বিজ্ঞাপন

গ্যাসের ঘাটতি তেলের আগুন, লোডশেডিংয়ের ছায়া গ্রাম ছাড়িয়ে শহরে

গ্যাসের ঘাটতি তেলের আগুন, লোডশেডিংয়ের ছায়া গ্রাম ছাড়িয়ে শহরে

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রায় ৮৮ শতাংশই কয়লা, গ্যাস ও তেলনির্ভর। তবে, বর্তমান তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে এই কেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। গ্যাসের তীব্র ঘাটতি, বিশ্ববাজারে তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং কয়লা আমদানির ক্রমবর্ধমান ব্যয়— সবমিলিয়ে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এক গভীর সংকট তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনজীবনে; গ্রামাঞ্চলের তীব্র লোডশেডিংয়ের ছায়া এখন খোদ রাজধানী ঢাকাতেও অনুভূত হচ্ছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি কাঠামো

দেশে বর্তমানে কয়লাভিত্তিক আটটি, গ্যাসভিত্তিক ৫৯টি এবং তেলভিত্তিক ৫৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে (এর মধ্যে ৫৩টি ফার্নেস তেল ও তিনটি ডিজেল চালিত)। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে গ্যাস না থাকলে ১০টি কেন্দ্রে ডিজেল এবং একটি কেন্দ্রে ফার্নেস তেল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

আমদানি নির্ভর কয়লা ও বর্ধিত ব্যয়

আটটি কয়লাভিত্তিক বিদুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৭,০০৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে একমাত্র ৫২৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র বাদে বাকি সাতটি কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। মূলত ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়লা আনা হলেও আমদানির বড় অংশই আসে ইন্দোনেশিয়া থেকে।

সাশ্রয়ী জ্বালানি হিসেবে কয়লা সমাদৃত হলেও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের প্রভাবে এর দাম এখন আকাশচুম্বী। ইন্দোনেশিয়ান কোল ইনডেক্স অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি টন কয়লার দাম যেখানে ছিল ৩৫.৮৩ ডলার, বর্তমানে তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৭২.২৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। কয়লার মূল্যের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জাহাজ ভাড়াও।

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকলেও তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে বড় একটি অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ফার্নেস তেল ও কয়লার আকাশচুম্বী দামের কারণে ৪,০০০ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা অলস পড়ে আছে। ফলে গ্রামাঞ্চলের গণ্ডি পেরিয়ে রাজধানী ঢাকাতেও লোডশেডিংয়ের তীব্রতা কয়েক গুণ বেড়েছে

অস্থির তেলের বাজার ও এলএনজি

বিশ্ববাজারে ফার্নেস তেলের দামও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। ট্রেডিং ইকোনমিকসের তথ্যমতে, মার্চের শুরুতে প্রতি গ্যালন ফার্নেস তেলের দাম ২.৬৭ ডলার থাকলেও তা সর্বোচ্চ ৪.৬ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। বর্তমানে এটি ৩.৭৬ ডলারে থিতু হয়েছে। 

এলএনজির বাজারেও অস্থিরতা কাটছে না। যুদ্ধের আগে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ১৫ ডলার থাকলেও মার্চের শেষে তা ২৪ ডলারে পৌঁছায়। তবে, সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর দাম কিছুটা কমে ১৬-১৮ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। 

dhakapost

জ্বালানির এই ত্রিমুখী সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনি সরবরাহের ঘাটতি জনজীবনকে করে তুলেছে অতিষ্ঠ।

জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে বিদ্যুৎকেন্দ্র: সক্ষমতা থাকলেও মিলছে না গ্যাস-তেল-কয়লা

দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকলেও শুধু জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদনে ফিরতে পারছে না বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র। গ্যাস, তেল ও কয়লা— তিনটি খাতেরই সরবরাহ ঘাটতিতে দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি।

দেশে বর্তমানে ৫৯টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যার ১৮টিই ভুগছে তীব্র গ্যাস সংকটে। এর মধ্যে ১৪টি কেন্দ্রের উৎপাদন বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ। বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলোর তালিকায় রয়েছে— হরিপুর জিটিপিপি, ঘোড়াশাল (ইউনিট ৪ ও ৫), মেঘনাঘাট ৩৩৫ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট এবং আশুগঞ্জের তিনটি ইউনিটসহ আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্র।

বর্তমানে এসব গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৭,৮৫৩ মেগাওয়াট হলেও গত রোববার উৎপাদিত হয়েছে মাত্র ২,৯০০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি না থাকায় প্রায় ৪,০০৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দৈনিক ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ২৬৫ কোটি ঘনফুট। পিডিবি বলছে, লোডশেডিং এড়াতে বিদ্যুতে দৈনিক ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯১ কোটি ঘনফুট।

কয়লা ও ফার্নেস তেলের আমদানি ব্যয় দ্বিগুণের বেশি হওয়ায় এবং ডলার সংকটে আমদানিকারকরা লোকসানের মুখে পড়ায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। আসন্ন সেচ ও গ্রীষ্ম মৌসুমে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৮,২৪৪ কোটি টাকার জরুরি ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে, যার ওপর আগামী দিনের লোডশেডিং পরিস্থিতি অনেকাংশেই নির্ভর করছে

