গ্রীষ্মের তীব্র গরমে এয়ার কন্ডিশনার এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য প্রয়োজন। বাংলাদেশে তাপমাত্রা যখন ৩৫-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন ঘরে এসি থাকা মানে আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের নিশ্চয়তা। কিন্তু বাজারে অসংখ্য ব্র্যান্ড ও মডেলের এসি থাকায় সঠিকটি বেছে নেওয়া কঠিন হতে পারে। এই প্রতিবেদনে আপনি আপনার বাসা-বাড়ির জন্য সঠিক এসি কীভাবে নির্বাচন করবেন, তা সহজে জেনে নিতে পারবেন।
এসি কেনার আগে যা জানা জরুরি:
এসি কেনা একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। একটি ভালো মানের এসি ১০-১৫ বছর পর্যন্ত চলতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখতে হবে। প্রথমেই আপনার রুমের আকার, কতজন মানুষ থাকেন, রুমে রোদ কতটা পড়ে এবং আপনার বাজেট কেমন, তা জেনে নিন। এই বিষয়গুলো বুঝলেই সঠিক এসি বাছাই করা সহজ হবে।
রুমের আকার অনুযায়ী টন নির্বাচন:
এসি কেনার সময় সবচেয়ে বড় ভুল হয় টন নির্বাচনে। অনেকে মনে করেন, বড় টনের এসি মানেই ভালো ঠান্ডা। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। রুমের আকারের তুলনায় বেশি টনের এসি কিনলে বিদ্যুৎ খরচ বেশি হবে, কিন্তু ঠান্ডা ভালো হবে না। আবার কম টনের এসি কিনলে রুম ঠিকমতো ঠান্ডা হবে না এবং এসি সবসময় চাপ নিয়ে চলবে, ফলে তাড়াতাড়ি নষ্ট হবে।
সাধারণত, ১০০ বর্গফুট রুমের জন্য ১ টন এসি প্রয়োজন। যদি আপনার রুম ১০০-১৩০ বর্গফুট হয়, তাহলে ১ টন এসি যথেষ্ট। ১৩০-১৮০ বর্গফুট রুমের জন্য ১.৫ টন এসি ভালো কাজ করবে। আর ১৮০-২৫০ বর্গফুট বড় রুম বা হলরুমের জন্য ২ টন এসি দরকার। তবে শুধু আকার দেখলেই হবে না, রুমে কতজন মানুষ থাকে, রোদ সরাসরি পড়ে কিনা, কম্পিউটার বা অন্য ইলেকট্রনিক যন্ত্র আছে কিনা, এসবও হিসাব করতে হবে। যদি রুমে সরাসরি রোদ পড়ে, তাহলে আধা টন বেশি নেওয়া ভালো।
স্প্লিট এসি নাকি ফ্লোর স্ট্যান্ডিং এসি:
বাজারে মূলত দুই ধরনের এসি বেশি দেখা যায়: স্প্লিট এসি এবং ফ্লোর স্ট্যান্ডিং বা ক্যাসেট এসি। বাসা-বাড়ির জন্য স্প্লিট এসিই সবচেয়ে জনপ্রিয় ও উপযুক্ত। স্প্লিট এসিতে একটি ইউনিট রুমের ভেতরে দেয়ালে লাগানো থাকে এবং অন্য ইউনিট বাইরে রাখা হয়। এতে শব্দ কম হয়, দেখতে সুন্দর লাগে এবং রুমের জায়গা কম নেয়। অন্যদিকে, উইন্ডো এসি এখন প্রায় পুরোনো হয়ে গেছে। এতে শব্দ বেশি হয় এবং ইনস্টলেশন জটিল, তবে দাম কিছুটা কম হয়। ফ্লোর স্ট্যান্ডিং এসি সাধারণত অফিস বা বড় হলরুমের জন্য ব্যবহার করা হয়। সাধারণ বেডরুমের জন্য স্প্লিট এসিই সবচেয়ে ভালো পছন্দ।
ইনভার্টার এসি বনাম নন-ইনভার্টার এসি:
এসি কেনার সময় আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত হলো ইনভার্টার এসি নেবেন নাকি নন-ইনভার্টার। দামের দিক থেকে নন-ইনভার্টার এসি সস্তা, কিন্তু বিদ্যুৎ খরচ অনেক বেশি হয়। নন-ইনভার্টার এসি চালু হওয়ার পর পুরো ক্ষমতায় চলে এবং রুম ঠান্ডা হলে বন্ধ হয়ে যায়। আবার গরম হলে চালু হয়। এভাবে ঘন ঘন চালু-বন্ধ হওয়ায় বিদ্যুৎ বেশি খরচ হয় এবং কম্প্রেসরের ক্ষতি হয়।
