টিকি-টাকার ফাঁদে আবারও স্পেন

বল দখলে হিরো, গোল করায় বিগ জিরো!

Picsart_26-06-04_12-40-53-266
এম. এম. কায়সার

বল দখলে হিরো, গোল করায় বিগ জিরো!

সবার আগে একটা পরিসংখ্যান।
পুরো ম্যাচে ৭৪ শতাংশ বলের দখল। ৭৬৪টি সফল পাস। প্রতিপক্ষের গোলমুখে আটটি শট। এই পরিসংখ্যান দেখে মনে হবে, ম্যাচটি সহজেই জেতার কথা ছিল স্পেনের।
কিন্তু কী আফসোস! খেলার ফল কেপ ভার্দে ০, স্পেন ০। এই স্কোরশিটে কেপ ভার্দের নাম আগে থাকছে কারণ স্পেনের মতো শক্তিশালী দলকে গোটা ম্যাচে তারা আটকে রাখতে পেরেছে, এটাই বড় কৃতিত্ব। তাই এই সম্মান তাদের প্রাপ্য।
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে পয়েন্ট হারিয়ে স্পেন আরেকবার জানাল সেই চরম সত্যটা, ফুটবল শুধু বল দখলের খেলা নয়, জায়গা দখলেরও খেলা। আর ঠিক ওইখানেই হেরে গেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল।
স্পেনের পয়েন্ট হারানোর কারণ একটাই—অতিরিক্ত বল দখল, কিন্তু রক্ষণ ভাঙার কোনো কার্যকর পরিকল্পনা নেই। টিকি-টাকা ছিল, যাকে বলে চোর-পুলিশ খেলা। কিন্তু ছিল না ভার্টিকাল আক্রমণ, গতির পরিবর্তন কিংবা ডিফেন্স চিরে ফেলার মতো পাস। ফলে পুরো ম্যাচে বল ঘুরেছে স্পেনের পায়ে, কিন্তু গোলের হুমকি তৈরি হয়নি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিসংখ্যানটি স্প্যানিশ স্ট্রাইকার মিকেল ওইয়ারজাবালকে ঘিরে। ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটে তিনি একবারও বল স্পর্শ করতে পারেননি। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে এমন ঘটনা আর ঘটেনি। এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়, বরং স্পেনের পুরো আক্রমণভাগের ব্যর্থতার প্রতীক।

ট্যাকটিক্যাল ভুল কোথায়?
সমস্যার শুরু স্পেনের আক্রমণ তৈরির পরিকল্পনায়। জানাই ছিল স্পেনের শক্তির কথা মাথায় রেখে কেপ ভার্দে শুরু থেকেই লো ব্লকে ডিফেন্স সাজাবে। দুই ডিফেন্স লাইনের মাঝখানে প্রায় কোনো ফাঁকা জায়গাই ছিল না। কিন্তু সেই ব্লক ভাঙার জন্য যে ধরনের দ্রুত ও ডিরেক্ট আক্রমণের ফুটবল দরকার, স্পেন তার ধারে কাছেও যেতে পারেনি। বরং তারা একের পর এক পাসের পর পাস খেলেছে। বল শুধু নিজেদের কাছেই রেখেছে। দৃশ্যটা এমন, সেন্টার-ব্যাক থেকে মিডফিল্ড, মিডফিল্ড থেকে ফুল-ব্যাক, আবার মাঝমাঠে—বল শুধু একবার উপরে যাচ্ছে আবার নিচে নামছে। কিন্তু প্রতিপক্ষের শেষ ডিফেন্স ভাঙার চেষ্টা তেমন চোখে পড়ল কই।

প্রমাণ চান?
জলজ্যান্ত প্রমাণ তো স্ট্রাইকার মিকেল ওইয়ারজাবাল বলে স্পর্শ না করার রেকর্ডেই লেখা! যেন তিনি চলে গিয়েছিলেন বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপে! মাঠে ছিলেন, কিন্তু ম্যাচে ছিলেন না!
স্পেনের কৌশলগত বিন্যাসই স্ট্রাইকারকে খেলার বাইরে ঠেলে দিয়েছে। এত বলের দখল থাকার পরও তাকে কার্যকরভাবে বল সরবরাহ করতে পারেনি গোটা দল। হয়তো পরের ম্যাচে স্ট্রাইকার পজিশনে না খেলে নিজেকে মিডফিল্ডার হিসেবে খেলানোর দাবি করতে পারেন!

