বাজেট নিয়ে ব্যবসায়ী নেতাদের প্রতিক্রিয়া
বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রস্তাবিত বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সাহসী বাজেট। এ বাজেটে যেমন ব্যবসা সহজ করার উদ্যোগ আছে, তেমনি স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রচেষ্টাও বিদ্যমান। তবে ব্যাংক ঋণের উচ্চসুদ, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট সমাধানে কার্যকর রূপরেখা দৃশ্যমান হয়নি। সামগ্রিকভাবে বাজেট বাস্তবায়ন করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের অনেক ভালো বাজেটও বাস্তবায়নের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাই সরকারকে বাজেট বাস্তবায়নে অর্থবছর শুরুর প্রথম দিন থেকে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করতে হবে। প্রস্তাবিত বাজেট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় শুক্রবার যুগান্তরের কাছে ব্যবসায়ী সংগঠনের কয়েকজন নেতা এমন মন্তব্য করেন।
তারা বলেন, এ বাজেটে সরকারের দেশপ্রেমের অনেক স্বাক্ষর রয়েছে। তবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার উদ্যোক্তাদের এখনো ভাবাচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেই। শিল্পের উন্নতি করতে হলে সবার আগে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানো ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানবিষয়ক সব বাধা দূর করে দেশীয় ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করাও জরুরি। বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা প্রশংসনীয়। তবে রাজস্ব আহরণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি খাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না, সেবার মান ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
বিসিআই সভাপতি : প্রস্তাবিত বাজেটকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ সংস্কারমুখী ও ব্যবসাবান্ধব বলে মনে করেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তার মতে, ১৯ কোটি মানুষের জন্য এ ধরনের বড় বাজেট দরকার আছে। তবে বাজেট বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য বাজেট বাস্তবায়নের প্রথম দিন থেকেই সুনির্দিষ্ট টাইমলাইন ও পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী আরও বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের গৃহীত সংস্কারমুখী পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত, কর ব্যবস্থা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের অঙ্গীকার দীর্ঘমেয়াদে শিল্প খাতের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তিনি আরও বলেন, বন্ধ কলকারখানা চালুসহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রয়েছে, যা ইতিবাচক হিসাবে কাজ করবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য হালাল পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকে যুক্ত করা আবশ্যক। কারণ বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে এবং বাংলাদেশের এ সুযোগ গ্রহণ করার সক্ষমতা রয়েছে। ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে ব্যবসা সহজীকরণ প্রস্তাবগুলো সাহসী পদক্ষেপ। পাশাপাশি উন্নয়ন লক্ষ্য হিসাবে ১০টি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা এবং ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি ও সুনীল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে সহায়ক হবে।
বিটিএমএ সভাপতি : শওকত আজিজ রাসেলের মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি সক্ষমতা ও ব্যবসা সহজীকরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা ইতিবাচক। স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাস, সোলার বিদ্যুতে নীতিগত সুবিধা এবং ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজীকরণের পদক্ষেপ প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক। তবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার উদ্যোক্তাদের এখনো ভাবাচ্ছে।
শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বাজেটে বিটিএমএ’র কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আংশিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে টেক্সটাইল শিল্পসংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় নজরে আনা হয়নি। যেমন-টেক্সটাইল খাতের বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় করপোরেট ট্যাক্সের হার ১৫% নির্ধারণ করা জরুরি। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি বিবেচনায় মূল্য সংযোজনের হার বহাল রাখা প্রয়োজন। ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার দেশীয় শিল্পের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং এর অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।
শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বর্তমানে প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতটি উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, কাঁচামালের মূল্য অস্থিরতা, উৎসে কর ও চলতি মূলধনের অভাব এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাই আয়কর ও উৎসে করের স্থিতিশীলতা, কাঁচামাল ও মেশিনারি আমদানিতে নীতিগত সহায়তা, বিনিয়োগ সুবিধা এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের জন্য দীর্ঘমেয়াদি করনীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
বিকেএমইএ সভাপতি
প্রস্তাবিত বাজেট সন্তোষজনক, অর্থনৈতিক সংকটগুলো কাটাতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে সংকটে থাকা ও বন্ধ কারখানার জন্য সহায়তা কর্মসূচি। তবে বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর-এমনটি মনে করেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।
তিনি বলেন, এবারের বাজেটে তৈরি পোশাকশিল্পের দুটি প্রধান প্রত্যাশা ছিল-কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের প্রেক্ষাপটে বিকল্প জ্বালানি সোলার সিস্টেমের আমদানি সহজীকরণ করা। দুটি জায়গাতেই এ বাজেটে নেওয়া পদক্ষেপ সন্তোষজনক। কর সুবিধা সম্প্রসারণ এবং মধ্যমেয়াদি নীতিকাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার মতো কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ রয়েছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রপ্তানিমুখী নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি এবং দেশীয় বন্ডেড প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহের সুযোগ রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক। এছাড়া রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিদ্যমান সুবিধাগুলো বহাল রাখা এবং বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধার মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্তও ইতিবাচক। এ ধরনের নীতিগত ধারাবাহিকতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় সহায়তা করবে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে বাজেটে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেই-এমন মন্তব্য করে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি এখনো অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি বিষয়। সৌরবিদ্যুৎ আংশিক সমাধান দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। উচ্চ ঋণসুদও বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণের ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা দীর্ঘমেয়াদে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
অ্যামচ্যাম সভাপতি
প্রস্তাবিত বাজেট অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার একটি ইতিবাচক প্রচেষ্টা হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। এমনটিই মনে করেন আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচ্যাম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ। তিনি বলেন, বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা প্রশংসনীয়। তবে রাজস্ব আহরণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি খাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অ্যামচ্যাম সভাপতির মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক বার্তা দেয়। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না, সেবার মান ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, জিডিপির ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ সমপরিমাণ বাজেট ঘাটতি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এতে ঋণের ব্যয় বাড়বে এবং বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী উল্লেখ করে অ্যামচ্যাম সভাপতি বলেন, করের হার বাড়ানোর চেয়ে করের আওতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। ডিজিটাল কর ব্যবস্থা, স্বচ্ছতা এবং করদাতাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হলে রাজস্ব আদায় স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সামনে এলডিসি উত্তরণের বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ সময় রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে নীতির ধারাবাহিকতা, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং কাঠামোগত সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানি খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য প্রণোদনা সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে শিল্প খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসবে না। এডিপির আকার বৃদ্ধি প্রসঙ্গে অ্যামচ্যাম সভাপতি বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্বল তদারকির কারণে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে।
বাজেটের সামগ্রিক পর্যালোচনায় তিনি বলেন, এই বাজেট অর্থনীতির জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন সঠিক বাস্তবায়ন, নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ। এসব নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আগামী বছরগুলোতে আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে।

