বিজ্ঞাপন

ঢাকা পোস্টে সংবাদ প্রকাশের পর আনোয়ারায় প্যারাবনের মাটি কাটা বন্ধ

ঢাকা পোস্টে সংবাদ প্রকাশের পর আনোয়ারায় প্যারাবনের মাটি কাটা বন্ধ

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলের রক্ষাকবচ গহিরা প্যারাবন থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটার বিরুদ্ধে ঢাকা পোস্টে সংবাদ প্রকাশের পর টনক নড়েছে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের নামে বন বিভাগের সংরক্ষিত এলাকার মাটি কেটে নেওয়ার ঘটনায় জেলা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন তদন্ত শুরু করায় আপাতত মাটি কাটা বন্ধ রয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি বনাঞ্চলের এই মাটি কাটার পেছনে বেসরকারি দুটি পক্ষের মধ্যে লাখ টাকার একটি লিখিত চুক্তিও হয়েছিল, যা সম্পূর্ণ বেআইনি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভূমি প্রশাসন ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষ্যে গত ৫ জুন ঢাকা পোস্টে ‘বনখেকোদের পর মাটিখেকোদের কবলে আনোয়ারার গহিরা প্যারাবন’ শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সংবাদটি নজরে আসার পরপরই নড়েচড়ে বসেছে বন বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় প্রশাসন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৬ জুন জেলা পুলিশের একটি বিশেষ টিম সরেজমিন তদন্তে নামে। তবে তদন্তের স্বার্থে বিষয়টি এখনো গোপন রেখেছে পুলিশ প্রশাসন। 

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, আনোয়ারার গহিরা এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শেখ এমদাদুল হক মামুন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কিছু ব্যক্তি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও এর আশপাশের এলাকা থেকে অবৈধভাবে মাটি কেটে বাঁধে ব্যবহার করছেন। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ খ্যাত এই বনাঞ্চল এবং সামগ্রিক পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

সংরক্ষিত বনের মাটি কাটার এই বিষয়ে বন বিভাগ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান একে অপরকে দোষারোপ করে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিলেও, অনুসন্ধানে দুপক্ষের মধ্যে একটি লিখিত চুক্তিনামা প্রকাশ্যে এসেছে। এই চুক্তিপত্রের মাধ্যমেই মূলত গহিরা মৌজার জমি থেকে বিপুল পরিমাণ মাটি উত্তোলনের গোপন বিষয়টি সামনে আসে।

অনুসন্ধানে পাওয়া চুক্তিপত্র অনুযায়ী, মাটি কাটার এই প্রক্রিয়ায় প্রথম পক্ষ হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন ওরিয়ন ফার্মা লিমিটেডের ভূমি ব্যবস্থাপক মো. খোরশেদ আলম এবং দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে রয়েছেন ঠিকাদার মোর্শেদ শেখ এমদাদুল হক আল মামুন।

চুক্তিপত্রের শর্তানুসারে, গহিরা মৌজার বিএস ৮০৫৬, ৮৬২৬ ও ৮৬৩৭ দাগের আওতাধীন ১২ কানি (৪৮০ শতক) জমি থেকে ছয় ফুট গভীর পর্যন্ত মাটি উত্তোলন করার কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রতি কানি জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয় এক লাখ টাকা। এই চুক্তির মোট অর্থ দুই কিস্তিতে পরিশোধের কথা থাকলেও, ইতোমধ্যে প্রথম কিস্তিতে ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে বলেও চুক্তিপত্রে উল্লেখ আছে।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও নৌবাহিনীর সহযোগিতায় বাস্তবায়নাধীন ‘বেড়িবাঁধ ও নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পে’র কাজের জন্য এই মাটি ব্যবহার করা হবে। একইসঙ্গে মাটি কাটার পূর্বে আনোয়ারার সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়ার শর্তটি দ্বিতীয় পক্ষের (ঠিকাদার) ওপর অর্পণ করা হয়েছিল।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, চুক্তিপত্রে যেসব দাগের জমি থেকে মাটি কাটার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার একটি বড় অংশই বন বিভাগের সংরক্ষিত প্যারাবনের আওতাভুক্ত। ফলে সরকারি বনাঞ্চলের মাটি এভাবে বেসরকারি দুটি পক্ষের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে বিক্রি ও উত্তোলনের বিষয়টি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠেছে। 

এছাড়া, সরেজমিনে পরিদর্শনেও ওই এলাকা থেকে নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে প্রায় ছয় ফুট গভীর পর্যন্ত মাটি কাটার সত্যতা পাওয়া গেছে।

এদিকে বাংলাদেশে সমুদ্র উপকূল, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, খাসজমি ও বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকা থেকে মাটি কাটা ও বিক্রি বিভিন্ন আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী, এসব এলাকা থেকে মাটি উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনুমতি বাধ্যতামূলক। অনুমতি ছাড়া মাটি কাটা বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, অনিয়ন্ত্রিত মাটি উত্তোলন উপকূলীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং দুর্যোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। 

তিনি বলেন, উপকূলীয় প্যারাবন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে জনপদকে সুরক্ষা দেয়। এ ধরনের সংরক্ষিত এলাকায় মাটি কাটা হলে বনভূমির স্থায়িত্ব ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। 

মাটি বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে ওরিয়ন ফার্মা লিমিটেডের ভূমি ব্যবস্থাপক মো. খোরশেদ আলম বলেন, মাটি কাটার জন্য ভূমি সহকারী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। 

তিনি দাবি করেন, সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে নামমাত্র মূল্যে মাটি বিক্রি করা হচ্ছিল। 

সরকারি জমি, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকায় মাটি কাটা ও বিক্রির বৈধতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের উদ্যোগের কথা জানার পর মাটি বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছি।

মাটি কাটার চুক্তির বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শেখ এমদাদুল হক মামুনের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

অনুমতির বিষয়টি জানতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও আনোয়ারা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরা বলেন, মাটি কাটার অনুমতির প্রশ্নই আসে না। জায়গাটির মালিকানা কার, সে বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না। তাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করছি না। তবে মাটি কাটার জন্য আমাদের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার দাবি সত্য নয়। বিষয়টি আমরাও তদন্ত করে দেখছি।

এনামুল হক নাবিদ/এমএসএ