দেশের ভোকেশনাল স্কুলগুলোতে জাপানি ভাষা শেখানো হোক
এমএম সালাহউদ্দিন
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০২:৩০ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশে দেড় শতাধিক সরকারি টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রসহ (টিটিসি) মোট ১১০টি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বছরে ১২ লাখের বেশি প্রশিক্ষণার্থীকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
এগুলো বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (বিটিইবি)-এর অধীনে এস.এস.সি (ভোকেশনাল) এবং এইচ.এস.সি (ভোকেশনাল) কোর্স পরিচালনা করছে। কেবল মাত্র ঢাকা বিভাগেই ৩২টি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ রয়েছে।
এছাড়াও সরকার দেশের প্রতিটি উপজেলায় পর্যায়ক্রমে একটি করে সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ (টিএসসি) স্থাপন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
সরকারি টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলোতে মূলত হাতে-কলমে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদান করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনবল ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা। প্রতিষ্ঠানভেদে বিভিন্ন মেয়াদি ডিপ্লোমা, ট্রেড ও ভোকেশনাল কোর্স করানো হয়।
এখন সময় এসেছে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিদেশি ভাষা বিশেষ করে জাপানি ভাষা শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া।
এশিয়ার উন্নত দেশ জাপানের ক্রমবর্ধমান শ্রমবাজারে দক্ষ বিদেশি জনশক্তির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশের তরুণরা তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন পেশাগত দক্ষতায় এগিয়ে রয়েছেন।
তাদের জাপানি ভাষায় দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব, যা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হবে। এ কারণেই সরকারের উচিৎ ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুগোপযোগী করে তোলার।
এ ক্ষেত্রে ইংরেজি ও কোরিরীয় ভাষার পাশাপাশি প্রতিটি ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাপানি ভাষার শিখার প্রশিক্ষণ এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিলেই জাপানের শ্রম বাজারে বাংলাদেশি যুবকরা অনায়াসেই প্রবেশ করতে পারে।
জাপানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রচুর চাহিদা থাকায় এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি ও সরকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যথাযথ উদ্যোগই বিপুল অঙ্কের রেমিটেন্স আনতে পারে দেশে।
জাপানে কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা দিন দিন কমতে থাকায় দেশটিতে বাংলাদেশি শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। আগামী পাঁচ বছরে জাপানে এক লাখ বাংলাদেশি শ্রমিকে পাঠানো যাবে। তবে, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জাপানি ভাষা ও প্রশিক্ষণের অভাবে এ সময়ের মধ্যে এক লাখ শ্রমিক আদৌ পাঠানো সম্ভব হবে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের সামান্য উদ্যোগই এটা সম্ভব করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ ছাড়া, জাপান-ফেরত দক্ষ বাংলাদেশিরদের আবারও জাপান পাঠানোর উদ্যোগ নিতে পারে সরকার। কারণ অনেক দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী শুধুমাত্র ভিসা জটিলতার জন্য জাপান থেকে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে ১০-১২ বছর বসবাস করার পরও কেবলমাত্র ওভারস্টে করার কারণে অভিবাসন পুলিশের হাতে আটক হয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। এ সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। ৩০ হাজারেরও বেশি জাপান ফেরত বাংলাদেশি রয়েছেন। তারা একাধারে জাপানি ভাষায় পারদর্শী, জাপানি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত এবং সর্বোপরি জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ করতে অভ্যস্ত। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরাও বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতি বেশ সন্তুষ্ট।
বাংলাদেশিরা বরাবরই জাপানিদের কাছে মাজিমে অর্থাৎ দায়িত্বশীল ও আন্তরিক কর্মী হিসেবে পরিচিত। এখন বাংলাদেশ সরকার যদি জাপান সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে জাপান-ফেরত এসব দক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাঠানোর বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে প্রথম দিন থেকেই জাপান গিয়ে তারা কাজ করতে পারবেন।
যেখানে একজন প্রশিক্ষণার্থী কর্মীর বেতন হবে মাত্র এক থেকে দেড় লাখ টাকা, সেখানে দক্ষ শ্রমিকরা প্রথম দিন থেকেই বেতন পাবেন কমপক্ষে আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা। আর এটা জাপান সরকারের সঙ্গে একটা সমঝোতা স্বারকের মাধ্যমে করা সরকারের পক্ষে সম্ভব। তাছাড়া, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জসহ বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে ৩টি জাপানি শিল্পাঞ্চল। জাপানি ভাষা ও প্রশিক্ষণ থাকলে এসব প্রতিষ্ঠানেও বাংলাদেশিরা উচ্চ বেতনে চাকরি করতে পারবেন।
জাপান শ্রম রপ্তানির উন্মুক্ত বিশাল বাজার। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ১৬টি ক্যাটাগরিতে (সাধারণ শ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিকাজ ও কেয়ার গিভারসহ) দেশটিতে শ্রম রপ্তানির বিশাল সুযোগ রয়েছে।
অবারিত সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ থেকে খুবই স্বল্প সংখ্যক শ্রমিক জাপান যেতে সক্ষম হন। বাংলাদেশ পর্যাপ্ত সংখ্যক শ্রমিক পাঠাতে ব্যর্থ হলেও প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, চীন ও ভিয়েতনাম থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শ্রমিক দেশটিতে যাচ্ছেন এবং তাদের জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
জাপান ফেরত বাংলাদেশি কর্মীদের সংগঠন জেবিএফজির (জাপান-বাংলাদেশ ফেন্ডশিপ গ্রুপ) মহাসচিব আপেল মাহমুদ বলেন, আমি দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে জাপান ছিলাম। প্রথম চার বছর নিয়মিত ক্লাস করেছি এবং পাশাপাশি খণ্ডকালীন চাকরিও করতাম; কিন্তু কাজ করে যে টাকা উপার্জন করতাম, বছর শেষে টিউশন ফি বাবদ তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই জমা দিতে হতো।
এজন্য একপর্যায়ে ক্লাস বন্ধ করে পূর্ণকালীন (ফুল টাইম) কাজে যোগ দিলাম। ফলে আমার ভিসার মেয়াদ আর বাড়লো না। এ সময় জাপানের অভিবাসন পুলিশের হাতে আটক হয়ে দেশে ফিরে আসতে হয়েছে।
তাই সরকারের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ ভাষা শিখিয়ে নতুনদের পাঠানো পাশাপাশি আমাদের মতো দক্ষ শ্রমিক যারা শুধু ভিসা জটিলতায় ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছি, আমাদের পাঠানোর ব্যাপারে জাপান সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করুন। কারণ, জাপানে কর্মীদের বয়স বিবেচনা খুব একটা করে না, তারা কাজের দক্ষতা বিচার করে কর্মী নিয়োগ করে থাকে।
সম্প্রতি জাপানে দেশটির সরকারের ভিসা সংক্রান্ত বিষয়ে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে কড়া নীতির প্রতিবাদে টোকিও ইমিগ্রেশনের সামনে দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকরা প্রতিবাদ সভা করেছেন।
প্রতিবাদকারীরা বিদেশি নাগরিকদের ভিসার নিয়ম সহজতর করা, বিদেশিদের প্রতি ইজিমে তথা বিদ্রূপ বা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য না করা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্মানের মর্যাদার সম্পর্ক বিনির্মানের দাবি তোলেন তারা।
উল্লেখ্য, জাপানে বিদেশি উদ্যোক্তাদের ভিসা পাওয়ার নিয়ম আরও কঠোর হতে যাচ্ছে। অর্থাৎ বিদেশি উদ্যোক্তাদের আর সহজে ভিসা পাওয়া সম্ভব হবে না। কারণ নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী বিনিয়োগের ন্যূনতম অঙ্ক বাড়ানো হচ্ছে ছয় গুণ।
এখন থেকে ভিসা পেতে হলে উদ্যোক্তাদের কমপক্ষে ৩০ মিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ২ লাখ ৪ হাজার মার্কিন ডলার) বিনিয়োগ করতে হবে এবং জাপানে অন্তত একজনকে পূর্ণকালীন চাকরি দিতে হবে।
এর আগে এই ভিসার জন্য ন্যূনতম শর্ত ছিল ৫ মিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগ অথবা দুজন পূর্ণকালীন কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি একটি কার্যকর ব্যবসায়িক পরিকল্পনা জমা দেওয়া। এই ভিসাধারীরা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত জাপানে থাকতে পারতেন, পরে তা নবায়নের সুযোগও ছিল। পরিবারকেও সঙ্গে নেওয়া যেত এবং ১০ বছর পর স্থায়ী বসবাসের আবেদন করা যেত।
অভিবাসন সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ৪১ হাজার ৬০০ জন এই ভিসার অধিকারী ছিলেন। সংখ্যাটি আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ভিসাধারী ছিলেন চীনা নাগরিক।
জাপান-ফেরত বাংলাদেশিরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছেন, জাপান সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনে এ ব্যাপারে নতুন কোরও সমঝোতা স্বারকে স্বাক্ষর করে হলেও দক্ষ এসব বাংলাদেশি কর্মীদের জাপান পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হোক।
লেখক: সংবাদকর্মী ও জাপান প্রবাসী
