# করতে হয় ২৪ ঘণ্টা ডিউটি, পান না ওভারটাইম
# তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা
# শিফটিং ডিউটির মাধ্যমে কাজের চাপ কমানোর দাবি
‘কি আশায় বাঁধি খেলাঘর বেদনার বালুচরে...’ প্রখ্যাত এই গানের লাইনটি আজ আর কেবল সুরের মূর্ছনা বা সাধারণ কোনো কাব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আজ হয়ে উঠেছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের মাঠ পর্যায়ে কর্মরত শত শত নিরাপত্তা প্রহরীর জীবনের নির্মম বাস্তবতার এক জীবন্ত ও করুণ আর্তনাদ। ২০১৪ সালে দেশের সেবা করার এক বুক আশা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে যারা এই পদে যোগদান করেছিলেন, এক যুগ পরে ২০২৬ সালে এসেও তাদের জীবন এখন কেবলই এক দীর্ঘশ্বাস।
জানা গেছে, দীর্ঘ ১২ বছর ধরে পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাসহ কোনো বিশেষ উৎসব বা সরকারি ছুটির দিনেও ছুটি পান না নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের মাঠ পর্যায়ের নিরাপত্তা প্রহরীরা। দেশের ৬৪টি জেলা নির্বাচন অফিসে মাত্র একজন করে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রহরী কর্মরত থাকায় শিফটিংয়েরও সুযোগ নেই, করতে হয় ২৪ ঘণ্টা ডিউটি। কিন্তু সেজন্য কোনো ওভারটাইম পান না। এর মধ্যে গত জানুয়ারিতে ৫ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়া প্রহরীদের ‘দপ্তরি’ পদে পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও তা কেবল প্রতি আঞ্চলিক অফিসে মাত্র একজন করে সীমিত রাখা হয়েছে। যা তারা ‘এক ধরনের প্রহসন’ বলে মনে করছেন।
আক্ষেপ করে জেলা নির্বাচন অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইদ্রিস আলী (ছদ্মনাম) নামের এক নিরাপত্তা প্রহরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, সাধারণ মানুষের উৎসবের দিনগুলো যেখানে কাটে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে, সেখানে আমাদের নিরাপত্তা প্রহরীদের জোটে না সাধারণ কোনো ছুটি। বছরের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদুল ফিতর কিংবা ঈদুল আজহার দিনেও ছুটি মেলে না। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা তো দূরের কথা, উল্টো ছুটির দিনগুলো আরও অতিরিক্ত ডিউটি চেপে বসে। অনেক সময় টানা ২৪ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ধরে অফিস পাহারা দিতে হয়। এই নির্মম নিয়মের কারণে আমরা পরিবার, সমাজ এবং আপনজন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি।
তিনি জানান, দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ঘরে থাকা বৃদ্ধা মা, অপেক্ষায় থাকা স্ত্রী কিংবা বড় হয়ে ওঠা সন্তানের মুখটা মনভরে আমরা দেখতে পারি না। দেশের স্বার্থে, রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির নিরাপত্তা রক্ষায় আমরা নিজেদের জীবনের সোনালী সময় এবং ব্যক্তিগত সব সুখ বিলিয়ে দিয়েছি। আমরা বছরের পর বছর ধরে মুখ বুজে সহ্য করে চলেছি সব অবহেলা ও অপমান।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সারাদেশের ৬৪ জেলা নির্বাচন অফিসে একজন করে ৬৪ জন নিরাপত্তা প্রহরী কর্মরত আছেন। আর সারাদেশের উপজেলাগুলোতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমাদের এই ৬৪ জনের কোনো ছুটি নেই, নেই ঈদ আনন্দ। আমি গত ১২ বছরে দুই ঈদে ছুটি পেয়েছি কয়েক ঘণ্টার জন্য।
