Logo
Logo
×

প্রথম পাতা

বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

এবার সবার জন্য বাজেট

লালফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে ব্যবসায় ব্যয় কমানোই প্রধান লক্ষ্য * পুলিশ, র‌্যাব দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায় না * কালোটাকা সাদা করার সুযোগ নেই, ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এবার সবার জন্য বাজেট

ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুক্রবার বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বক্তৃতা করছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী -যুগান্তর

সীমিত সম্পদের মধ্যেও দেশের সব মানুষকে বাজেটের আওতায় আনা হয়েছে। দেশের ‘সবার জন্য এই বাজেট’। দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ ও লালফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে ব্যবসায় ব্যয় হ্রাস করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা বলেছেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগে গতি বাড়ানো, ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, গত দেড় দশকের ‘পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি’ থেকে বেরিয়ে এবারের বাজেট দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, গত দেড় দশকে দেশের সম্পদ লুটপাট হয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে এবং অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে।

অর্থমন্ত্রী সূচনা বক্তব্যের পরই সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। এ সময় প্রিন্ট, টেলিভিশন এবং অনলাইন মিডিয়ার শতাধিক সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। বেশির ভাগ সাংবাদিক প্রশ্ন করার সুযোগ পাননি। বিকাল ৩টা ১০ মিনিটে সম্মেলনস্থলে আসেন অর্থমন্ত্রী। তার ডানপাশে বসেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বামপাশে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অপ্রয়োজনীয় নিয়মকানুন, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতা। এসব দূর করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই সরকারের অগ্রাধিকার। ব্যবসা সহজ করার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই তলানির দিকে। এর অর্থ হলো দেশে ব্যবসা পরিচালনার খরচও তুলনামূলকভাবে বেশি। লাইসেন্স গ্রহণ থেকে শুরু করে পণ্য আমদানি, বন্দরে খালাস, পরিবহণ ও সরবরাহ প্রতিটি স্তরে উদ্যোক্তাদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

তিনি বলেন, ব্যবসার খরচ কমাতে সরকার ‘ডিরেগুলেশন’ বা বিনিয়ন্ত্রণ নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কমিয়ে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়িয়ে উদ্যোক্তাদের জন্য একটি হয়রানিমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। এতে স্থানীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগও উৎসাহিত হবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, গত দেড় দশক আমাদের অর্থনীতি ছিল পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি। কিছু মানুষের অর্থনীতি। নির্দিষ্ট কিছু মানুষ ও গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আমরা সেই ধারা থেকে বেরিয়ে অর্থনীতিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই। সীমিত সম্পদের মধ্যেও প্রতিটি মানুষকে বাজেটের আওতায় আনার চেষ্টা করেছি। তিনি দাবি করেন, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সুবিধার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় নিয়ে আসাই সরকারের লক্ষ্য। কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী, তরুণ, প্রবীণ, সংখ্যালঘুসব শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়েই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে, কোনো শ্রেণি, পেশা, ধর্ম বা বর্ণের মানুষ এবারের বাজেটের আওতার বাইরে নেই। সীমিত সম্পদের মধ্যেও সবার জন্য কিছু না কিছু বরাদ্দ, কর্মসূচি ও রোডম্যাপ রাখা হয়েছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছি। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের নীতিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হবে বলে মনে করি না। তিনি বলেন, ব্যবসায়িক ব্যয় কমাতে পারলে মূল্যস্ফীতির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

ব্যবসার খরচ বৃদ্ধির জায়গাগুলো চিহ্নিত করেছি। আমদানি পণ্যের কারণে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যয় কমানোর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। মূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মনে করেন না অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, পুলিশ, র‌্যাব বা সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সঠিক নীতি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।

বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে : সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমবে বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু। তিনি বলেন, বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমার কথা। কারণ অভাব থাকলে দুর্নীতির প্রবণতা থাকে। ১১ বছর ধরে পে-স্কেল হয়নি, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। সুতরাং এটা সমন্বয় করা দরকার। বেতন বাড়লে, আয় বাড়বে তখন নিশ্চয় দুর্নীতি কমার কথা।

ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো হবে : স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ধীরে ধীরে কমিয়ে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ বাড়ানোর কথাও জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রোগ্রামিং ও বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার আগের প্রচলিত ধারা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। কারণ বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপট দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনা, বিনিয়োগের ধরন এবং বিনিয়োগ মূল্যায়নের মানদণ্ডও বদলে যাচ্ছে। এ কারণে দেশের সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার (পাবলিক ফাইন্যান্স) বিদ্যমান কাঠামোতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো এমন একটি আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে বেসরকারি খাত অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসাবে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে এবং ব্যাংকিং খাতেও সরকারি ও বেসরকারি ঋণের মধ্যে একটি স্বাস্থ্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। এর আগে অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, চলতি অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। নতুন বাজেটে তা কমিয়ে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি সরকার ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সুকুক বন্ড ইস্যু করেছে, যা ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। এ বন্ডের বিপরীতে প্রায় ৭২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার আবেদন জমা পড়েছে।

সংস্কৃতিকে অর্থনীতির সম্পদে রূপ দিতে ৮০০ কোটির প্রকল্প : দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস তৈরির লক্ষ্যে পর্যটনের সঙ্গে থিয়েটার, সংগীত, চলচ্চিত্র ও শিল্পকলাকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংস্কৃতিকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দিতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এটি দেশের ইতিহাসে প্রথম উদ্যোগ। এছাড়া ঢাকার পূর্বাচলে একটি সৃজনশীল হাব করা হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি নির্ধারিত মৌজা রেট এবং প্রকৃত বাজারমূল্যের মধ্যে বিদ্যমান বড় ব্যবধান দূর করতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু। তিনি বলেছেন, মৌজা রেট বাস্তবসম্মত করা গেলে কালোটাকা সাদা করার সুযোগও অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশে তেলের ঘাটতি হয়নি-জ্বালানিমন্ত্রী : বাংলাদেশে জ্বালানির কোনো ঘাটতি তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেছেন, যুদ্ধের প্রভাবে আমেরিকার মতো দেশে ফ্লোরিডা ড্রাই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে ড্রাই হয়নি। বাংলাদেশে তেল সব সময় স্টেবল ছিল, এখনো আছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে পুনরুজ্জীবিত করা, স্থল ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা হয়েছে।

কালোটাকা সাদা করার সুযোগ নেই, ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, এনবিআর চেয়ারম্যান : প্রস্তাবিত বাজেটে কালোটাকা বৈধ করার ব্যবস্থা নয়, বরং সম্পত্তি লেনদেনে প্রকৃত মূল্য ঘোষণার মাধ্যমে করসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের একটি প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। এ বিষয়ে জনমনে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, গত অর্থবছরে জমি বিক্রেতাদের জন্য একটি বিশেষ বিধান করা হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে জমি প্রকৃত মূল্যে বিক্রি হলেও কম দামে নিবন্ধন করা হয়। এতে বিক্রেতারা প্রকৃত বিক্রয়মূল্যের অতিরিক্ত অর্থের উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জটিলতায় পড়েন। এ অবস্থায় ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের প্রমাণ এবং বায়নানামা উপস্থাপন করতে পারলে তারা নিয়মিত হারে মূলধনি মুনাফার ওপর কর পরিশোধ করে সেই অর্থ বৈধ করার সুযোগ পান। এবার একই ধরনের একটি সুবিধা সম্পত্তি বা ফ্ল্যাটের ক্রেতাদের জন্য বিবেচনা করা হয়েছিল।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম