ঈদ ঘিরে সড়কে অব্যবস্থাপনা
১৪ দিনে ৩০৪ দুর্ঘটনায় নিহত ৩০৯
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এবার ঈদুল ফিতর ঘিরে সড়ক, নৌ ও রেলপথে পরিবহণের বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলসহ নানা অব্যবস্থাপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা। যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাবে ১৪ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত ৩০৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩০৯ জন নিহত এবং ৯০২ জন আহত হয়েছেন। পরিবহণসংশ্লিষ্টরা জানান, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানো, চালকের ক্লান্তি ও বেপরোয়া গতি-সব মিলিয়ে মহাসড়ক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘাটতিও দুর্ঘটনা বাড়ার বড় কারণ। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. হাদীউজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ‘কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা খাতের সিংহভাগের বিনিয়োগ রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। এ কারণে মানুষ ঢাকায় আসছে। যেহেতু তারা ঢাকার মানুষ নন, এজন্য উৎসবে তারা প্রিয়জনদের কাছে যাবেন-এটাই স্বাভাবিক। এ ধারা বদলাতে পারলে সমস্যার টেকসই সমাধান মিলবে। অর্থাৎ ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাহলে মানুষ ঢাকামুখী হবে না। তখন এত সমস্যা থাকবে না। এত মানুষের ঈদ করতে গ্রামে যেতে হবে না।’ তিনি জানান, রেল, নৌ ও সড়কপথে বহুমুখী সমস্যা রয়েছে। জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে। সেখানে বিজ্ঞানের চর্চা করা হচ্ছে না। সমস্যা রয়েছে-যানবাহন, চালক-মালিক ও নিয়ন্ত্রকদেরও। তারপরও সরকারি, বেসরকারি যানবাহনের সমন্বয়ে ঈদযাত্রার আয়োজন করলে পরিবহণ সংকট অনেকাংশে কমানো সম্ভব। আর পরিবহণ সংকট কমলে এবং ব্যবস্থাপনা উন্নত হলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমবে। তবে টেকসই সমাধান করতে হলে ঢাকার বাইরে বিনিয়োগ করতে হবে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতিরি মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সড়ক, নৌ ও রেলপথের সমস্যা চিহ্নিত। সমাধানের পথও দায়িত্বপ্রাপ্তদের জানা। শুধু কাজটি হচ্ছে না। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা আন্তরিক হয়ে কাজগুলো করলে সড়ক, নৌ ও রেলপথের দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিশৃঙ্খলা রোধে কঠোর নির্দেশনা ছিল। যে কারণে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কম হয়েছে। অংশীজনরা ভয়ে ছিলেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যোগাযোগ খাতের অংশীজনদের মধ্যে গাছাড়া ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে অব্যবস্থাপনা বাড়ছে। তাই দুর্ঘটনা ও হতাহত বেড়েছে।’
ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘এবার ঈদের আগে ও পরে যাত্রাপথে নানা অব্যবস্থাপনা চোখে পড়েছে। কিছু জায়গায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। এগুলো দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা। সমস্যা চিহ্নিত হলেও দায়িত্বপ্রাপ্তরা সমাধান করছেন না। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে।’ তিনি জানান, বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং অদক্ষ চালকদের গাড়ি চালানোসহ নানা অব্যবস্থাপনার চিত্র দৃশ্যমান হতে দেখা গেছে। এসব সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে সড়ক, নৌ ও রেলপথে দুর্ঘটনা কমবে না।
ঈদের সময় দুর্ঘটনা, হতাহত বাড়ছেই : যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের আগে ও পরের কয়েকদিনে সড়ক দুর্ঘটনা ক্রমাগত বেড়ে যায়। এ সময় ২ হাজার ৬৯২টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ৩ হাজার ৩৬ জন নিহত এবং ৮ হাজার ২৪৬ জন আহত হন। আর এবার ঈদের আগে ও পরের কয়েকদিনে তিন শতাধিক নিহত এবং ৯ শতাধিক আহত হয়েছেন। এখনো মানুষ কর্মস্থলে ফিরছেন।
যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে ১২১টি। এতে ১৮৬ জন নিহত এবং ৭৪৬ জন আহত হন। ২০১৭ সালে দুর্ঘটনা ঘটে ২০৫টি। এতে ২৭৪ জন নিহত এবং ৮৪৮ জন আহত হন। ২০১৮ সালে ২৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৩৯ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৬৫ জন আহত হন। ২০১৯ সালে ২৩২টি দুর্ঘটনায় ২৭৩ জন নিহত এবং ৮৪৯ জন আহত হন। ২০২০ সালে ১৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬৮ জন নিহত এবং ২৮৩ জন আহত হন। ২০২১ সালে ৩১৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২৩ জন নিহত এবং ৬২২ জন আহত হন। ২০২২ সালে ৩৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত এবং ৮৪৪ জন আহত হন। ২০২৩ সালে ৩০৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২৮ জন নিহত এবং ৫৬৫ জন আহত হন। ২০২৪ সালে ৩৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ৩৯৮ জন আহত হন। আর ২০২৫ সালে ৩১৫টি দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত এবং ৮২৬ জন আহত হন।
বছরে সড়কে ঝরছে ৮ হাজার প্রাণ : দেশের সড়ক ও মহাসড়কে বছরে গড়ে ৫ হাজার ৭০১টি দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে মারা যাচ্ছেন প্রায় ৮ হাজার মানুষ। আহত হচ্ছেন ১৪ হাজারের বেশি। যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সারা দেশে মাসে গড়ে দুর্ঘটনা ঘটছে ৪৭৫টি। এতে গড়ে সাড়ে ছয় শতাধিক নিহত এবং সহস্রাধিক আহত হচ্ছেন। এই হিসাবে দৈনিক দুর্ঘটনা ঘটছে ১৫টি। নিহত হচ্ছেন ২২ জন এবং আহত হচ্ছেন ৩৮ জন।
তথ্য বিশ্লেষণ করে আরও দেখা যায়, গত ১১ বছরে সড়কে মোট দুর্ঘটনা ঘটেছে ৬২ হাজার ৭১৫টি। এসব দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৪ হাজার ২৩ জন। ২০১৪ সালে মোট দুর্ঘটনা হয়েছিল ৫ হাজার ৯২৮টি। এরপর কোন বছরে দুর্ঘটনা কিছুটা কমেছে এবং কোনো বছরে কিছুটা বেড়েছে। তবে ২০২৪ সালের মোট দুর্ঘটনার হয় ৬ হাজার ৩৫৯টি।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহত হয় ৮ হাজার ৫৮১ জন। পরের বছর এ চিত্র কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬৪২ জন। পরের বছরগুলোতে মৃত্যুর হার কিছুটা উঠানামা করলেও কাছাকাছি জায়গায় ছিল। সবশেষ ২০২৪ সালে সড়কে মৃত্যু হয় ৮ হাজার ৫৪৩ জন। আরও জানা যায়, ২০২২ সালে সড়কে ৬ হাজার ৭৪৯টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ৯ হাজার ৯৫১ জন নিহত এবং ১২ হাজার ৩৫৬ জন অহত হন। দুর্ঘটনার ১৪ শতাংশ বাসে, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানে ২৮.৩৯ শতাংশ এবং মোটরসাইকেলে ২৪ দশমিক ৮০ শতাংশ ঘটছে।
সড়ক ও মহাসড়কগুলোয় দুর্ঘটনার পেছনে বেপরোয়া গাড়ি চালানোসহ বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষকরা। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-১. বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো ২. চালকের অতিরিক্ত ট্রিপ ৩. ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ৪. নজরদারি ও তদারকির অভাব এবং ৫. চালকদের অদক্ষতা। এআরআইর গবেষণায় দেখা যায়, সড়কে দুর্ঘটনার অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে-চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ব্যবহার, মাদক সেবন, চালকের বেপরোয়া মনোভাব ইত্যাদি। তাছাড়া চালকদের ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স’ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা এবং সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করা। চালকরা যথাযথ প্রশিক্ষণ না পাওয়ায় অনেকে সড়কের চিহ্ন এবং আইনকানুন সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই। অনেক ক্ষেত্রে চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সও থাকে না।
সড়ক পরিবহণ ও সেতু, নৌ ও রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিবার কল দিয়ে এবং খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে এ বিষয়ে মন্তব্য জানার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সাড়া না দেওয়ায় তার মন্তব্য নেওয়া যায়নি।

