বিজ্ঞাপন

৯৪ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভর্তুকি ছাড়ে অর্থ বিভাগের কঠোর শর্ত, চাপে পিডিবি

৯৪ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভর্তুকি ছাড়ে অর্থ বিভাগের কঠোর শর্ত, চাপে পিডিবি

দেশের ৯৪টি বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল পরিশোধে ২ হাজার ৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি ছাড় দিয়েছে অর্থ বিভাগ। তবে এই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমদানিকৃত বিদ্যুতের বিল পরিশোধে নিষেধাজ্ঞা ও ক্যাপাসিটি চার্জ হ্রাসসহ বেশকিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ এবং কঠোর আর্থিক বিধিনিষেধের ফলে ভারতের আদানি গ্রুপসহ অন্যান্য উৎস থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের বকেয়া পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

সম্প্রতি পিডিবিকে দেওয়া এক চিঠিতে অর্থ বিভাগ ভর্তুকি প্রদানের ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করে। চিঠিতে জানানো হয়, বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি মোকাবিলায় বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতি পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা ব্যবস্থাপনার আওতায় মার্চ মাসের জন্য ২ হাজার ৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ নির্ধারিত ৮৫টি আইপিপি এবং ৯টি ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল পরিশোধে ব্যয় করতে হবে।

তবে এই ভর্তুকি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগ সুনির্দিষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে। শর্ত অনুযায়ী, বরাদ্দকৃত অর্থ তালিকায় থাকা ৯৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া অন্য কোনো কেন্দ্রে খরচ করা যাবে না। পাশাপাশি, অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সরকারের প্রচলিত সকল আর্থিক বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং প্রতিটি বিল পরিশোধের বিস্তারিত বিবরণী পরবর্তী ভর্তুকি প্রস্তাবের সঙ্গে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। 

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে আমদানিকৃত বিদ্যুতের বিষয়টি। চিঠিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এবারের ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টি বিবেচনা করা হয়নি। ফলে পিডিবি এই অর্থ ব্যবহার করে ভারত বা নেপাল থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের বকেয়া বিল পরিশোধ করতে পারবে না। যা প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে।

বর্তমানে পিডিবি নেপাল থেকে ৪০ মেগাওয়াট এবং ভারত থেকে বড় অঙ্কের বিদ্যুৎ আমদানি করছে। এর মধ্যে ভারতের ত্রিপুরা থেকে ১৬০ মেগাওয়াট, ভেড়ামারা সীমান্ত দিয়ে ১ হাজার মেগাওয়াট এবং আদানি পাওয়ার থেকে ১ হাজার ৪৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে। আমদানিকৃত এই বিদ্যুৎ ক্রয় বাবদ প্রতিষ্ঠানটির বকেয়া পাহাড়সম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পিডিবির তথ্যমতে, বর্তমানে আমদানিকৃত বিদ্যুতের বকেয়া বিলের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা, যার সিংহভাগই পাওনা রয়েছে আদানি। বকেয়া টাকা পরিশোধের জন্য গত ১৯ এপ্রিল পিডিবিকে কড়া চিঠি দিয়েছে আদানি গ্রুপ। চিঠিতে বলা হয়েছে, আগামী জুনের মধ্যে পাওনা বাবদ ৮৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হবে।

শর্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই বিল পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে বকেয়ার ওপর বিলম্ব ফি (লেট ফি) যুক্ত হবে, যা পিডিবির ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।

পিডিবি মূলত সরকারি ভর্তুকি এবং বিদ্যুৎ বিক্রির আয়ের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি খরচ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। এই ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে প্রতি মাসেই ভর্তুকি প্রদান করতে হচ্ছে।

অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি ছাড় করা হয়েছে। বর্তমান অর্থবছরে এই খাতে মোট ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও পিডিবির প্রকৃত চাহিদা তার চেয়ে অনেক বেশি। এর মধ্যে আমদানিকৃত বিদ্যুতের বিল পরিশোধে ভর্তুকির অর্থ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক চাপে ফেলেছে।

এদিকে, নতুন যুক্ত হওয়া দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভর্তুকি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্র দুটি হলো, বিআর পাওয়ারজেনের শ্রীপুর ১৬০ মেগাওয়াট ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র এবং আরপিসিএল-নরিনকোর পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদন না থাকা এবং বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে পর্যাপ্ত স্পষ্টীকরণ না পাওয়ায় এই দুটি কেন্দ্রের জন্য ভর্তুকি ছাড় করেনি অর্থ বিভাগ।

চিঠিতে জানানো হয়েছে, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে পিডিবি জানিয়েছে, এই কেন্দ্র দুটি থেকে ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ কেনা শুরু হয়েছে এবং এর বিপরীতে বড় অঙ্কের বিল জমা পড়েছে। ভর্তুকির টাকা থেকে এই বিলগুলো সময়মতো পরিশোধ করা না গেলে কেন্দ্রগুলো থেকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থ বিভাগের চিঠিতে জানানো হয়েছে, এখন থেকে ভর্তুকি হিসাব করার প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করতে হবে। আগামী মাস থেকে পিডিবিকে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রভিত্তিক মিশ্র জ্বালানি ব্যবহারের তুলনামূলক বিবরণী এবং কম ট্যারিফে পাইকারি বিদ্যুৎ বিক্রির ফলে ক্ষতির পরিমাণ প্রতিবেদন আকারে জমা দিতে হবে। এছাড়া, ভর্তুকির অর্থ পাওয়ার ক্ষেত্রে ক্যাপাসিটি চার্জ যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনা এবং অনুমোদিত ট্যারিফ রেট অনুযায়ী প্রকৃত ভর্তুকির সমন্বয় নিশ্চিত করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইপিপি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মাসভিত্তিক ক্ষতির আলাদা হিসাব মে মাস থেকে নিয়মিত দাখিল করতে হবে। পাশাপাশি ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে পিডিবি ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটগুলোতে ইআরপি (রিয়েল টাইম ডেটা) সফটওয়্যার বাস্তবায়নের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও সংকটের কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাত তীব্র আর্থিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে, দেশীয় গ্যাস খাতের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকায় সরকার সাধারণত ভর্তুকির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ করে থাকে। অর্থ বিভাগের আরোপ করা নতুন ও কঠোর শর্তাবলী সেই নিয়মিত সমন্বয় প্রক্রিয়াকে পিডিবির জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিডিবির একজন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিনিয়তই খরচ বাড়ছে, যা সামাল দিতে ভর্তুকি অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ব্যয় কমাতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক উৎপাদনে জোর দেওয়া হচ্ছে। এই কঠিন সময়ে অর্থ বিভাগের দেওয়া নতুন শর্তগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে এই কড়াকড়িকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাজেট-১ অধিশাখার যুগ্মসচিব মোহাম্মদ ফারুক-উজ-জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, পিডিবিকে আর্থিকভাবে আরও সুশৃঙ্খল (ডিসিপ্লিনড) করার লক্ষ্যেই এই শর্তগুলো দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, দেশ পরিচালনার স্বার্থে সরকার জ্বালানি খাতে সবসময় সহায়তা দেবে, তবে তা অবশ্যই আর্থিক বিধিনিষেধ ও নিয়মের মধ্যে হতে হবে। মূলত পিডিবির আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অর্থ বিভাগের দেওয়া নতুন শর্তগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেনও। তিনি মনে করেন, যে উদ্দেশ্যে ভর্তুকি দেওয়া হয়, তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। 

এক্ষেত্রে তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিইআরসি-র (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন) ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, বিইআরসি যেহেতু নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কাজ করে, তাই এই বিষয়গুলো তারা আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করতে পারত।

ভর্তুকির এই কড়াকড়ি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শর্তের প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কিছুটা বিঘ্ন ঘটতে পারে এবং ইতোমধ্যে লোডশেডিংয়ের মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। ভর্তুকি প্রদানের ক্ষেত্রে এই কড়াকড়ি যদি উৎপাদনকে কিছুটা ব্যাহতও করে, তবুও সামগ্রিক সংকটের তুলনায় এর প্রভাব হবে যৎসামান্য।

ওএফএ/এমএসএ