হালকা ঘামে ভেজা পরনের টি-শার্ট। ২০ বছর বয়সী মুন্নাফ হন্তদন্ত হয়ে তার বাইসাইকেলটি চুরির হাত থেকে বাঁচাতে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বাঁধছেন। উদ্দেশ্য একটাই— দ্রুত রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার সংগ্রহ করে গ্রাহকের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়া। প্রতিদিন বেলা ১২টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বিরামহীন ছুটে চলেন তিনি। বিনিময়ে দিন শেষে জোটে ১৩০০ থেকে ১৫০০ টাকা। তবে, এটি কোনো নির্দিষ্ট বেতন নয়। যেদিন কাজে নামেন না, সেদিন পকেট থাকে শূন্য। টানা ৩-৫ দিন অসুস্থ থাকলে তার আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
মুন্নাফ গত সাড়ে চার বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত। এর আগে একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের বাঁধাধরা কাজ ভালো না লাগায় নিজেই একটি বাইসাইকেল কিনে শুরু করেন ফুড ডেলিভারির কাজ। এখন এই সাইকেলের প্যাডেল ঘুরিয়েই চলে তার সংসার।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষ্যে সরকারি ছুটি ও বিভিন্ন কর্মসূচি থাকলেও জীবিকার তাগিদে রাজধানী ঢাকার ফুড ডেলিভারি কর্মীরা রাস্তায় ছুটছেন। তাদের কোনো নির্দিষ্ট বেতন, ছুটি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা চাকরির নিরাপত্তা নেই। কাজ বন্ধ মানেই আয় বন্ধ, ফলে তাদের কাছে পহেলা মে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ মাত্র
সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলার মুন্নাফ বর্তমানে ঢাকার বনশ্রী এলাকায় মা-বাবা ও ছোট বোনকে নিয়ে বসবাস করছেন। পরিবারের পুরো খরচই তাকে বহন করতে হয়। প্রতিদিনের আয় দিয়েই চলে খাওয়া, ঘরভাড়া ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ। কিন্তু যেদিন শরীর সাড়া দেয় না, সেদিন যেন থেমে যায় পুরো সংসারের চাকা।
মে দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে মুন্নাফ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘হ্যাঁ, জানি। ওইদিন শহরে র্যালি হয়, সমাবেশ হয়। কিন্তু সেখানে গেলে তো আয় বন্ধ থাকবে। আমি যদি মোবাইল আর সাইকেল নিয়ে না বের হই, তাহলে কোনো রোজগার হবে না। ঢাকায় থাকতে যে কত খরচ, সেটা তো আপনি জানেনই।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাইকেল চালানো সহজ না। সারাদিন প্যাডেল মারতে হয়, আবার খাবার নিয়ে মানুষের বাসায় গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। শরীর ঘামে ভিজে যায়। আমাদের কাছে কোনো দিবসই আলাদা না। কাজ করলে টাকা আছে, না করলে নাই।’
খিলগাঁও এলাকায় কথা হয় আরেক ফুড ডেলিভারিম্যান মোহাম্মদ জাকিরের সঙ্গে। ২০১৮ সাল থেকে এই পেশায় থাকা জাকির রামপুরা এলাকায় ভাড়া বাসায় মা, স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে নিয়ে থাকেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি।
মে দিবস নিয়ে জাকির বলেন, ‘অনেকের কাছে হয়তো আমাদের কাজটা শ্রমিকের মতো মনে হয় না। কিন্তু আমরা আসলে শ্রমিকই। সারাদিন কাজ করলেই আয় হয়, না হলে কেউ খোঁজও নেয় না। অসুস্থ হয়ে বাসায় থাকলেও অ্যাপ কোম্পানি জানতে চায় না কেন কাজে যাইনি।’
‘ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়েও আমাদের সময়মতো ডেলিভারি দিতে হয়। না হলে রেটিং কমে যায়, অর্ডার কমে যায়। দিন শেষে টাকার জন্যই সব করতে হয়। এখন বাজারের যে অবস্থা, তাতে ডেলিভারি চার্জ বাড়ানো হলে আমাদের কিছুটা সুবিধা হতো।’
রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন ফুড ডেলিভারি অ্যাপের আওতায় হাজার হাজার তরুণ কাজ করছেন। তাদের অধিকাংশই নির্দিষ্ট কোনো বেতনভুক্ত কর্মী নন, বরং প্রতিদিনের কাজের ওপর নির্ভর করে আয় করেন। কাজ বন্ধ মানেই আয় বন্ধ।
