দেশের আবাসন, শিল্প ও অবকাঠামো খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে লিফট ও এস্কেলেটরকে পুনরায় মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারিজ) হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ এলিভেটর, এস্কেলেটর অ্যান্ড লিফট ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেলিয়া)। একই সঙ্গে খাতটির বিদ্যমান শুল্ক ও কর কাঠামো যৌক্তিক করার তাগিদ দিয়েছে সংগঠনটি।
বুধবার (১৭ জুন) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়।
ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেটে তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনায় নেওয়া হলে আবাসন ও অবকাঠামো খাতের ব্যয় কমবে এবং নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন লিফট ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বেলিয়ার সভাপতি মো. শফিউল আলম উজ্জ্বল বলেন, বর্তমান নগরায়ণ, বহুতল ভবন নির্মাণ, শিল্পায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অবকাঠামো উন্নয়নের বাস্তবতায় লিফট কোনো বিলাসবহুল পণ্য নয়; বরং এটি টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য মূলধনী যন্ত্রপাতি। তবে ২০২৩ সালে লিফটকে মূলধনী যন্ত্রপাতির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর ২০২৪ ও ২০২৫ অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে এ খাতের শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়।
তিনি জানান, এর ফলে গত দুই বছরে লিফট আমদানির ওপর মোট শুল্কহার প্রায় ১১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে আবাসন শিল্পসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে নির্মাণ ব্যয় বেড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হওয়ায় কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বেলিয়ার সভাপতির ভাষ্য, অতিরিক্ত শুল্কের চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের ওপরই বর্তায়। ফ্ল্যাটের প্রতি বর্গফুটের দাম বাড়ার ফলে মধ্যবিত্তের আবাসনের স্বপ্ন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। পাশাপাশি কম খরচে নিম্নমানের বা পুনর্নির্মিত (রিকন্ডিশনড) লিফট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো— লিফট ও এস্কেলেটরকে পুনরায় মূলধনী যন্ত্রপাতি হিসেবে ঘোষণা করা। লোড ফ্যাক্টর প্রতি কেজি ৩ মার্কিন ডলার থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা। স্থানীয় উৎপাদনের নামে আমদানিকৃত কাঁচামালের অপব্যবহার রোধে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা। বন্দর পর্যায়ে স্কেলিং, মূল্যায়ন ও খালাস (ক্লিয়ারিং) প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজীকরণ করা। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নিরাপদ লিফট আমদানির জন্য শুল্ক ও কর কাঠামোর যৌক্তিক সংস্কার করা।
বেলিয়ার সাধারণ সম্পাদক ইয়াদুল হক বলেন, বাজেট উপস্থাপনের আগেও সরকারের কাছে এসব দাবি জানানো হয়েছিল। তবে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, চূড়ান্ত বাজেটে সরকারের পক্ষ থেকে এ খাতের যৌক্তিক দাবিগুলো বিবেচনা করা হবে। শুল্ক যৌক্তিকীকরণ করা হলে সাশ্রয়ী মূল্যে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, নিরাপদ ও টেকসই লিফট আমদানি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, স্মার্ট সিটি নির্মাণ এবং নিরাপদ অবকাঠামো উন্নয়নের স্বার্থে লিফট খাতের প্রতি সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। তিনি বলেন, শুল্ক ও কর বৃদ্ধির কারণে গত তিন বছরে একটি ছোট লিফটের দাম প্রায় ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর প্রভাব বহুতল ভবন নির্মাণ ব্যয় বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বেলিয়ার উপদেষ্টা এমদাদ উর রহমান বলেন, প্রায় ৩৫ বছর ধরে লিফটকে মূলধনী যন্ত্রপাতি হিসেবে গণ্য করা হলেও তিন বছর আগে হঠাৎ এটিকে বিলাসী পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যার যৌক্তিকতা খাতসংশ্লিষ্টদের কাছে স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, দেশে ভূমির স্বল্পতার কারণে কলকারখানা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই বহুতল ভবন নির্মাণ করতে হচ্ছে। বৃদ্ধ, শিশু ও অসুস্থ ব্যক্তিদের যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে লিফটকে কোনোভাবেই বিলাসী পণ্য বলা যায় না।
সংবাদ সম্মেলনে বেলিয়ার নেতারা আশা প্রকাশ করেন, সরকার তাদের দাবিগুলো ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। এতে দেশের আবাসন, শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নে গতি আসবে এবং নিরাপদ লিফট ব্যবহারের পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
এসআই/এমএসএ
