ রাত

বাল্যবিবাহ: আইন আছে, কিন্তু বাস্তবতার গভীর সংকট আইন, সমাজ ও আচরণগত পরিবর্তনের অনিবার্য চ্যালেঞ্জ

ছবি: গ্রাফিক্স আর্ট

এটিএম মহিবুল্লাহ: বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ এখনো একটি গভীর ও জটিল সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। আইন আছে, নীতি আছে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও রয়েছে। তবুও বাস্তবতা বলছে অসংখ্য কিশোরী ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ের বন্ধনে জড়িয়ে পড়ছে। এই বৈপরীত্য আছে শুধু আইন প্রয়োগের দুর্বলতা নয়, বরং সমাজের ভেতরে গেঁথে থাকা অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক মানসিকতার প্রতিফলন।

বাল্যবিবাহকে তাই আলাদা কোনো ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। এটি একাধিক কাঠামোগত কারণের সমন্বিত ফলাফল, যেখানে দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক চাপ এবং পরিবারভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি একসঙ্গে কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি “স্বাভাবিক সামাজিক সিদ্ধান্ত” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, যা সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ মেয়ের বিয়ে ১৮ বছরের আগেই হয়ে যায়। গ্রামীণ এলাকায় এই হার আরও বেশি, কিছু কিছু অঞ্চলে তা ৬০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য, শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকা এবং সামাজিক নজরদারির ভিন্নতা এই ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে তোলে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে, কারণ স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া, পরিবারের আয় কমে যাওয়া এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে অনেক পরিবার মেয়েদের ভবিষ্যৎকে বিয়ের মাধ্যমে “নিরাপদ” করার চেষ্টা করে।

বাল্যবিবাহের কারণ বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই দারিদ্র্যকে সামনে আনতে হয়। অনেক পরিবারে মেয়েকে অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখা হয় এবং মনে করা হয় যে বিয়ে দিয়ে দিলে পরিবারের খরচ কমবে এবং সামাজিক দায় কিছুটা কমবে। এর পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, মেয়েরা বড় হলে তারা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে, তাই দ্রুত বিয়ে দেওয়াই তাদের নিরাপত্তার একমাত্র পথ।

এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক চাপ এবং লোকলজ্জার ভয়। “সময়মতো বিয়ে না দিলে সমাজ কী বলবে” এই প্রশ্ন অনেক পরিবারকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। একইসঙ্গে যৌতুক প্রথা এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের বাস্তবতাও এখানে প্রভাব ফেলে, কারণ অনেক পরিবার মনে করে বয়স বাড়লে বিয়ের খরচ ও চাপ আরও বেড়ে যাবে। কোথাও কোথাও ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভুল প্রয়োগও এই সামাজিক প্রবণতাকে শক্তিশালী করে, যদিও মূল ধর্মীয় শিক্ষা কখনোই বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করে না।

আইনগত দিক থেকে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যেখানে মেয়েদের ন্যূনতম বয়স ১৮ এবং ছেলেদের ২১ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। অনেক জায়গায় ভুয়া জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করা হয়, কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে দ্রুত বিয়ে সম্পন্ন করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নজরদারি দুর্বল থাকায় এসব ঘটনা সহজেই ঘটে যায়। ফলে আইন থাকা সত্ত্বেও এর কার্যকারিতা অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়।

বাল্যবিবাহের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির উৎস। অল্প বয়সে গর্ভধারণের কারণে মাতৃমৃত্যু, অপুষ্টি, শারীরিক জটিলতা এবং মানসিক চাপের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একইসঙ্গে বিয়ের পর অধিকাংশ মেয়ের শিক্ষাজীবন বন্ধ হয়ে যায়, যা তাদের ভবিষ্যৎকে সীমিত করে দেয় এবং অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল করে তোলে। এই নির্ভরশীলতা দারিদ্র্যের চক্রকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান রাখে।

নারীর ক্ষমতায়নের দৃষ্টিকোণ থেকেও বাল্যবিবাহ একটি বড় বাধা। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়, সামাজিক অংশগ্রহণ কমে আসে এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। ফলে এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিশ্ব পরিস্থিতিও একইভাবে উদ্বেগজনক। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার কন্যাশিশুর বিয়ে ১৮ বছরের আগে সম্পন্ন হয়। নাইজার, চাদ, দক্ষিণ সুদান, ভারত এবং বাংলাদেশ এই সমস্যার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত। যুদ্ধ, শরণার্থী সংকট এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সিরিয়া, ইয়েমেন এবং রোহিঙ্গা শিবিরের অভিজ্ঞতা দেখায়, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা অনেক সময় বাল্যবিবাহকে “সমাধান” হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য করে, যদিও বাস্তবে এটি নতুন ঝুঁকি তৈরি করে।

সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় বাল্যবিবাহকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা ধর্মীয় অনুমোদনের আলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রথাই যদি শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের এখানে দায়িত্ব রয়েছে সঠিক ব্যাখ্যা ও সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া, কারণ তাদের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি কার্যকর।

এই সমস্যার সমাধানে সামাজিক বিপণন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তথ্যের পাশাপাশি আবেগ, গল্প এবং সামাজিক প্রভাব মানুষের আচরণ পরিবর্তনে বেশি কার্যকর। নরওয়ের প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের “Thea’s Blog” প্রচারণা এর একটি উদাহরণ, যেখানে একটি কিশোরীর কাল্পনিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জনমনে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া তৈরি করা হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে, সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে শুধু পরিসংখ্যান নয়, মানবিক গল্পও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্যোগ, কিশোরী ক্লাব, স্কুল কার্যক্রম, স্থানীয় সাংস্কৃতিক মাধ্যম এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক আলোচনা কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন হেল্পলাইন, গোপন অভিযোগ ব্যবস্থা এবং দ্রুত প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে একক কোনো সমাধান নেই। আইন, শিক্ষা, অর্থনৈতিক সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয় প্রশাসনের জবাবদিহি এবং মানসিকতার পরিবর্তন সবকিছুর সমন্বিত প্রয়াস প্রয়োজন। সমাজকে বুঝতে হবে, একটি মেয়ের শৈশব কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একটি সমাজের অগ্রগতি এবং একটি জাতির টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি খুবই স্পষ্ট যে বাল্যবিবাহ নামের এই গভীর সামাজিক সংকটকে পরিবর্তনের পথে নেওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে, নাহলে এটি অভ্যাস আর নীরবতার ছায়ায় আরও দীর্ঘায়িত হতে থাকবে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক

(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম- এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]