বিজ্ঞাপন

আবাসিকের গ্যাস যেন এখন রাতের অতিথি!

আবাসিকের গ্যাস যেন এখন রাতের অতিথি!

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সেলিনা হোসেন কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। দিনভর অফিসে ব্যস্ত সময় পার করে ক্লান্ত শরীরে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরেন। এরপর পরিবারের সদস্যদের জন্য যান রান্না করতে। আর তখনই ঘটছে বিপত্তি। কারণ নিভুনিভু করে জ্বলতে থাকা চুলার আগুনের সেই তাপে তো আর রান্না করা যায় না। রাত ১২টার আগে চুলায় গ্যাসের চাপ না আসায় তাকে অপেক্ষা করতে হয় মধ্যরাত পর্যন্ত। 

আবাসিকে গ্যাসের এ বিড়ম্বনা শুধু সেলিনা হোসেনের নয়। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকার বাসিন্দারা বর্তমানে গ্যাস সংকটের মধ্যে রয়েছেন। দিনের অধিকাংশ সময় পাইপলাইনের চুলায় গ্যাস থাকছে না, আসে গভীর রাতে। এতে করে গৃহিণী ও কর্মজীবী উভয়েই পড়ছেন বিপাকে।

সেলিনা হোসেন বলেন, সকাল-দুপুর বাইরেই খেতে হয়। সারাদিন অফিস শেষে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে ইচ্ছা হয় দ্রুত সব কাজ শেষ করে বিশ্রাম নেওয়ার। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। গ্যাসের অপেক্ষায় বসে থাকা লাগে। এমনও অনেক দিন গেছে, ছুটির সময়ে দুপুরে রান্না করতে পারিনি, খাওয়াও হয়নি পরিবারের সদস্যদের।

পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশীয় গ্যাস খাতের উৎপাদন প্রতিনিয়তই কমছে। বুধবার দেশের ২২ গ্যাসক্ষেত্র থেকে মোট গ্যাস উৎপাদিত হয়েছে ৯৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। অথচ গত বছর একই দিনে গ্যাস উৎপাদিত হয়েছ ১১২৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। অর্থাৎ, বছরের ব্যবধানে গ্যাস উৎপাদন কমেছে ১৫৭ মিলিয়ন ঘনফুট

গ্যাসের এ বিড়ম্বনার কথা জানান মিরপুরে বসবাসকারী গৃহিণী হোসনে আরা। তিনি বলেন, সকাল থেকে চুলায় কোনো গ্যাস থাকে না, মিটিমিটি জ্বলে। তা দিয়ে রান্নাবান্না করা সম্ভব হয় না। সারাদিন শেষে রাত ১২-১টা নাগাদ গ্যাসের চাপ আসে। এ ভোগান্তির শেষ কবে, জানা নেই।

dhakapost

পাইপলাইন গ্যাসের এ দুর্ভোগ শুধু মোহাম্মদপুর বা মিরপুরেই নয়; বিরাজ করছে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকাজুড়েই। রামপুরা, বাড্ডা, বনশ্রী, মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ভোগান্তি পোহাচ্ছেন গ্রাহকরা।

বাড্ডা নিবাসী মো. ফাহাদ বলেন, সারাদিন বা সন্ধ্যায়ও চুলায় গ্যাস থাকে না, একেবারে রাতে আসে। এতে করে রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়ার রুটিন ওলট-পালট হয়ে গেছে।

বেড়েছে খরচ

সরকারি পাইপলাইনের দুই চুলার গ্যাস বিল বর্তমানে ১০৮০ টাকা। যদিও, গ্যাস সংকটে এ বিল এখন গ্রাহকের বাড়তি বোঝা হয়েই দাঁড়িয়েছে। রাতজেগে অধিকাংশ গ্রাহকের পক্ষে রান্নাবান্নার কাজ করা সম্ভব হয় না। ফলে একপ্রকার বাধ্য হয়ে গ্রাহকদের কিনতে হয় এলপি গ্যাস।

বর্তমানে বিদ্যুতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, যদিও তাদের চাহিদা ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। একইভাবে সারে এখন চাহিদা ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট, সরবরাহ করা হচ্ছে ১৬৫ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রধান খাতগুলো ঘাটতিতে থাকায় চাপ এসে পড়ছে আবাসিকে, ফলে গ্রাহকরা ভোগান্তির মধ্যেই রয়ে যাচ্ছেন

যদিও, এলপি গ্যাসের দাম সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি। সর্বশেষ ১২ কেজি এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৯৪০ টাকা। ‘বাজার অব্যবস্থাপনায়’ গ্রাহকদের তা কিনতে হয় ২১০০-২২০০ টাকায়। ফলে, শুধু গ্যাসের পেছনেই প্রতি মাসে গ্রাহকের খরচ হচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা।

মিরপুর নিবাসী জসীম উদ্দিন বলেন, প্রতি মাসে ঠিকই বিল দিই, অথচ গ্যাস আসে মাঝরাতে। সে সময় গ্যাস দিয়ে আমি কী করবো?

সংকটের কারণ কী?