তেলভিত্তিক কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যয় ও তেলের আকাল

৫৬টি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ফার্নেস তেলের অভাবে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে তিনটি কেন্দ্র— মেঘনাঘাট ১০৪ মেগাওয়াট, জঙ্গলিয়া ৫২ মেগাওয়াট ও ফেরি লঙ্কা ১১৪ মেগাওয়াট। এছাড়া, তেলের সংকটে উৎপাদন কমে গেছে আরও ২৩টি কেন্দ্রের। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন ক্ষমতা ৫৬৬৬ মেগাওয়াট। গত রোববার পর্যন্ত কেন্দ্রগুলো  উৎপাদন করেছে ২৫৩০ মেগাওয়াট। তবে, ডিজেলভিত্তিক তিন কেন্দ্র— সৈয়দপুর ১৫০ মেগাওয়াট, রংপুর ২০ মেগাওয়াট ও সৈয়দপুর ২০ মেগাওয়াট কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন করেনি।

dhakapost

এদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দেশে ফার্নেস তেলের দাম লিটারে ২৪ টাকা বাড়ানোয় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, ফার্নেস তেলের দাম বাড়ায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাধ্য হয়েই ৩,০০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ এই খাত থেকে উৎপাদন করা হচ্ছে না।

কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের চিত্র: ভরসা শুধু পায়রা ও বরিশাল

সংকট থেকে মুক্ত নয় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও। গত রোববার পর্যন্ত কয়লা সংকটে ১২২৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এসএস পাওয়ার ৩০০ মেগাওয়াট, ১১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ১৬০ মেগাওয়াট, ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ৬০২ মেগাওয়াট, ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পটুয়াখালী বিদ্যুৎকেন্দ্র ৪০৪ মেগাওয়াট এবং বড়পুকুরিয়া ২৫০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র ৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। এর মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বড়পুকুরিয়া ২৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

তবে আশার কথা হলো, ১৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র ১১৫৫ মেগাওয়াট এবং ৩০৭ মেগাওয়াট সক্ষমতার বরিশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ৩০০ মেগাওয়াট অর্থাৎ কেন্দ্র দুটি এখনও চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। 

dhakapost

অর্থায়নের অনিশ্চয়তা

এদিকে, গত ১৬ মার্চ আসন্ন গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ বজায় রাখতে পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ি আল্ট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শ্রীপুর ১৬০ মেগাওয়াট ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৮,২৪৪ কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। যদিও অর্থ বিভাগ এখনও এ বিষয়ে সাড়া দেয়নি।

বেড়েছে লোডশেডিং

বর্তমানে দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ১৪,৮০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গত রোববার পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ১৩,৯২৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ প্রায় ১,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে গিয়ে গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি খোদ রাজধানীতেও লোডশেডিংয়ের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ এপ্রিল দেশজুড়ে মোট ৭১১ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে রাজধানী ঢাকায়। যার পরিমাণ ১৯৪ মেগাওয়াট। এরপর চট্টগ্রামে ১২০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ১২০ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় ৮০ মেগাওয়াট, সিলেটে ৭২ মেগাওয়াট, রংপুরে ৩৮ মেগাওয়াট, খুলনায় ৩৫ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ৩৪ মেগাওয়াট এবং বরিশালে ১৮ মেগাওয়াট।

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে সামনে ভয়াবহ লোডশেডিং হওয়ার আশঙ্কা নেই; তবে সামান্য প্রভাব পড়তে পারে। গ্যাসের সরবরাহ চাহিদামাফিক থাকলে আমরা অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে বিদ্যুৎ দিতে পারতাম। বর্তমানে আমাদের দৈনিক ১,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পাচ্ছি ৯০০ মিলিয়নেরও কম। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছি। আর যদি গ্যাসের সরবরাহ কোনোভাবেই না বাড়ে, তবে বিকল্প হিসেবে তেলভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানো হবে।

dhakapost

কয়লা আমদানি প্রসঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন, বেসরকারি কোম্পানিগুলো বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি করে থাকে। বর্তমানে জাহাজ ভাড়া ও প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় তারা লোকসানের মুখে পড়েছে এবং ক্ষতিপূরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। এটি বর্তমানে একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তবে, এই সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনো প্রভাব পড়বে না এবং কয়লা আমদানিও স্বাভাবিক থাকবে।

অন্যদিকে, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘লোডশেডিং তো আগে থেকেই চলছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো বিপিডিবি এই লোডশেডিং কতটা কমিয়ে আনতে পারে, যাতে সাধারণ মানুষের ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে না যায়। ফার্নেস তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় হয়তো এর ব্যবহার কমানো হবে। সেক্ষেত্রে সংকট সামাল দিতে কয়লা আমদানি বাড়ানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ, কারণ অন্যান্য জ্বালানির তুলনায় কয়লা এখনও সাশ্রয়ী।’

ওএফএ/এমএআর/