বিজ্ঞাপন

জীবনের ঝুঁকি জেনেও সেপটিক ট্যাংকে নামেন তারা

জীবনের ঝুঁকি জেনেও সেপটিক ট্যাংকে নামেন তারা

সমাজের অপরিহার্য একটি কাজ সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করা। কিন্তু এই কাজটি যারা করেন, তাদের জীবন থাকে চোখের আড়ালে। শহর হোক বা গ্রাম, মানুষ যাতে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকতে পারে, তার বড় একটি দায়িত্ব এই শ্রমিকদের কাঁধে। অথচ সেই মানুষগুলোর জীবনই রয়ে গেছে ঝুঁকি, অবহেলা আর বৈষম্যের মধ্যে। 

ঝালকাঠি শহরের হরিজন পল্লীর টুলু হরিজন, রবি হরিজন, পানু হরিজনসহ অনেকেই বছরের পর বছর এই পেশায় নিয়োজিত। তাদের বাবা-দাদারাও একই কাজ করতেন। ফলে এই পেশা যেন তাদের জীবনে এক ধরনের বাধ্যতামূলক উত্তরাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শহরের হরিজন পল্লীতে গিয়ে জানা যায়, একটি সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কারের পারিশ্রমিক নির্ভর করে আকারের ওপর। ছোট ট্যাংক হলে ৫ হাজার, মাঝারি হলে ৮ থেকে ১০ হাজার এবং বড় হলে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। শুনতে এই পরিমাণ বেশি মনে হলেও কাজের কষ্ট, সময় ও ঝুঁকির বিচারে তা অপ্রতুল।

একটি ট্যাংক পরিষ্কার করতে সাধারণত তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগে। তবে ট্যাংক বড় বা অধিক ময়লা হলে পুরো দিন এবং কখনো রাতও পার করতে হয়। শ্রমিকদের সরাসরি ট্যাংকের ভেতরে নেমে জমে থাকা মলমূত্র, বিষাক্ত গ্যাস আর দুর্গন্ধের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হয়।

টুলু হরিজন বলেন, আমরা না করলে এই কাজ কেউ করবে না। কিন্তু ট্যাংকির ভেতরে নামলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, মাথা ঘোরে। অনেক সময় গ্যাসে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

এই পেশার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো বিষাক্ত গ্যাস। ট্যাংকের ভেতরে জমে থাকা মিথেনসহ অন্যান্য গ্যাস দ্রুত শ্বাসরোধ করতে পারে। দেশে বিভিন্ন সময় ট্যাংকে নেমে শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। তবু তাদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা হয়নি। গ্লাভস, মাস্ক, বুটের মতো সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করতে হয় বেশিরভাগ সময়। ফলে চর্মরোগ, চোখের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট ও জ্বরসহ নানা রোগে ভোগেন তারা। চিকিৎসার সামর্থ্য না থাকায় দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকেও কাজ চালিয়ে যেতে হয়।

পানু হরিজন বলেন, একদিন কাজ না করলে আয় নেই। অসুস্থ হলেও বিশ্রামের সুযোগ নেই। পরিবার চালাতে হলে যেকোনো অবস্থায় কাজে নামতে হয়।

সামাজিক বৈষম্য ও অনিশ্চিত জীবন

শুধু শারীরিক ঝুঁকি নয়, সামাজিক বৈষম্যও এই শ্রমিকদের জীবনকে কঠিন করে তোলে। অনেকেই তাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে চান না। বাসা ভাড়া পেতে বেগ পেতে হয়, তাই তারা আলাদা পল্লীতে বাস করেন। চায়ের দোকানে গেলে আলাদা গ্লাস দেওয়া হয়। এই বৈষম্যের ছায়া পড়ে তাদের সন্তানদের ওপরেও।

রবি হরিজন বলেন, আমাদের বাচ্চারা স্কুলে গেলে অন্যরা পাশে বসতে চায় না। আমরা চাই তারা পড়াশোনা করুক, ভালো কিছু করুক। কিন্তু সমাজ সেই সুযোগটা ঠিকমতো দেয় না।

পারিবারিক জীবনও অনিশ্চয়তায় ভরা। স্থায়ী আয় নেই, কাজের নিশ্চয়তা নেই। মাসে কয়েকটি কাজ পেলে সংসার চলে, না পেলে ধারদেনা বাড়তে থাকে। সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, খাওয়া- সব সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। অনেকেই চান তাদের সন্তানরা এই পেশায় না আসুক। কিন্তু দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব ও সামাজিক বাধার কারণে সেই স্বপ্ন পূরণ হয় না। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পথে আটকে যাচ্ছে।

ঝালকাঠি বারের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট নাসিরুদ্দিন কবির বলেন, দেশের অনেক জায়গায় এখনো ভ্যাকুয়াম বা সাকশন মেশিনের ব্যবহার নেই। এই প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে পারলে শ্রমিকদের আর ট্যাংকে নামতে হবে না। দুর্ঘটনা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা সরঞ্জাম, স্বাস্থ্যবীমা ও সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা জরুরি। স্থানীয় সরকার চাইলে নিবন্ধনের মাধ্যমে তাঁদের তালিকাভুক্ত করে সহায়তা দিতে পারে।

ঝালকাঠি সরকারি হরচন্দ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। যারা আমাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজটি করেন, তাদের ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং তাদের প্রতি সম্মান দেখানোই উচিত।

সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. কামরুন্নেছা আজাদ বলেন, সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার কর্মীরা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যদের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করছেন। অথচ তাদের নিজেদের জীবনেই নেই নিরাপত্তা, সম্মান আর স্থিতিশীলতা। মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও বাস্তব উদ্যোগের মাধ্যমে এই অবস্থার পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।

আরএআর