বিজ্ঞাপন

যে ‘ম্যাজিকে’ জাতিসংঘে খলিলুর রহমানের জয়

যে ‘ম্যাজিকে’ জাতিসংঘে খলিলুর রহমানের জয়

দীর্ঘ ৪০ বছর পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ এই পদে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। তিনি সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব সামলাবেন।

ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর খলিলুর রহমানকে এ পদের জন্য নির্বাচিত করা হয়। মাত্র তিন মাসের প্রচারণায় এই অর্জনকে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর পেছনে নিয়ামক হিসেবে কোন বিষয়টি কাজ করেছে, সেই উত্তর খুঁজছেন কেউ কেউ।

একটি বিশেষ সমীকরণে ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হওয়ার কথা বলছেন ঢাকা, নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনের কর্মরত বাংলাদেশের কূটনীতিকরা। আর সেটি হলো- ‘রেসিপ্রোকাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট’ বা আরএসএ (একে অপরকে ভোট প্রদানের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতামূলক চুক্তি)।

ভোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এমন একাধিক কূটনীতিক ঢাকা পোস্টকে বলেছেন, মাত্র তিন মাসের প্রচারণায় বাংলাদেশের প্রার্থী জয়ী হওয়ার মূল কারণ ‘আরএসএ’। বাংলাদেশের প্রার্থী ‘আরএসএ’ কৌশলে এগিয়ে গেছেন, ভোটে জিতেছেন। খলিলুর রহমান জয়ের জন্য যে পরিমাণ ভোট পেয়েছেন তার বড় একটা অংশ কিন্তু ‘আরএসএ’ থেকে পাওয়া।

dhakapost

নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়। নির্বাচনে খলিলুর রহমানের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাইপ্রাসের বহুপক্ষীয়তাবিষয়ক বিশেষ দূত আন্দ্রেজ কাকাউরিস। সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে দুই প্রার্থীকে ভোট দেন। নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছে ১৯০টি। খলিলুর রহমান পেয়েছেন ৯৯ ভোট এবং সাইপ্রাসের কাকোরিস ৯১ ভোট পেয়েছেন। ৮ ভোটের ব্যবধানে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে হারিয়েছেন খলিলুর রহমান।

খলিলুর রহমানের এ বিজয়কে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতি জাতিসংঘের সদস্যদের ‘আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা ও ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক প্রভাবের স্পষ্ট প্রতিফলন’ হিসেবে অভিহিত করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মঙ্গলবার রাতে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ সাফল্য দেশের জন্য শুধু মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদে নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা নয়, বরং এটি বহুপক্ষীয় কূটনীতি, শান্তি, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে দেশের সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

এই জয়ের পেছনে ‘তিনটি বিষয় মূল ভূমিকা পালন করেছে’ দাবি করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক অর্জনের পেছনে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নেতৃত্ব, সীমিত সময়ে দেশের সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, মাত্র তিন মাসের প্রচারণায় বাংলাদেশের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। রেসিপ্রোকাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্টের মাধ্যমে এবার ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। ৭০টার বেশি সদস্য রাষ্ট্রের আরএসএ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। এরমধ্যে দু’চারটা ভোট ছুটে যেতে পারে। এর পাশাপাশি বেশ কয়েকটি দেশ মৌখিকভাবে নিশ্চিত করেছিল তারা বাংলাদেশের প্রার্থকে ভোট দেবে। আমাদের প্রার্থী যে ভোট পেয়েছে তার প্রমাণ ফলাফলের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি।

dhakapost

ভোটের ফলাফল ঘোষণার সময় জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদকক্ষে উপস্থিত ছিলেন খলিলুর রহমান। নিজের জেতার খবরের ঘোষণায় দুই হাত তুলে তাকে মোনাজাত করতে দেখা গেছে। নতুন সভাপতি হয়ে সাধারণ পরিষদ কক্ষে বক্তব্য দেন খলিলুর রহমান।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে জয়ের প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন, আমি সব সদস্য রাষ্ট্রের সভাপতি হব। আমি আমার কাজের সময় সব সদস্য রাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করব। আমি ব্যক্তিগত মতামতকে পিজিএ হিসেবে আমার কাজে হস্তক্ষেপ করতে দেব না।

এ জয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও মালদ্বীপ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছে।

গত মে মাসের মাঝামাঝিতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে সংস্থার সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়ে খলিলুর রহমান বলেছিলেন, নির্বাচিত হলে তিনি ‘পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং তিনি হবেন সবার সভাপতি।

খলিলুর রহমানের এমন অঙ্গীকারের পর থেকে জাতিসংঘে সভাপতি নির্বাচিত হলে তিনি কি বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দেবেন-এ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন শুরু হয়; যা এখনো চলমান। তবে তিনি যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ছেন না তা অনেকটাই নিশ্চিত। কেননা, তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এক বছরের জন্য ছুটির আবেদন করেছেন বলে জানা গেছে।

আঞ্চলিকভাবে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে এবার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে পরবর্তী সেশনের সভাপতি পেয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর বিশ্বনেতাদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক।

এর আগে, বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

যেভাবে প্রার্থী হলেন খলিলুর

২০২০ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন এই পদে নির্বাচনের আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং ২০২৬ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে বাংলাদেশের প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে মনোনীত করা হয়েছিল। তবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস ছাড়াও ফিলিস্তিনের প্রতিনিধি থাকায় ঢাকা তখন কিছুটা ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয় খলিলুর রহমানকে, যিনি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রার্থী পরিবর্তন করে খলিলুর রহমানকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয় এবং তৌহিদ হোসেন বাদ পড়েন। এর মধ্যে ফিলিস্তিনও নির্বাচন থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেয়। মঙ্গলবারের (২ জুন) নির্বাচনে বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ৮ ভোটের ব্যবধানে সাইপ্রাসের প্রার্থী বাংলাদেশের প্রার্থীর কাছে হেরে গেছে।

এনআই/এমএন