বিজ্ঞাপন

সবুজের আড়ালে বিষাক্ত ফাঁদ, ঝিনাইদহে পার্থেনিয়াম আগাছার ভয়াবহ বিস্তার

সবুজের আড়ালে বিষাক্ত ফাঁদ, ঝিনাইদহে পার্থেনিয়াম আগাছার ভয়াবহ বিস্তার

ঝিনাইদহে জেলাজুড়ে ফসলের মাঠ, রাস্তার ধার ও বাড়ির আঙিনায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষতিকারক ও বিষাক্ত আগাছা ‘পার্থেনিয়াম’। মানবদেহ, কৃষিজমি এবং গবাদি পশুর জন্য এই উদ্ভিদটির ভয়াবহতা সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের ধারণা না থাকায় জেলাজুড়ে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন উপজেলার রাস্তার দুই ধারে এবং ফসলের খেতে ছেয়ে আছে পার্থেনিয়াম। দেখতে সবুজের সমারোহ মনে হলেও এর মাঝে লুকিয়ে আছে ঝুঁকি। সাধারণ মানুষ বা কৃষকেরা না জেনেই এই বিষাক্ত আগাছার সংস্পর্শে আসছেন।

কৃষিবিদদের মতে, পার্থেনিয়াম আগাছা ফসলি জমিতে থাকলে ফসলের ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। এটি মাটির পুষ্টি উপাদান দ্রুত শুষে নেয় এবং অন্যান্য ফসলের অঙ্কুরোদগমে বাধা সৃষ্টি করে। শুধু উদ্ভিদই নয়, প্রাণী জগতেও এটি মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। পার্থেনিয়াম আগাছাযুক্ত মাঠে গবাদি পশু চড়ানো হলে কিংবা এই ঘাস খাওয়ালে পশুর শরীর ফুলে যাওয়া, তীব্র জ্বর ও বদহজমসহ নানা জটিল রোগ দেখা দেয়।

এই পুরো আগাছাটি ক্ষতিকর। পার্থেনিয়াম গাছের ফুলের রেণুতে ‘পার্থেনিন’ নামে একটি বিষাক্ত রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা মানুষের ত্বক, চোখ ও শ্বাসতন্ত্রে অ্যালার্জি ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া এর মধ্যে থাকা বিষাক্ত রাসায়নিকগুলি হলো- ক্যাফেইক অ্যাসিড, পি-অ্যানিসিক অ্যাসিড। যা ক্ষতস্থানে রক্তের সঙ্গে মিশে চর্মরোগ হতে পারে।

সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণে এই উদ্ভিদের বংশবিস্তার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। তবে স্থানীয় কৃষি বিভাগ এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

এই বিষয়ে শৈলকুপা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, পার্থেনিয়াম মানবদেহ ও গবাদি পশুর জন্য অত্যন্ত বিপৎজনক একটি উদ্ভিদ। এর প্রতিটি গাছে হাজার হাজার ফুল থাকে, যা থেকে ক্ষতিকর পরাগরেণু বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। এটি মানুষের চর্মরোগ ও ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগের কারণ হতে পারে। আমাদের কৃষকদের অনেকেই এর অপকারিতা সম্পর্কে অবগত নন।

তিনি আরও বলেন, আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে এই ক্ষতিকর উদ্ভিদ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে এবং এটি পুরোপুরি নিধনের জন্য মাঠ পর্যায়ে নানা ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যেন তারা গ্লাভস বা সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়ে এই আগাছা কেটে মাটির নিচে পুঁতে ফেলেন বা পুড়িয়ে ফেলেন।

ঝিনাইদহ সিভিল সার্জন ডা. কামরুজ্জামান বলেন, এটি একটি ক্ষতিকর আগাছা জাতীয় উদ্ভিদ যা সূর্যমুখী পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এর বীজ বাতাস, পানি বা যানবাহনের মাধ্যমে সহজে ছড়িয়ে পড়ে এবং যেখানেই পড়ে সেখানেই দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এই গাছ বা ফুল শরীরের সংস্পর্শে আসলে চুলকানি ও চর্মরোগ হতে পারে, চোখে লাগলে চোখ লাল হয়ে পানি পড়ে এবং নাকে লাগলে হাঁচি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।

এটি গবাদি পশুর জন্যও অত্যন্ত ক্ষতিকর। গরু-ছাগল এটি খেলে মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারে এবং গাভীর দুধের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। এমনকি এই বিষাক্ত আগাছা খাওয়া গবাদি পশুর মাংস খেলে মানুষের শরীরেও মারাত্মক অ্যালার্জি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আমাদের পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও কৃষিজমি রক্ষায় যেকোনো উপায়ে পার্থেনিয়াম জমি থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে হবে।

শৈলকুপার বাজুখালী গ্রামের স্কুল শিক্ষক মিঠুন কুমার শর্মা বলেন, তিন-চার বছর আগে দুই-একটা গাছ দেখা যেত; অথচ এখন সব জায়গায় এই পার্থেনিয়াম গাছ ভরে গেছে। আমরা শুনেছি পার্থেনিয়াম গাছ অনেক ক্ষতি করে, এজন্য এই গাছ থেকে একটু দূরে থাকার চেষ্টা করি। সাধারণ মানুষ না বুঝেই খালি হাতে এই গাছ নাড়াচড়া করার কারণে অনেকেই অ্যালার্জিজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

সদর উপজেলার হীরাডাঙ্গা গ্রামের রসুল খাঁ বলেন, আমার ফসলের ক্ষেতে গতবার দশ-বারোটা গাছ হয়েছিল, এবার ১০ কাঠা জমির পুরোটাতেই পার্থেনিয়াম ভরে গেছে। ঘাস পোড়া ওষুধ ছিটিয়ে দিলেও এই পার্থেনিয়াম মরে না। পার্থেনিয়াম নিয়ে আমরা খুব বিপদে আছি।

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এই বিষাক্ত আগাছা দ্রুত উপড়ে ফেলে ধ্বংস করার জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষের সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সম্রাট হোসেন/আরকে

বিজ্ঞাপন