থাইরয়েড ও পুষ্টি : সঠিক খাদ্যাভ্যাসে সুস্থ থাকুন
ডা. শাহজাদা সেলিম
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
থাইরয়েড গ্রন্থি আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। গলার সামনে অবস্থিত এ ছোট প্রজাপতি আকৃতির গ্রন্থি থাইরয়েড হরমোন (T3 ও T4) তৈরি করে যা শরীরের মেটাবলিজম, ওজন, হার্ট রেট, শরীরের তাপমাত্রা এবং মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে। হাইপোথাইরয়েডিজম (থাইরয়েড কম কাজ করা) এবং হাইপারথাইরয়েডিজম (থাইরয়েড বেশি কাজ করা) দুটিই পুষ্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। সঠিক পুষ্টি থাইরয়েডের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে।
* থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান
▶ আয়োডিন : থাইরয়েড হরমোন তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আয়োডিন। আয়োডিনের অভাবে গলগণ্ড ও হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে। এজন্য
আয়োডিনযুক্ত লবণ, সমুদ্রের মাছ (চিংড়ি, ইলিশ), ডিম, দুধ, দই খাবেন। অন্যদিকে অতিরিক্ত আয়োডিনও ক্ষতিকর।
▶ সেলেনিয়াম : থাইরয়েড হরমোনের রূপান্তরে (T4 থেকে T3) সেলেনিয়াম অত্যন্ত জরুরি। এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে গ্রন্থিকে রক্ষা করে। এজন্য নাটস (২-৩টি দিনে), মাছ, মুরগির মাংস, ডিম, সূর্যমুখী বীজ খাবেন।
▶ জিঙ্ক (Zinc) : ইমিউনিটি ও হরমোন উৎপাদনে সাহায্য করে। কুমড়ার বীজ, ছোলা, মাংস, ডালে জিঙ্ক পাওয়া যায়।
▶ ভিটামিন ডি ও আয়রন : ভিটামিন ডি-এর অভাব থাইরয়েড অটোইমিউন রোগ (হ্যাশিমোটো) বাড়ায়। আয়রনের অভাব হলে হরমোন তৈরি কমে। আয়রনের উৎস হলো সূর্যের আলো, দুধ, মাছ (ভিটামিন ডি), পালংশাক, ডাল, লাল মাংস (আয়রন)।
* হাইপোথাইরয়েডিজমে কী খাবেন
হাইপোথাইরয়েডিজমে ওজন বাড়ে, ক্লান্তি লাগে, চুল পড়ে এবং ঠান্ডা লাগে।
▶ খাওয়া উচিত : শাকসবজি (পালং, ব্রকোলি), ফল (আম, কলা, বেরি), আস্ত শস্য (বাদামি চাল, ওটস), প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার।
▶ সীমিত করুন : গোইট্রোজেনিক খাবার (বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকোলি কাঁচা অবস্থায়) রান্না করে খেলে সমস্যা কম।
▶ প্রতিদিন আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করুন।
* হাইপারথাইরয়েডিজমে কী খাবেন
হাইপারথাইরয়েডিজমে ওজন কমে, হার্টের গতি বাড়ে এবং অস্থিরতা দেখা দেয়।
▶ খাওয়া উচিত : প্রচুর ক্যালরিযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার (দুধ, দই, ছোট মাছ)।
▶ এড়িয়ে চলুন : অতিরিক্ত আয়োডিনযুক্ত খাবার (সমুদ্রের শৈবাল, অতিরিক্ত আয়োডিন লবণ)।
* সাধারণ খাদ্যাভ্যাস টিপস
▶ প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্টফুড, অতিরিক্ত চিনি ও ট্রান্স ফ্যাট এড়িয়ে চলুন।
▶ গ্লুটেন ও দুগ্ধজাত খাবার কিছু রোগীকে সমস্যা করে (বিশেষ করে অটোইমিউন থাইরয়েডে)।
▶ প্রতিদিন ২-৩ লিটার পানি পান করুন।
▶ সেলেনিয়াম ও জিঙ্কসমৃদ্ধ নাটস ও বীজ নিয়মিত খান।
▶ ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
* সতর্কতা
থাইরয়েডের সমস্যায় শুধু খাদ্যাভ্যাসে ভরসা করবেন না। নিয়মিত TSH, FT4, FT3 টেস্ট করান। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো সাপ্লিমেন্ট খাবেন না। অনেকের ক্ষেত্রে লেভোথাইরক্সিন জীবনভর খেতে হয়।
বাংলাদেশে থাইরয়েড সচেতনতা বাড়ছে। সরকারি হাসপাতাল ও ডায়াবেটিক হাসপাতালে নিয়মিত চেকআপ করান। সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম ও সময়মতো চিকিৎসা নিলে থাইরয়েডের সমস্যা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
