বিজ্ঞাপন

স্যাটেলাইটে ধরা পড়ল পৃথিবীর ১০ পানির উৎসের ভয়াবহ সংকট

স্যাটেলাইটে ধরা পড়ল পৃথিবীর ১০ পানির উৎসের ভয়াবহ সংকট

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী বাড়ছে তাপমাত্রা। এতে করে পরিবর্তন হচ্ছে সামগ্রিক পরিবেশ। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে শুকিয়ে যাচ্ছে সুপেয় পানির নানা উৎস। স্যাটেলাইট ইমেজে এসব পরিবর্তন ধরা পড়েছে। বুধবার (১৭ জুন) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। 

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, প্রতি বছর পৃথিবীতে প্রায় ৩২৪ ট্রিলিয়ন লিটার সুপেয় পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে বছরে ২৮ কোটি মানুষের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এটিতে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘মহাদেশীয় শুষ্কতা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভয়াবহ খরা এবং পানি ও ভূমির টেকসই ব্যবহার না করার ফলে এমন পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। 

আল জাজিরা বিশ্বের ১০টি স্থানের চিত্র তুলে ধরেছে। এসব জায়ড়ায় হ্রদ, নদী ও বাঁধের পানি ক্রমাগত শুকিয়ে সংকুচিত হয়ে আসছে।

১. পারানা নদী, আর্জেন্টিনা

আমাজনের পর দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী হলো পারানা নদী। এটি প্রায় ৪ হাজার ৯০০ কিলোমিটার বিস্তৃত। ব্রাজিল, প্যরাগুয়ে এবং আর্জেন্টিনার মধ্যে এ নদী সংযোগ স্থাপন করেছে। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ হিসেবেও পরিচিত। 

১৯৯০ এবং ২০২৬ সালের স্যাটেলাইট চিত্রে নৌপথের ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। এতে দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে রোজারিও বন্দরের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমতে দেখা গেছে। এর ফলে শস্যবাহী জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং ইতাইপু বাঁধের জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে। এমনকি নদীর অনেক জায়গা শুকিয়ে চর ও নতুন দ্বীপের সৃষ্টি হয়েছে।

২. লেক পোপো, বলিভিয়া

বলিভিয়ার ৩ হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত লেক পোপো আশঙ্কাজনকভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮৪ এবং ২০২০ সালের তুলনামূলক চিত্রে বিষয়টি উঠে এসেছে। ছবিতে একসময় বলিভিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম হ্রদ প্রায় বিলুপ্ত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। পানির গতিপথ পরিবর্তন, খরা ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে এটি লবণাক্ত সমভূমিতে পরিণত হয়েছে। ফলে স্থানীয় মৎস্যসম্পদ ও আদিবাসী উরু সম্প্রদায়ের জীবিকার উৎস ধ্বংস হয়ে গেছে। 

৩. লেক এনগামি, বতসোয়ানা

বতসোয়ানার এ হ্রদটির তুলনামূলক চিত্রেও পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। ১৯৮৪ এবং ২০২০ সালের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, তীব্র খরা ও উজানের পানি কমে যাওয়ায় হ্রদটি এক পর্যায়ে প্রায় শুকিয়ে গিয়েছে। পরে অবশ্য এটির আংশিক পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। হ্রদটি শুকিয়ে যাওয়ায় উর্বর মাছ ধরার এলাকা ও গবাদি পশুর চারণভূমি ফেটে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। 

৪. লাগুনা দে আকুলেয়ো, চিলি

চিলির রাজধানী সান্টিয়াগোর কাছে অবস্থিত এ লেকটি গত কয়েক দশকের খরা ও পানির সংকটের কারণে বিলীন হয়ে গেছে। ২০০৭ এবং ২০২৬ সালের তুলনামূলক চিত্রে একসময়ের জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র এবং স্থানীয়দের জীবনযাত্রার এই উৎসটি এই হ্রদটি পুরো শুকিয়ে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে।  

৫. লেক উর্মিয়া, ইরান

একসময়ের মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম লবণাক্ত পানির হ্রদ ছিল ইরানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত লেক উর্মিয়া। ১৯৯০ এর দশকেও হ্রদটি প্রায় ৬ হাজার বর্গকিলো বিস্তৃত ছিল। বর্তমানে এ আয়তন কমে মাত্র ৫৮১ বর্গ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। লাগাতার খরা, কৃষিকাজে পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের হ্রদটি শুকিয়ে গেছে। 

৬. আল-চিবাশ জলাভূমি, ইরাক

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের এ জলাভূমিটি মেসোপটেমীয় জলাভূমির অংশ এবং ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত ঐতিহ্যবাহী স্থান। এ অঞ্চলের ১৯৮৪ ও ২০২০ সালের চিত্রের তুলনামূলক চিত্রে শুকিয়ে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃষ্টিপাত এবং পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টার ফলে এটির কিছু অংশে প্রাণ ফিরেছে। 

৭. আম্বোভম্বে, মাদাগাস্কার

মাদাগাস্কারের দক্ষিণাঞ্চলের আম্বোবম্বে শহরটি জলবায়ু পরিবর্তন ও খরাপ্রবণ এলাকা। ১৯৮৫ এবং ২০২০ সালের তুলনামূলক চিত্রে অঞ্চলটির ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটের প্রমাণ মিলেছে। বছরের পর বছর খরা ও ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার ফলে লাল বালুঝড় এবং বৃষ্টিপাতের অভাব দেখা দিয়েছে। এতে চাষাবাদ ও গবাদি পশুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এমনকি বহু মানুষ এর প্রভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। 

৮. লেক ফাগুইবাইন, মালি

আফ্রিকান অঞ্চলে সাহারা মরুভূমির প্রান্তে অবস্থিত এ হ্রদটি গত কয়েক দশকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। 

৯. লেক মিড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

লেক মিড যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম কৃত্রিম জলাধার। ১৯৩০-এর দশকে কলোরাডো নদীতে হুভার বাঁধ নির্মাণের ফলে এটি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দশকের খরা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং পানির অতিরিক্ত চাহিদার ফলে জলাধারটির পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও মেক্সিকোর লাখ লাখ মানুষ পানি সংকটে পড়েছেন। 

১০. দক্ষিণ আরাল সাগর, উজবেকিস্তান

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অন্যতম উদাহরণ হলো উজবেকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। ১৯৮৪ এবং ২০২০ সালের তুলনামূলক চিত্রের হ্রদটির ৯০ শতাংশেরও বেশি সংকুচিত হয়ে যেতে দেখা গেছে। বর্তমানে এটি ধুলোবালি ও লবণাক্ত মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা

এমবি