Logo
Logo
×

সুস্থ থাকুন

কিডনি রোগ প্রতিরোধে যা প্রয়োজন

Icon

ড. মো. আবু জাফর সাদেক

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কিডনি রোগ প্রতিরোধে যা প্রয়োজন

কিডনি রোগ প্রতিরোধে যা প্রয়োজন। ফাইল ছবি

বিশ্বে প্রতি ১০ জনে অন্তত ১ জন কিডনি রোগে আক্রান্ত এবং মানুষের মৃত্যুর প্রথম ১০টি কারণের একটি হলো এই কিডনি সমস্যা।

* প্রারম্ভিক শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ

প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে কিডনি রোগ শনাক্তকরণ করে তার যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হলে রোগসংক্রান্ত জটিলতা বা অকাল মৃত্যু হ্রাস করা সম্ভব যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। এ ক্ষেত্রে থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা ও প্রাথমিক স্ক্রিনিং কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে, কারণ কিডনি রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ তুলনামূলকভাবে সহজ ও স্বল্পব্যয়ী।

* ব্যয়বহুল চিকিৎসার চাপ কমানো

সারা পৃথিবীতেই ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং তা সবার পক্ষে গ্রহণ করার সুযোগ সীমিত। তাই একবার কিডনি রোগ নির্ণয় হলে পর্যাপ্ত ও যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করার মাধ্যমে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। এতে করে ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা কমে আসবে। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে যেন রোগীরা ওষুধ সেবন বন্ধ করতে বাধ্য না হন, সে লক্ষ্যে সরকারি বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে এ ধরনের ওষুধের ওপর আরোপিত ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) হ্রাস বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

* কিডনি স্বাস্থ্যসেবায় সমতা

কিডনি স্বাস্থ্যসেবায় সমতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান কিডনি রোগের চিকিৎসা সুবিধা মূলত নগরকেন্দ্রিক হওয়ায় তা গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের রোগীদের জন্য বৈষম্যমূলক। তাই সব পর্যায়ের রোগীকে সমানভাবে সেবা নিশ্চিত করতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কিডনি চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।

* অসংক্রামক রোগের ব্যবস্থাপনা

খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক পরিশ্রমহীন জীবনধারার কারণে অসংক্রামক রোগ যেমন : উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং স্থূলতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে কিডনি রোগের জন্য দায়ী হতে পারে। তাই অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কিডনি রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, যাদের উচ্চরক্তচাপ বা ডায়াবেটিস আছে তাদের দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ হওয়ার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের চেয়ে ২ থেকে ৩ গুণ বেশি।

* টেকসই ও পরিবেশবান্ধব চিকিৎসা

অনেক দেশে ডায়ালাইসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন কর্মসূচি মোট স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের ২-৩ শতাংশ খরচ করে অথচ তারা জনসংখ্যার ০.১ শতাংশেরও কম মানুষকে সেবা দেয়। এমন বাস্তবতায় এরকমের কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে কিনা তা গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।

উন্নয়নশীল দেশের সরকারের পক্ষে এককভাবে এ ধরনের ব্যয় বহন অনেকটাই অসম্ভব। ব্যক্তি পর্যায়েও দীর্ঘমেয়াদে ডায়ালাইসিসের খরচ চালানও অনেকের পক্ষেই দুঃসাধ্য। এক্ষেত্রে সরকার-রোগীসহ সব পক্ষের অংশগ্রহণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।

হেমোডায়ালাইসিসের মতো চিকিৎসা পদ্ধতিতে পানি ও বিদ্যুতের ব্যাপক ব্যবহার হয়, এতদসঙ্গে কার্বন নিঃসরণ তো আছেই। একজন রোগীর একবারের হেমোডায়ালাইসিসে ৪০০ থেকে ৬০০ লিটার পানি ব্যবহার হয়। পাশাপাশি এ প্রক্রিয়ায় নিঃসৃত কার্বনের পরিমাণ একটি তেলের গাড়ি ২৪০ কিলোমিটার চলার সময় নিঃসৃত কার্বনের সমান (আনুমানিক ৩০ কেজি কার্বন-ডাই অক্সাইড-এর সমতুল্য)। মনে রাখা প্রয়োজন, কার্বণ নিঃসরণ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী এবং এটি পরোক্ষভাবে ডিহাইড্রেশন সৃষ্টি করে কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ, এক বছর ধরে সপ্তাহে তিন দিন ডায়ালাইসিস নিলে প্রায় এক টন মেডিকেল বর্জ্য তৈরি হয় (প্রতি সেশনে আনুমানিক ২-২.৫ কেজি মেডিকেল বর্জ্য) যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই প্রচলিত চিকিৎসার পাশাপাশি কিডনি রোগীর স্বার্থেই পরিবেশবান্ধব বিকল্প চিকিৎসা খোঁজা জরুরি।

* কর্মক্ষম জনশক্তি রক্ষা

সুস্থ কিডনি মানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। এটি শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্যকে নিশ্চিত করে না বরং জাতীয় উৎপাদনশীলতাও বৃদ্ধি পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ ও নির্ভরতা কমায়। সুস্থ কিডনি অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, যা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, কিডনি রোগ প্রতিরোধে প্রারম্ভিক শনাক্তকরণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব চিকিৎসা ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কিডনি স্বাস্থ্যকে মূলধারায় নিয়ে আসা সম্ভব এবং এটি সমগ্র সমাজ ও দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক।

লেখক : ফার্মাসিস্ট, বিশ্ব ব্যাংকের সাবেক পরামর্শক, উপ-মহাব্যবস্থাপক, ইউনিমেড ইউনিহেলথ ফার্মাসিউটিক্যালস।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম