বিজ্ঞাপন

ব্যাপক অসামঞ্জস্য পেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন

খাদ্য গুদাম প্রকল্প— প্রকল্প নাকি সরকারি অর্থ গিলে খাওয়ার বন্দোবস্ত

খাদ্য গুদাম প্রকল্প— প্রকল্প নাকি সরকারি অর্থ গিলে খাওয়ার বন্দোবস্ত

দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার ও সরকারি খাদ্য গুদামের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতের যৌক্তিকতা ও স্বচ্ছতার বিষয়ে ব্যাপক অসামঞ্জস্য পেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। "তিনটি সিএসডি ও একটি এলএসডির খাদ্য গুদাম ও আনুষঙ্গিক সুবিধাদির মেরামত বা পুনঃনির্মাণ বা নির্মাণ" শীর্ষক এই প্রকল্পের আওতায় ২৪টি খাদ্য গুদাম পুননির্মাণ ও ৫৩টি গুদাম মেরামতের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও পরামর্শক নিয়োগ এবং ব্যয়ের বিবরণীতে ব্যাপক অসামঞ্জস্য ও অস্পষ্টতা খুঁজে পেয়েছে কমিশন। বিশেষ করে বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও কতজন পরামর্শক কাজ করবেন তার নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি খরচের বিবরণীতেও প্রায় দুই কোটি টাকার বড় ধরনের অমিল পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি ২০২২ সালের একটি পুরোনো সমীক্ষা রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘ ৪ বছর পর ২০২৬ সালে এসে কেন এই ডিপিপি প্রস্তাব করা হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। 

ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে চারশ কোটি টাকা

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৩১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। চার বছর মেয়াদে এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে (জিওবি) বাস্তবায়ন করা হবে। তবে একনেকে উঠার আগে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এই প্রকল্পের বিভিন্ন খাতের ব্যয়ের যৌক্তিকতা, স্বচ্ছতার অভাব এবং তথ্যের অসামঞ্জস্যতা নিয়ে একগাদা প্রশ্ন ও পর্যবেক্ষণ তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো (এমটিবিএফ) বিবেচনা করে এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় কমিয়ে সীমিত আকারে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

কমিশনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রস্তাবিত ডিপিপির প্রাক্কলিত ব্যয়ের সার-সংক্ষেপে বিভিন্ন খাতের ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত ও অস্পষ্ট। যেমন-যাতায়াত ভাতা, বাড়ি ভাড়া, উৎসব ভাতা, সম্মানী, আপ্যায়ন, ভ্রমণ ব্যয় এবং কম্পিউটার সামগ্রীসহ নানা প্রশাসনিক খাতে লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ‘সম্মানী’ খাতের অর্থ দুইবার উল্লেখ করা হলেও তা কী বাবদ ব্যয় হবে, সেটির বিস্তারিত কোনো বিবরণ দেওয়া হয়নি। এছাড়া মূলধন খাতে লাইন ও তার এবং ভূমি উন্নয়নের জন্য কোটি কোটি টাকার প্রস্তাব করা হলেও প্রতিটি স্থাপনা অনুযায়ী আলাদা কোনো তালিকা বা একক বিবরণী যুক্ত করা হয়নি। এমনকি ৫ হাজার ৯০৪টি প্লাস্টিকের ডানেজ ক্রয়ের জন্য ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকার প্রস্তাব এবং ল্যাপটপ, কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার ও আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের ক্ষেত্রে পণ্যের প্রয়োজনীয়তা, সংখ্যা এবং একক মূল্য পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। ৬০ মেট্রিক টন ক্ষমতাসম্পন্ন ওয়েব্রিজ ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ স্থাপনের জন্য ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও এর কোনো বিস্তারিত বিভাজন ডিপিপিতে নেই। অফিস সরঞ্জাম হিসেবে ১টি ফটোকপিয়ার ও ২টি এসি ক্রয়ের জন্য ৬ লাখ টাকার প্রস্তাবের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পিইসি।

একটি মাইক্রো ভাড়ার জন্য চাওয়া হয়েছে ১ কোট ৮ লাখ টাকা

সবচেয়ে বড় অসামঞ্জস্যতা দেখা গেছে যানবাহন ভাড়া এবং আবাসন ভবন নির্মাণ খাতে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে একটি মাইক্রোবাস ভাড়ার জন্য ১ কোটি ৮ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে মাসিক ভাড়া ধরা হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। পরিকল্পনা কমিশন মনে করে এই ভাড়ার হার অতিরিক্ত এবং একই সাথে গাড়ি চালকের বেতন, জ্বালানি বা রক্ষণাবেক্ষণ খরচের কোনো বিস্তারিত তথ্য এখানে দেওয়া হয়নি। আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন নির্মাণ খাতে যথাক্রমে ১৮৩ কোটি ১৪ লাখ এবং ১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকার বিশাল প্রস্তাব করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, তেজগাঁও এবং ধর্মপুর এলএসডিতে ম্যানেজার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারদের বাস ভবন, রেস্ট হাউস এবং স্টাফ কোয়ার্টার নির্মাণের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অনাবাসিক খাতের আওতায় অফিস ভবন, গার্ড হাউজ, আনসার শেড, মসজিদ ও লেবার শেড নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হলেও কমিশনের মতে, মূল প্রকল্পের নামের সাথে এই ধরনের বিশাল নির্মাণ কার্যক্রমের কোনো সামঞ্জস্য নেই।

চার বছর আগের সমীক্ষায় এখন প্রকল্প বাস্তবায়ন কেন? প্রশ্ন পরিকল্পনা কমিশনের

এছাড়াও প্রকল্পের আর্থিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে। বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘শহীদুল কনসালটেন্ট লিঃ’ দ্বারা এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছিল জানুয়ারি ২০২২ সালে। কমিশন প্রশ্ন তুলেছে, ২০২২ সালের সমীক্ষা রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘ ৪ বছর পর ২০২৬ সালে এসে কেন এই ডিপিপি প্রস্তাব করা হলো। এছাড়া পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জন্য ৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও কতজন পরামর্শক কাজ করবেন তার নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি, এমনকি খরচের বিবরণীতেও প্রায় দুই কোটি টাকার বড় অমিল পাওয়া গেছে। এমটিবিএফ সংক্রান্ত ছকে অর্থায়নের সামর্থ্য ঋণাত্মক থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এই প্রকল্পের অর্থায়ন নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়েও খাদ্য মন্ত্রণালয় কোনো সুনির্দিষ্ট মতামত দেয়নি। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরিকল্পনা কমিশন এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট করা, বিভিন্ন স্থাপনা ও মেরামতের কাজের বিবরণ একক ও পরিমাণসহ আলাদা তালিকা আকারে জমা দেওয়া এবং থোক বরাদ্দের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে ব্যয়ের লাগাম টেনে প্রকল্পটিকে একটি যৌক্তিক ও সীমিত আকারে পুনর্বিন্যাস করার জন্য পিইসি সভায় বিস্তারিত আলোচনার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে কোথায়?

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের খাদ্য, ভূমি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের যুগ্মপ্রধান মোছাঃ মাজেদা ইয়াসমীন জানান, দেশের চারটি বিভাগের চারটি জেলার একটি উপজেলা ও তিনটি সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো জরাজীর্ণ খাদ্য গুদাম পুনঃনির্মাণ ও পুরাতন গুদাম মেরামতের মাধ্যমে কার্যকর ধারণক্ষমতা ৫৬ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন বৃদ্ধি করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা। তবে এই মহৎ উদ্দেশ্য ও পটভূমির আড়ালে ডিপিপিতে ব্যয়ের বিবরণী তৈরিতে ব্যাপক অস্পষ্টতা ও ত্রুটি খুঁজে পেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরিকল্পনা কমিশন এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য সুনির্দিষ্ট করা, বিভিন্ন স্থাপনা ও মেরামতের কাজের বিবরণ একক ও পরিমাণসহ আলাদা তালিকা আকারে জমা দেওয়া এবং থোক বরাদ্দের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করার তাগিদ দিয়েছে। ত্রুটিগুলো যাচাই-বাছাই করে পিইসি সভার নির্দেশ মোতাবেক প্রকল্পটির ডিপিপি পুনর্গঠন করার পর এটি একনেকের জন্য চূড়ান্ত করা হতে পারে।

এসআর/এমটিআই

বিজ্ঞাপন