টিকি-টাকার পুরোনো রোগ
এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। ২০১৪ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস ও চিলির বিপক্ষে বলের দখলে এগিয়ে থেকেও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল স্পেন। ২০১৮ বিশ্বকাপে স্বাগতিক রাশিয়ার বিপক্ষে শেষ ষোলোয় এক হাজারের বেশি পাস খেলেও টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিতে হয়। ২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কোর বিপক্ষে ৭৭ শতাংশ বল দখলে রেখেও একটিও কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। ফল, আবারও টাইব্রেকারে বিদায়।
এবার ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেও সেই একই চিত্র। বল আছে, পাস আছে, নিয়ন্ত্রণ আছে—কিন্তু নেই গোল। একসময় যে টিকি-টাকা স্পেনকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বানিয়েছিল, এখন সেটিই যেন তাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। বৃহত্তর অর্থে সমস্যা!
- কী বুঝলেন?
টিকি-টাকা শুধু বিশ্বকাপ জেতায় না, প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায়ও করে দেয়!
বল নয়, দরকার ভাঙন
আধুনিক ফুটবলে শুধু বলের দখলই সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়। প্রয়োজন গতি, দিক পরিবর্তন, শেষ ডিফেন্স লাইন ভাঙা পাস, থার্ড ম্যান রান এবং ডিফেন্সের পেছনের ফাঁকা জায়গায় আক্রমণ। এই মৌলিক বিষয়গুলোই অনুপস্থিত ছিল স্পেনের খেলায়। স্পেনের ৭৬৪টি পাসের বড় অংশই পরিণত হয়েছে অর্থহীন পরিসংখ্যানে।
কেপ ভার্দে ভালোই জানত, স্পেন বল রাখার কৌশলই নেবে। তাই তারা ধৈর্য ধরে নিজেদের পোস্টে লো ব্লক কষে অপেক্ষা করেছে। স্পেনকে পাশের পাস খেলতে দিয়েছে, কিন্তু বক্সের সামনে এক ইঞ্চি জায়গাও দেয়নি। স্পেন শট নিয়েছে কিন্তু সেগুলো কেপ ভার্দের ডিফেন্সের দেয়ালে লেগে ফেরত এসেছে। আর যে কয়েকটি পোস্টে যায় সেখানে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে সেগুলো ঠেকিয়ে দেন কেপ ভার্দের গোলকিপার ভোজিনয়া। গোলশূন্য ড্র ম্যাচের নায়ক যে তিনিই।
‘ছোট দল’ বলে কিছু নেই
ম্যাচ শেষে হতাশ হলেও ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করেছেন স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে-‘আমাদের এই ম্যাচ জেতা উচিত ছিল। অনেক সুযোগ তৈরি করেছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সতেজতা এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ের অভাব ছিল। পরের ম্যাচের আগে আরো উন্নতি করতে হবে’।
কেপ ভার্দের প্রশংসাও করেন স্প্যানিশ কোচ। বললেন, ‘ওরা খুব লো ব্লকে খেলেছে। শারীরিকভাবেও ভীষণ শক্তিশালী ছিল তারা। ফুটবলে এখন আর কোনো ছোট দল বলে কিছু নেই।’

স্পেনের জন্য সতর্কবার্তা
গ্রুপ পর্বে স্পেনের সামনে এখন সৌদি আরব ও উরুগুয়ে। নকআউটে যেতে হলে শুধু বলের দখল নয়, গোল করার পথও খুঁজে বের করতে হবে। নইলে টিকি-টাকার পুরোনো অভিশাপ আবারও স্পেনের বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ করে দিতে পারে। এই বিশ্বকাপে টপ ফেভারিটের মর্যাদা নিয়েই এসেছে স্পেন। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই হতাশাজনক পারফরম্যান্সে দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি এখন তারা।
বিশ্বফুটবল অনেকটাই বদলে গেছে। আধুনিক ফুটবলে আনুভূমিক পাসের চেয়ে ভার্টিকাল পাসের গুরুত্বই বেশি। বল ধরে রাখার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙা। স্পেন যদি পরের ম্যাচে সেই বাস্তবতার পথে না হাঁটে তাহলে…‘অদিওস কোপা দেল মুন্ডো’।
ওটা স্প্যানিশ শব্দ। বাংলায় বিদায় বিশ্বকাপ!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...