বিজ্ঞাপন

নেতা টানার রাজনীতি : পুরোনোদের ফেরাতে অনীহা এনসিপির?

নেতা টানার রাজনীতি : পুরোনোদের ফেরাতে অনীহা এনসিপির?

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক পরিধি বাড়ছে। দলটির সাংগঠনিক বিস্তারও দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত নতুন নতুন কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলছে দলটি। কেন্দ্রীয় কমিটিতে নতুন নতুন অ্যালায়েন্সও ঘোষণা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে প্রভাবশালী নেতাদের দলে টানার কৌশল নিয়েছে এনসিপি। ইতোমধ্যে একাধিক নেতাকর্মী এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। তাদের যোগদানে দলটির শক্তি বাড়লেও এনসিপির প্রতিষ্ঠার সময়ে যারা সক্রিয় ছিলেন এবং সংগঠন দাঁড় করাতে ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের একটি অংশ রাগ-অভিমান ও অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের কারণে দল ছেড়ে গেছেন।

আত্মপ্রকাশের অল্প সময়ের মধ্যেই এনসিপি সাংগঠনিকভাবে বিস্তার লাভ করলেও, প্রতিষ্ঠার সময়ে সক্রিয় থাকা ত্যাগী নেতাকর্মীদের একটি অংশ রাগ-অভিমান ও অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের কারণে দল ছেড়ে গেছেন। অথচ নতুন করে অন্য দলের নেতাদের ভেড়ানোর বিষয়ে যতটা তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, দল ছেড়ে যাওয়া পুরোনোদের ফেরাতে এনসিপির ততটা আগ্রহ বা উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। দলটির এই দ্বিমুখী অবস্থানে এনসিপির রাজনৈতিক আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে

অথচ নতুন করে অন্য দলের নেতাদের ভেড়ানোর বিষয়ে যতটা তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, দল ছেড়ে যাওয়া পুরোনো ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের ফেরাতে এনসিপির ততটা আগ্রহ বা উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। দলটির এই দ্বিমুখী অবস্থানে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলটির শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকেই এনসিপির রাজনৈতিক আন্তরিকতা, দলীয় ঐক্য এবং আদর্শিক ভিত্তির গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

dhakapost
এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর নুরুজ্জামান কাফি, সামাজিক আন্দোলনকর্মী মহিউদ্দিন রনি এবং শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি ফেরসামিন হক ইকবালসহ অনেকে / ছবি- সংগৃহীত

এই বিষয়ে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা দলটির সাবেক যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পুরোনো নেতাকর্মী হিসেবে তাকে আবার দলে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে দল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করা হয়নি। তবে, ব্যক্তিগত সম্পর্কের খাতিরে অনেকেই নানা সময় পরোক্ষভাবে আকার-ইঙ্গিতে ফিরে আসার কথা বলেছেন। 

দলে আর না ফেরার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, “এনসিপি শুরুতে একটি ‘নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা’ চালুর কথা বললেও, বাস্তবে তাদের বর্তমান রাজনীতি পুরনো ধাঁচেই আবর্তিত হচ্ছে। যদি বিএনপি বা জামায়াতের মতো একই প্যাটার্নে রাজনীতি করতে হয়, তবে আলাদা করে এনসিপি গঠনের যৌক্তিকতা কী?”

এনসিপির দলবদল ও নতুন নেতাদের যোগদানের বিষয়টি যাচাই-বাছাই ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার জন্য ‘ন্যাশনাল সার্চ কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। তবে, দল ছেড়ে যাওয়া পুরোনোদের ফেরাতে এই কমিটি কী ভাবছে, তা নিয়ে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, পুরোনোদের ফেরানোর বিষয়টিও সার্চ কমিটির আওতায় থাকবে। অন্যদিকে, মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত বলেন, যারা দল ছেড়ে গেছেন, তাদের ফেরানোর জন্য এই কমিটি গঠন করা হয়নি

তার ভাষ্যমতে, তিনি এনসিপিতে যোগ দিয়েছিলেন জুলাই গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে জেগে ওঠা নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করার স্বপ্ন নিয়ে। তবে তার অভিযোগ, দলটি বর্তমানে সেই মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্য দলের নেতাকর্মীদের ভেড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে, রাজনীতিতে নতুন, দক্ষ বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এনসিপিতে আকৃষ্ট হচ্ছেন না, বরং মূলত দলছুট নেতারাই আসছেন।

dhakapost
এনসিপির ‘নতুন ব্যবস্থা’ আড়ালে পুরনো রাজনীতি, আদর্শিক চ্যুতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিকতার অভিযোগ / ছবি- সংগৃহীত

মুহাম্মদ মুরসালীন প্রশ্ন তোলেন, ‘রাজনীতি সচেতন অথচ কোনো দল করেন না— এমন কোনো প্রভাবশালী বা যোগ্য ব্যক্তি কি আসলে এখন এনসিপিতে যাচ্ছেন? বাস্তবে তো রাজনৈতিক দলের লোকেরাই ভিড়ছেন। তাই এই প্রক্রিয়াটিকে যেভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, আমাদের পর্যবেক্ষণ তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন।’