ইনভার্টার এসি অনেক স্মার্ট। এটি রুমের তাপমাত্রা অনুযায়ী নিজে নিজে গতি কমায় বা বাড়ায়। রুম ঠান্ডা হলে বন্ধ না হয়ে কম পাওয়ারে চলতে থাকে। ফলে বিদ্যুৎ খরচ ৪০-৬০% পর্যন্ত কমে যায়। প্রথমে কিনতে দাম বেশি মনে হলেও বিদ্যুৎ বিলে যে সাশ্রয় হয়, তাতে ২-৩ বছরেই এই অতিরিক্ত টাকা উঠে আসে। তাছাড়া, ইনভার্টার এসি ঠান্ডাও বেশি সমানভাবে দেয় এবং কম শব্দ করে। তাই যদি বাজেট একটু বেশি হয়, তাহলে অবশ্যই ইনভার্টার এসি কিনুন।
এনার্জি রেটিং এবং বিদ্যুৎ খরচ:
এসি কেনার সময় এনার্জি রেটিং লেবেল খুব ভালোভাবে দেখে নিন। সরকার অনুমোদিত এনার্জি রেটিং স্টিকার এসিতে লাগানো থাকে। এই রেটিং ১ স্টার থেকে ৫ স্টার পর্যন্ত হয়। ৫ স্টার মানে সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ খরচ এবং ১ স্টার মানে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ খরচ। অনেকে দোকানদারের কথা শুনে সস্তা এসি কিনে ফেলেন যার এনার্জি রেটিং কম। কিন্তু পরে মাসে মাসে যখন হাজার হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে, তখন বুঝতে পারেন ভুল হয়েছে। মনে রাখবেন, একটি ১.৫ টন নন-ইনভার্টার এসি মাসে ৩,০০০-৪,৫০০ টাকা বিদ্যুৎ খরচ করতে পারে। অন্যদিকে, ৫ স্টার ইনভার্টার এসি একই ব্যবহারে ১,৫০০-২,০০০ টাকা খরচ করবে। বছরে ২০,০০০-৩০,০০০ টাকা সাশ্রয় হবে। তাই প্রথমে কিছুটা বেশি খরচ করে ভালো রেটিং-এর এসি কিনুন।
ব্র্যান্ড নির্বাচন এবং ওয়ারেন্টি:
বাংলাদেশে অনেক ব্র্যান্ডের এসি পাওয়া যায়। জাপানিজ ব্র্যান্ড যেমন ডাইকিন (Daikin), মিৎসুবিশি (Mitsubishi), প্যানাসনিক (Panasonic) মান ভালো কিন্তু দাম বেশি। কোরিয়ান ব্র্যান্ড যেমন স্যামসাং (Samsung), এলজি (LG) মধ্যম দামে ভালো মান দেয়। চাইনিজ ব্র্যান্ড যেমন গ্রী (Gree), মিডিয়া (Midea), চিগো (Chigo) দামে সস্তা কিন্তু মান এবং সার্ভিস নিয়ে মিশ্র অভিজ্ঞতা আছে। দেশীয় ব্র্যান্ড ওয়াল্টন (Walton) বাজেট-বান্ধব এবং সার্ভিস পাওয়া সহজ।
ব্র্যান্ড যাই হোক, অবশ্যই অথরাইজড ডিলার বা শোরুম থেকে কিনবেন। ওয়ারেন্টি কার্ড ভালোভাবে চেক করুন। সাধারণত এসিতে ১ বছর যন্ত্রাংশ ও সার্ভিস ওয়ারেন্টি থাকে এবং কম্প্রেসরে ৫ বছরের ওয়ারেন্টি থাকে। কিছু কোম্পানি ১০ বছর পর্যন্ত কম্প্রেসর ওয়ারেন্টি দেয়। এটি একটি বড় সুবিধা কারণ কম্প্রেসর হলো এসির হার্ট, এটি নষ্ট হলে মেরামত খরচ অনেক বেশি।
ইনস্টলেশন এবং সার্ভিসিং:
এসির পারফরম্যান্স অনেকটাই নির্ভর করে সঠিক ইনস্টলেশনের ওপর। কোম্পানির নিজস্ব টেকনিশিয়ান দিয়ে লাগান। ইনডোর ইউনিট এমনভাবে লাগাতে হবে যাতে বাতাস পুরো রুমে ছড়ায়। আউটডোর ইউনিট ছায়াযুক্ত জায়গায় এবং ভালো বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে রাখতে হবে। গ্যাস লিকেজ যাতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নিয়মিত সার্ভিসিং খুবই জরুরি। প্রতি ৩-৪ মাসে একবার ফিল্টার পরিষ্কার করুন। বছরে অন্তত একবার পেশাদার সার্ভিসিং করান। গ্যাস চেক করান এবং প্রয়োজনে ভরান। এতে এসির পারফরম্যান্স ভালো থাকবে এবং আয়ু বাড়বে। অনেকে এসি কিনে বছরের পর বছর কোনো সার্ভিস করান না। ফলে ধুলাবালি জমে যায়, পারফরম্যান্স কমে যায় এবং বিদ্যুৎ বেশি খরচ হয়।