কাদিয়া (ছদ্মনাম) নামে আরেক জেলায় কর্মরত এক নিরাপত্তা প্রহরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ত্যাগ আর মৌলিক অধিকারবঞ্চনা যে এক জিনিস নয়, তা আজ দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। আমাদের অভিযোগ, এটি কোনো ভাগ্যের নির্মম পরিহাস নয়, বরং এটি কর্তৃপক্ষের তৈরি করা এক চরম ও পরিকল্পিত বৈষম্য। দেশের প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী যেখানে ৮ ঘণ্টার বেশি দায়িত্ব পালন করলে ওভারটাইম বা অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার ভাতা বা রাইট পাওয়ার স্পষ্ট আইনি অধিকার রয়েছে, সেখানে নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের নিরাপত্তা প্রহরীরা দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা পাহারায় থেকেও এক পয়সা ওভারটাইম পান না। অথচ এক অদ্ভুত ও দ্বিমুখী নীতিমালার কারণে একই ছাদের নিচে একই অফিসে কর্মরত গাড়ি চালকরা ঠিকই নিয়মিত ওভারটাইমের মোটা অঙ্কের সুবিধা ভোগ করছেন। এই চরম বৈষম্য আমাদের প্রহরীদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি এই তীব্র ক্ষোভের মুখে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, যেখানে ৫ বছর চাকরি পূর্ণ হলে নিরাপত্তা প্রহরীদের ‘দপ্তরী’ পদে পদায়নের কথা বলা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে বড় সুযোগ মনে হলেও এর ভেতরের বাস্তবতা অত্যন্ত হতাশাজনক। এই পদায়নের পদ সংখ্যা এতটাই সীমিত রাখা হয়েছে যে, প্রতিটি আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসে মাত্র একজন করে এই সুযোগ পাবেন। ফলে মাঠ পর্যায়ের সিংহভাগ প্রহরীর ভাগ্যেই পদোন্নতি মিলবে না, যা এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে এক ধরনের প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।
তিনি আরো বলেন, সবচেয়ে বড় শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নিরাপত্তা প্রহরীদের জানমালের নিরাপত্তা এবং কর্মক্ষেত্রে চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। কিছুদিন আগেই ঠাকুরগাঁও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার হাতে একজন কর্তব্যরত নিরাপত্তা প্রহরীকে হত্যার উদ্দেশ্যে নৃশংসভাবে পিটিয়ে জখম করার ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় চিকিৎসা নিয়ে সেই প্রহরী কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরলেও, আজ পর্যন্ত সেই ঘটনার দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক কোনো বিচার হয়নি। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে, যার ফলে প্রতিনিয়ত সাধারণ কর্মচারীদের লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। আমরা এত কিছুর পরও চরম সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও সম্পত্তির নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছি আমরা। ধৈর্যেরও একটা সীমা থাকে। এবার আমরা তীব্র ক্ষোভ ও হুঁশিয়ারি প্রকাশ করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি, আর যেন কোনো কর্মকর্তা কোনো নিরাপত্তা প্রহরীর গায়ে হাত তোলার সাহস না দেখান। মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার পর যদি তাদের ওপর আবার শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়, তবে আগামীতে প্রহরীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার দাঁতভাঙা জবাব দেবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নির্বাচন কমিশনের একাধিক নিরাপত্তা প্রহরী জানান, এই চরম মানবিক সংকট ও বৈষম্য দূর করা এখন সময়ের দাবি। প্রতি জেলা নির্বাচন অফিসে অন্তত ৩ জন করে নিরাপত্তা প্রহরীর নতুন পদ সৃষ্টি করা হোক, যাতে শিফটিং ডিউটির মাধ্যমে কাজের অমানবিক চাপ কমে আসে। একইসঙ্গে শ্রম আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত কাজের জন্য দ্রুত ওভারটাইমের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। কর্তৃপক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক এবং একদিন মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে এই অবিচারের জবাবদিহি করতে হবে, এই বোধ থেকে হলেও আমাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
এসআর/জেডএস