গ্যাস সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে খাতসংশ্লিষ্টরা সরবরাহের পরিমাণ কমে যাওয়াকেই উল্লেখ করছেন। দেশে বর্তমানে গ্যাসের দৈনিক মোট চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বুধবার (১৩ মে) পর্যন্ত মোট সরবরাহ করা হয়েছে ২৭২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে প্রাকৃতিক গ্যাস খাত থেকে এসেছে ১৬৭৩ মিলিয়ন ঘনফুট ও এলএনজি থেকে এসেছে ১০৫১ মিলিয়ন ঘনফুট।

dhakapost

পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, দেশীয় গ্যাস খাতের উৎপাদন প্রতিনিয়তই কমছে। বুধবার দেশের ২২ গ্যাসক্ষেত্র থেকে মোট গ্যাস উৎপাদিত হয়েছে ৯৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। অথচ গত বছর একই দিনে গ্যাস উৎপাদিত হয়েছে ১১২৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। অর্থাৎ, বছরের ব্যবধানে গ্যাস উৎপাদন কমেছে ১৫৭ মিলিয়ন ঘনফুট।

দেশে সবচেয়ে বেশি গ্যাস উৎপাদনকারী বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ডের উৎপাদন কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। গতবছর একইদিনে (১৩ মে) ক্ষেত্রটি গ্যাস উৎপন্ন করেছিল ৯৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট, গতকাল যা উৎপাদন করেছে ৭৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলা বলছে, বিবিয়ানার উৎপাদন ২০২৯ সালের শুরুতে ৪৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসতে পারে।

এদিকে, গ্যাসের চাহিদা সামাল দিতে ২০১৮ সালে দেশে এলএনজি সরবরাহ শুরু করা হয়। ওই সময় দেশীয় উৎস থেকে দৈনিক সরবরাহ হতো ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বাইরে তখন একটি এলএনজি টার্মিনাল দিয়ে দৈনিক ৩০০ থেকে ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতো। এরপর ক্রমান্বয়ে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় আরও একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা হয়। দুটি টার্মিনাল দৈনিক ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারে। এখন দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমতে থাকায় অবকাঠামো না থাকায় এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি করাও সম্ভব নয়। নতুন টার্মিনাল স্থাপন করলেও ২০২৮ সালের আগে তা উৎপাদনে আসতে পারবে না।

গুরুত্বের তালিকায় নেই আবাসিক খাত!

তিতাস গ্যাসের আওতায় বর্তমানে পাইপলাইন গ্যাসের গ্রাহক রয়েছেন ২৭ লাখ ৭৮ হাজার ৯৬৪ জন। তবে সরকারি নীতির অধীনে, গ্যাস সরবরাহের তালিকায় আবাসিক খাত এখন গুরুত্বের তালিকায় নেই। সরকার প্রধানত এখন গুরুত্ব দিচ্ছে বিদ্যুৎ, সার এবং ইন্ডাস্ট্রিতে।

বর্তমানে বিদ্যুতে সরবরাহ করা হচ্ছে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, যদিও তাদের চাহিদা ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। একইভাবে সারে এখন চাহিদা ২৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট, সরবরাহ করা হচ্ছে ১৬৫ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রধান খাতগুলো ঘাটতিতে থাকায় চাপ এসে পড়ছে আবাসিকে, ফলে গ্রাহকরা ভোগান্তির মধ্যেই রয়ে যাচ্ছেন।

dhakapost

তিতাস সূত্রে জানা যায়, সামগ্রিক গ্যাস সংকটের বিষয়টি উপলব্ধি করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আবাসিক খাতে গ্যাসের সংযোগ একেবারেই বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে ছিল। তার বিপরীতে এলপিজি ব্যবহারের বিষয়টি বিকল্প সমাধান হিসেবে ভাবা হয়। তার ধারাবাহিকতায় শর্তসাপেক্ষে সরকারিভাবে এলপিজি আমদানি করতে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি বিপিসিকে নীতিগত অনুমোদন দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

এদিকে, আবাসিকে গ্যাস সংকটের বিষয়টির সমাধানে প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপনের উদ্যোগ নেয় তিতাস গ্যাস। বর্তমানে ৪ লাখ ৪০ হাজার গ্রাহক প্রিপেইড মিটারের অধীনে রয়েছেন। তিতাস আরো ১৭ লাখ প্রিপেইড মিটার স্থাপনের পরিকল্পনার খসড়া মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। তবে, নতুন সরকার সে প্রস্তাবের অনুমোদন দেয়নি।

কি বলছেন সংশ্লিষ্টরা?

গ্যাস সংকটের কারণ হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসের পরিমাণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি, অবৈধ সংযোগকেও বহুলাংশে দায়ী করছেন তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, দেশে গ্যাসের যে সংকট রয়েছে, সেটি আরো প্রকট করে তুলেছে অবৈধ সংযোগ। প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করেও তা রোধ করা যাচ্ছে না। এতে করে বৈধ গ্রাহকরা গ্যাসের চাপ কম পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে গ্যাসের উৎপাদন না বাড়লে সংকট কাটার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এখন বিদ্যুৎ, সারে গ্যাস দেওয়া হচ্ছে। আর সহসা এলএনজির সরবরাহ বাড়ানোও সম্ভব নয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন বলেন, গ্যাস সংকটের ফলে আবাসিকে পুরোপুরি গ্যাস দেওয়াও সম্ভব নয়। কারণ বিদ্যুৎ, সারে গ্যাস দিতে গিয়ে সেখানেও একটা ঘাটতি যাচ্ছে। আমার মতে, আবাসিকে গ্যাস সংযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া উচিত এবং বিকল্প হিসেবে সেখানে এলপিজির ব্যবহার বাড়ানো উচিত। তবে অবশ্যই, সেজন্য এলপিজিতে সরকারের ভর্তুকি দিতে হবে, যাতে জনগণের ওপর চাপ না পড়ে।

ওএফএ/জেডএস