অতিরিক্ত ফিচার এবং স্মার্ট ফাংশন:
আজকালকার এসিতে অনেক স্মার্ট ফিচার থাকে। ওয়াইফাই (WiFi) কানেক্টিভিটি থাকলে মোবাইল অ্যাপ থেকে এসি চালু-বন্ধ করা যায়। অফিস থেকে ফেরার আগেই ঘর ঠান্ডা করে নিতে পারবেন। স্লিপ মোড থাকলে রাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাপমাত্রা সামঞ্জস্য করে, ফলে ঠান্ডা লেগে যাওয়ার ভয় থাকে না এবং বিদ্যুৎও সাশ্রয় হয়। টার্বো মোড বা ফাস্ট কুলিং ফিচার থাকলে খুব গরমে দ্রুত রুম ঠান্ডা করতে পারবেন। ডিহিউমিডিফায়ার ফাংশন বর্ষাকালে রুমের স্যাঁতসেঁতে ভাব দূর করে। এয়ার পিউরিফায়ার ফিল্টার থাকলে ধুলাবালি এবং ব্যাকটেরিয়া দূর করে বাতাস পরিষ্কার করে। তবে এসব ফিচার বেশি থাকলে দামও বেশি হয়। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী ফিচার বেছে নিন।
বাজেট অনুযায়ী পরামর্শ:
যদি আপনার বাজেট খুবই সীমিত থাকে এবং ৩২,০০০-৪০,০০০ টাকায় ১ টন এসি চান, তাহলে গ্রী (Gree), চিগো (Chigo) বা ওয়াল্টন (Walton) ব্র্যান্ডের নন-ইনভার্টার এসি দেখতে পারেন। তবে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসবে, তা মাথায় রাখবেন।
মাঝারি বাজেট ৫০,০০০-৮০,০০০ টাকায় ১.৫ টন এসি কিনতে চাইলে এলজি (LG), স্যামসাং (Samsung), ওয়াল্টন (Walton) এর ইনভার্টার এসি ভালো অপশন। এগুলো দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী এবং টেকসই।
যদি বাজেট ভালো হয় ১,০০,০০০-১,৫০,০০০ টাকা, তাহলে ডাইকিন (Daikin), মিৎসুবিশি (Mitsubishi), প্যানাসনিক (Panasonic) এর ৫ স্টার ইনভার্টার এসি নিতে পারেন। এগুলো সেরা মানের, সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ খরচ করে এবং ১৫-২০ বছর চলবে।
বাসা-বাড়ির জন্য সঠিক এসি বেছে নেওয়া মোটেও কঠিন কাজ নয়, যদি আপনি কিছু মৌলিক বিষয় জানেন। রুমের আকার অনুযায়ী টন নির্বাচন করুন, ইনভার্টার এসি বেছে নিন, এনার্জি রেটিং ৪ বা ৫ স্টার দেখে কিনুন, ভালো ব্র্যান্ড এবং সার্ভিস সাপোর্ট আছে এমন কোম্পানির পণ্য নিন। সঠিক ইনস্টলেশন করান এবং নিয়মিত সার্ভিসিং করান। মনে রাখবেন, এসি কেনা মানে শুধু একটি যন্ত্র কেনা নয়, এটি আপনার পরিবারের আরাম এবং স্বাস্থ্যের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ। তাই তাড়াহুড়ো না করে ভালোভাবে যাচাই করে কিনুন। প্রয়োজনে বিভিন্ন শোরুমে গিয়ে দাম এবং ফিচার তুলনা করুন। অনলাইনে রিভিউ পড়ুন। তাহলে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারবেন যে সঠিক এসি কিনেছেন, যা আগামী অনেক বছর আপনার পরিবারকে গরম থেকে স্বস্তি দেবে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর