যাত্রী কল্যাণ সমিতির সংবাদ সম্মেলন
ঈদে ৩৪৬ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩৫১
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এবার ঈদযাত্রায় ১৫ দিনে সারা দেশে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত এবং ১ হাজার ৪৬ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত এবং ২২৩ জন আহত হয়েছেন। সবমিলিয়ে ঈদযাত্রার শুরুর দিন ১৪ মার্চ থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা ২৮ মার্চ পর্যন্ত সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৮৮ জন আহত হয়েছেন। সোমবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। এ সময় দুর্ঘটনার ৮টি কারণ এবং সেগুলো প্রতিরোধে ১৩ দফা সুপারিশ করেন সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নৌপথে ৮টি দুর্ঘটনায় ৮ জন নিহত, ১৯ জন আহত ও ৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। একই সময়ে জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ২ হাজার ১৭৮ জন ভর্তি হয়েছেন। চলমান ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে গত ১৫ দিনে হতাহত বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশে দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি। গত বছরের সঙ্গে পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত ও ৮২৬ জন আহত হয়েছিলেন। ওই সময়ের চেয়ে এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা ৮.৯৫, প্রাণহানি ৮.২৬ ও আহতের ঘটনা ২১.০৫ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে মোটরসাইকেল। এবারের ঈদে ১২৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৫ জন নিহত ও ১১৪ জন আহত হয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬.১২, নিহতের ৩৮.৪৬ এবং আহতের ১০.৮৯ শতাংশ প্রায়। হতাহতদের পরিচয় নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মধ্যে ৭১ জন চালক, ৫৫ শিশু, ৫৪ জন পথচারী, ৫১ জন নারী, ৪২ জন শিক্ষার্থী, ১০ জন পরিবহণ শ্রমিক, ৭ জন শিক্ষক, ৪ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ৩ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ৩ জন প্রকৌশলী, ২ জন সাংবাদিক, ১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ১ জন চিকিৎসক বলে পরিচয় মিলেছে।
দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহনের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার শিকার মোট যানবাহনের ২৭.১৬ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৭.৭৩ শতাংশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান, ১৬.২২ শতাংশ বাস, ১৫.২৮ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৮.৪৯ শতাংশ কার-মাইক্রো, ৭.৭৩ শতাংশ নছিমন-করিমন এবং ৭.৩৫ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা। অন্যদিকে দুর্ঘটনার ৩৫.৮৩ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৩২.৩৬ শতাংশ পথচারীকে চাপা দেওয়া, ২২.২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়া, ০.৫৭ শতাংশ ট্রেন-যানবাহনে, ০.৫৭ শতাংশ চাকায় ওড়না প্যাঁচিয়ে ও ৮.৩৮ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে সংঘটিত হয়েছে।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪৩.০৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০.০৫ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২১.৯৬ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়। এছাড়াও সারাদেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৪.০৪ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ০.২৮ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে ও ০.৫৭ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকারের শপথ গ্রহণের দুদিন পর রমজান শুরু হয় এবং এক মাসের মাথায় ঈদযাত্রা। নতুন সরকারের ব্যর্থতা খুঁজতে নয় বরং সরকারকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার মাধ্যমে প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদযাত্রায় প্রাণহানির পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে সমিতি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার নতুন হলেও পুরোনো আমলা, পূর্বের মাফিয়া নেতাদের অনুসারী বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের বর্তমান সরকার-সর্মথিত নেতাদের চাপে বিগত সরকারের মতো এবারও সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রনালয়, নৌ-পরিবহণ মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, বিআইডব্লিউটিএ-সহ পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার ঈদ ব্যবস্থাপনা সভায় লাখো যাত্রীদের পক্ষে কথা বলার মতো যাত্রী ও নাগরিক সমাজের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি। মালিকরা একচেটিয়া সুবিধা লুফে নিতে এমন অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠন প্রভাবমুক্ত থাকায় ঈদযাত্রা খানিকটা স্বস্তিদায়ক হয়েছিল, যা সর্বমহলে প্রশংসা পেয়েছে। এবারের ঈদে বাস মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ফেডারেশনের প্রভাবের কারণে ভাড়া নৈরাজ্য ও সড়ক দুর্ঘটনা, পরিবহণের বিশৃঙ্খলা অতীতের দুটি ঈদের তুলনায় বেড়েছে। তার অভিযোগ, সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা ছিল বাস মালিক সমিতি নিয়ন্ত্রিত। ফলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পদ্ধতি অনুসরণের কারণে সড়ক পরিবহণ সেক্টরে সরকারের কিছু কিছু কর্মকাণ্ড ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার কারণ হিসাবে সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশার অবাধ চলাচল; জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং ও সড়কবাতি না থাকা, রেলক্রসিংয়ে হঠাৎ বাস উঠে আসা; সড়কে রোড ডিভাইডার না থাকা, বিভিন্ন বাঁকে গাছপালায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি; মহাসড়কের নির্মাণ ত্রুটি, যানবাহনের নানাবিধ ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা; উলটো পথে যানবাহন, সড়কে চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহণ; অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রীবহন; বেপরোয়া যানবাহন চালানো, একজন চালকের অতিরিক্ত সময় ধরে যানবাহন চালানোকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের লক্ষ্যে বাসের ছাদে, খোলা ট্রাক ও পিকআপে, ট্রেনের ছাদে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীসাধারণের যাতায়াতকে দায়ী করা হয়েছে।
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশগুলোর মধ্যে সড়কে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং ভাড়া আদায়ে স্মার্ট পদ্ধতি চালু; মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা আমদানি ও নিবন্ধন বন্ধ; জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে রাতের বেলায় অবাধে চলাচলের জন্য আলোকসজ্জার ব্যবস্থা; দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ ও যানবাহনের ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস প্রদান; বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলের সরকার ঘোষিত ৬০ ঘণ্টা ইনক্লুসিভ ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান বন্ধ; পরিবহণ সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও মালিক সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ; গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে সার্ভিস লেইনের ব্যবস্থা; সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা; মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখাসহ রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন; উন্নতমানের আধুনিক বাস নেটওর্য়াক গড়ে তোলা, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি; মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা; সড়ক পরিবহণ মন্ত্রণালয়ে সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইউনিট চালুর কথা বলা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে যাত্রী কল্যাণ সমিতির অর্থ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান, সদস্য আলমগীর কবির, মনজুর হোসেন ঈসা, ড্রাইভার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের সভাপতি বাদল আহমেদ, মনজুর হোসেন, আজাদ হোসেন টিপু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