শ্রমিক দিবস এলেও তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসে না। অধিকাংশ ডেলিভারিম্যানের নেই স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ছুটি বা নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার নিশ্চয়তা। তবুও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন রাস্তায় নামতে হয় তাদের। মে দিবস তাই তাদের কাছে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ। বাস্তবতা হলো, প্যাডেল থামলেই থেমে যায় আয়। আর তাই প্রতিদিনের মতো পহেলা মে-তেও রাস্তায় ছুটতে হয় তাদের, জীবিকার সন্ধানে।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের ইতিহাস
যুক্তরাষ্ট্রের সব শিল্পাঞ্চলে ১৮৮৬ সালের ১ মে ধর্মঘটের ডাক দেন শ্রমিকরা। সে ডাকে শিকাগো শহরের তিন লক্ষাধিক শ্রমিক কাজ বন্ধ রাখেন। শিকাগো শহরের হে মার্কেট রূপ নেয় লাখো শ্রমিকের বিক্ষোভ সমুদ্রে। এক লাখ ২৫ হাজার নির্মাণ শ্রমিকের সঙ্গে আরও অসংখ্য বিক্ষুব্ধ শ্রমিক লাল ঝান্ডা হাতে সমবেত হন সেখানে।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে অন্তত ১০ শ্রমিক শহীদ হন। পরে হে মার্কেটের ওই শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। গড়ে ওঠে শ্রমিক-জনতার বৃহত্তর ঐক্য। অবশেষে তীব্র আন্দোলনের মুখে শ্রমিকদের দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
পরে ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে শিকাগোর রক্তঝরা অর্জনকে স্বীকৃতি দিয়ে ওই ঘটনার স্মারক হিসেবে ১ মে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৮৯০ সাল থেকে প্রতি বছর দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করতে শুরু করে।
১৮৮৬ সালে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে শিকাগোতে শ্রমিক বিক্ষোভ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৮৯০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও সরকারি কর্মসূচীর পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল নয়াপল্টনে বিশাল সমাবেশের ডাক দিয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
বরাবরের মতো এবারও বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় মে দিবস উপলক্ষ্যে নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে।
এছাড়া মহান মে দিবস উপলক্ষ্যে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিশাল শ্রমিক সমাবেশের ডাক দিয়েছে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এ সমাবেশে অন্তত আড়াই লাখ মানুষের সমাগম ঘটানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সংগঠনটি। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, ঢাকা মহানগরে জনসংখ্যা দুই কোটি ৫৩ লাখের বেশি। এই জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক বা এক কোটি ২৬ লাখের বেশি মানুষ শ্রমজীবী-কর্মজীবী। কিন্তু ঢাকা শহরের প্রায় এক লাখ ২৬ হাজারের বেশি (শতকরা এক ভাগ) শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষকে আমরা এখনও সংগঠিত করতে পারিনি। তারপর আমাদের সামনে আরও কত কাজ? আমরা যদি আরও ১ শতাংশ লোককে সংগঠিত করতে পারি, তাহলে আড়াই লাখ লোক হবে। ৫ শতাংশ সংগঠিত করতে পারলে প্রায় সাত লাখ লোক হবে।
‘এবারের সমাবেশ একটি ঐতিহাসিক সমাবেশে রূপ নেবে’— উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম খান আরও বলেন, ‘মহান মে দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়, এটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রতীক।’
এমএইচএন/এমএআর/