অন্যদিকে, এনসিপির এই দলবদল ও নতুন নেতাদের যোগদানের বিষয়টি যাচাই-বাছাই, মূল্যায়ন ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার জন্য দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনায় একটি ‘ন্যাশনাল সার্চ কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেনের সম্মতিতে গঠিত এই কমিটিতে আছেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন ও আরিফুল ইসলাম আদীব, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, যুগ্ম সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল আমিন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ।

এনসিপি মুখে ‘নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ কথা বললেও বাস্তবে তারা পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে নতুন কী প্রস্তাব দিচ্ছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পদত্যাগকারী নেতারা অভিযোগ করেছেন, দলটি পুরোপুরি ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ‘ক্ষমতা না জনতা’— এই স্লোগান থেকে সরে এসে এনসিপি এখন পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কাঠামোর মধ্যেই রাজনীতি করছে এবং ধীরে ধীরে তাদের চরিত্রও পুরনো ধারার রাজনৈতিক দলের মতোই হয়ে যাবে

দল বড় করার এই প্রক্রিয়ায় যখন অন্য দলের নেতাকর্মীরা আসছেন, তখন দল ছেড়ে যাওয়া পুরোনো ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের ফেরাতে এনসিপি কী ভাবছে? এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সার্চ কমিটির সদস্য সারোয়ার তুষার ঢাকা পোস্টকে বলেন, “এই বিষয়টিও নবগঠিত ‘ন্যাশনাল সার্চ কমিটি’র আওতাভুক্ত থাকবে। কোন প্রক্রিয়ায় এটি করা হবে, তা নিয়ে ঈদের পর দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।”

তবে, এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাতের মুখে ভিন্ন সুর শোনা যায়। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘যারা দল ছেড়ে চলে গেছেন, তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য এই কমিটি গঠন করা হয়নি। এই কমিটির মূল দায়িত্ব হলো, নতুন যারা যোগ দিচ্ছেন তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করা এবং সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে সম্মানজনক পদে পদায়ন নিশ্চিত করা।’

dhakapost
দলটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব হিসেবে রয়েছেন আখতার হোসেন / ছবি- সংগৃহীত

দলীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এনসিপি মুখে ‘নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের’ কথা বললেও বাস্তবে তারা পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে নতুন কী প্রস্তাব দিচ্ছে, তা এখনও ধোঁয়াশায় ঢাকা। বাংলাদেশে যেখানে রাজনৈতিক অর্থনীতির মূল ভিত্তি অনেকাংশেই চাঁদাবাজি-নির্ভর, সেখানে স্বচ্ছ ও বিকল্প অর্থনৈতিক নীতি বা স্বচ্ছ অর্থের উৎস নিশ্চিত না করে নতুন বন্দোবস্ত বাস্তবায়ন অসম্ভব বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

সূত্রটি আরও জানায়, সংগঠন চালানোর জন্য যদি শেষ পর্যন্ত চাঁদাবাজির ওপরই নির্ভর করতে হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই দলকে পেশিশক্তি বা ‘মাসেল পাওয়ার’ বাড়ানোর দিকে ঝুঁকতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম এমন শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলোকে দলে ভেড়ানোর প্রয়োজন পড়বে। অভিযোগ রয়েছে, এনসিপি বর্তমানে ঠিক সেই পুরনো পথেই হাঁটছে। আর এই কারণে দলটির মধ্যে নতুন রাজনীতির কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছেন না দল ত্যাগকারীরা।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব ও মিডিয়া সেলের সাবেক সম্পাদক মুশফিক উস সালেহীন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘দলের নেতাদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত কথাবার্তা ও যোগাযোগ রয়েছে। তবে তার মানে এই নয় যে, আবারও দলে যোগ দিচ্ছি। পুনরায় যোগদানের সঙ্গে এই যোগাযোগের কোনো সম্পর্ক নেই।’ 

একই প্রসঙ্গে এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আরিফ সোহেল ঢাকা পোস্টকে জানান, এনসিপি থেকে বের হয়ে আসার পর অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ ফিরে আসার প্রস্তাব দেননি।

dhakapost
গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বিশাল জমায়েতের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি / ফাইল ছবি

অফিসিয়ালি প্রস্তাব দিলে আবার দলে ফিরবেন কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ‘না, এই মুহূর্তে যাব না। কারণ, যে আদর্শিক জায়গা থেকে এনসিপি থেকে বের হয়ে এসেছি, সেই আদর্শিক প্রশ্নগুলোর কোনো মীমাংসা এখনও হয়নি। এনসিপি এখনও সঠিক অবস্থান নেয়নি।’ 

এনসিপির বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সেই শূন্যতার সুযোগে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি প্রক্রিয়ায় এনসিপি প্রবেশ করেছে। এনসিপি এখন পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কাঠামোর মধ্যেই রাজনীতি করছে এবং ধীরে ধীরে তাদের চরিত্রও সেই পুরনো ধারার রাজনৈতিক দলের মতোই হয়ে যাবে।’

তিনি আক্ষেপ করে আরও বলেন, ‘নতুন বন্দোবস্তের যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এনসিপি রাজনীতিতে নেমেছিল, সেটি কথার কথা হয়েই থাকবে। আমরা সত্যিকার অর্থেই নতুন বন্দোবস্ত এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি চেয়েছিলাম।’

দলীয় সূত্র মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলকে সম্প্রসারণের জোরদার উদ্যোগ নিয়েছে এনসিপি। গত ১৯ এপ্রিল এবি পার্টি, আপ বাংলাদেশ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৪৪ নেতাকর্মীর এনসিপিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এরপর ২৪ এপ্রিল বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকার, অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি ফেরসামিন হক ইকবাল (ফ্লোরা), কনটেন্ট ক্রিয়েটর নুরুজ্জামান কাফি ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেলের অনিয়ম নিয়ে আন্দোলন করে আলোচনায় আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন রনিসহ কয়েকজন এনসিপিতে যোগ দেন।

পরবর্তীতে ৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিতে যোগ দেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে মোহাম্মদ নাদিমুর রহমান, হাজী শরীয়তুল্লাহর বংশধর আবদুল্লাহ মোহাম্মদ হোসাইন ও অধ্যাপক এম এ এইচ আরিফ। সর্বশেষ গত শুক্রবার গণ অধিকার পরিষদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স, আপ বাংলাদেশসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন পেশায় থাকা ৩৬ ব্যক্তি এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তর শাখায় যোগ দেন।

এনসিপির সাবেক নেতা আরিফ সোহেল অভিযোগ করেন, দলটি পুরোপুরি ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। তিনি মনে করিয়ে দেন, এনসিপির যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘ক্ষমতা না জনতা’— এই স্লোগানকে সামনে রেখে। কিন্তু বর্তমানে সেই অবস্থান থেকে তারা অনেক দূরে সরে এসেছে।

তার মতে, সংসদে সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ার ঘটনাটিই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এই ঘটনার ফলে দেশে আবারও আগের মতো গুম-খুনের বিভীষিকাময় পরিবেশ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে এবং দেশকে শেখ হাসিনার সময়কার স্বৈরাচারী পরিস্থিতির দিকেই ফিরিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি হচ্ছে।

এনসিপির বর্তমান ‘দ্বৈত’ অবস্থানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘দলটি একদিকে রাজপথে আন্দোলনের কথা বলছে, কিন্তু বাস্তবে তারা সংসদের সুবিধা ভোগ করছে এবং সেই পথে হাঁটছে না।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে উল্লেখ করেন, ‘সংস্কার অধ্যাদেশ বাতিলের মতো এত বড় ঘটনার পরও এনসিপির কোনো সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেননি।

সংস্কার প্রস্তাবনা বাতিল হওয়ার অর্থ হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ ও আকাঙ্ক্ষার কোনো মূল্য নেই এবং এর ফলে দেশে প্রকৃত কোনো পরিবর্তন আসবে না। এত কিছুর পরও সংসদে থেকে ক্ষমতার অংশীদার হওয়া স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, এনসিপি আপস করেছে।’

তারা আপস করেননি বলেই কি তাদেরকে আর দলে ডাকা হচ্ছে না— এমন প্রশ্নের জবাবে আরিফ সোহেল বলেন, ‘কেন আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকা হচ্ছে না, সেটা এনসিপির নেতারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে, এটা স্পষ্ট যে বর্তমানে আমাদের আদর্শিক অবস্থান এবং এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা। সম্ভবত এই কারণেই এমনটা হতে পারে।’

এনসিপি থেকে পদত্যাগকারী একাধিক নেতা ঢাকা পোস্টকে জানান, তাদের দল ছাড়ার কারণ হিসেবে অনেকে জামায়াত জোটের প্রসঙ্গটি সামনে আনেন। তবে বাস্তবতা হলো, বিএনপিও দীর্ঘ সময় জামায়াতের সঙ্গে জোটে ছিল; এমনকী সরকার না পড়লে তারা আদৌ এই জোট ভাঙত কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তাদের মূল বক্তব্য স্পষ্ট— তারা দেশে একটি ‘নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ চান। কিন্তু এনসিপির কাছে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি, স্পষ্ট বক্তব্য বা বাস্তবসম্মত রূপরেখা দৃশ্যমান নয়। এমতাবস্থায়, শুধুমাত্র কিছু অস্পষ্ট কথার ওপর ভরসা করে তারা কেন সেখানে যাবেন?

তাদের মতে, এমপি বা মন্ত্রী হওয়া বড় কোনো বিষয় নয়; বাংলাদেশে এমন অনেকেই এমপি হয়েছেন যাদের ইতিহাস মনে রাখেনি। নাহিদ ইসলামের সামনে সুযোগ ছিল গণঅভ্যুত্থানের নেতা হিসেবে একটি বড় রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করার। কিন্তু তিনি সেই বিশাল সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে এমপি হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলেছেন।

এমএসআই/এমএআর/