ঈদের নাটকের পোস্টমর্টেম
গল্পে ভিন্নতা থাকলেও সাফল্য হাতেগোনা
প্রতিবারের মতো এবারের ঈদেও টিভি ও ইউটিউবে প্রচার হয়ে ৫ শতাধিক নাটক। তবে দিনদিন নাটকের সংখ্যা এবং প্রচার মাধ্যম বাড়লেও বেশির ভাগই পুরোনো মোড়কেই বন্দি থেকেছে। গল্প, জুটিতে ভিন্নতা দেখা গেলেও পরিচিত কয়েকজন তারকার হাতেগোনা কিছু কাজ আলোচনার জন্ম দেয়। দু-চারজন তারকার ভাগ্যে জুটেছে ভূয়সী প্রসংশা। ঈদের নাটকের বিস্তারিত থাকছে এ প্রতিবেদনে।
এ এম রুবেল
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঈদ উৎসবে বাড়তি বিনোদন দিতে নির্মাতা-তারকাদের কাজের ব্যস্ততা এবারও ছিল লক্ষণীয়। বেশ কয়েকজন অভিনেতা-অভিনেত্রী দুই ডজনের বেশি নাটক নিয়ে হাজির হন। এক ডজনের কাতারে থাকা তারকার সংখ্যাও ছিল চোখে পড়ার মতো। ঈদের আগে নানা ধরনের গল্পে কাজের সুযোগ এবং চরিত্রের ভিন্নতা নিয়ে অনেকেই ছিলেন আলোচনায়। তবে নাটকগুলো প্রচারের পর বেশির ভাগই দর্শকমনে জায়গা করতে পারেনি। গত রোজার ঈদে সবচেয়ে সফল জুটির তালিকায় শীর্ষে ছিলেন অভিনেতা নিলয় আলমগীর ও জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি। তাদের বেশ কয়েকটি নাটক এবং অভিনয় প্রশংসা কুড়িয়েছিল। তবে এবারের ঈদে সে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছেন তারা। একসঙ্গে অভিনয় ছাড়াও একাধিক অভিনেতা-অভিনেত্রীর সঙ্গে জুটি বাঁধেন নিলয়-হিমি। কিন্তু প্রশংসা কুড়াতে পারেনি কোনো নাটক। তবে গতকাল মঙ্গলবার বেলা ২টা পর্যন্ত নিলয়-হিমির ‘বউ না বিপদ’ ৫.২ মিলিয়ন, ‘মীমাংসা’ ৪ মিলিয়ন, ফারহান-হিমির ‘ছোট ছেলে’ ৪.৫ মিলিয়ন, মোশাররফ-হিমির ‘চমকের শহর’ ৩.৯ মিলিয়ন, নিলয়-মাহীর ‘হঠাৎ কোটিপতি’ ৬.৭ মিলিয়ন, নিলয়-শশীর ‘ভাবী’ ৭.৩ মিলিয়ন, নিলয়-তাসনুভা তিশার ‘ডাবল প্রেশার’ ৩ মিলিয়ন ও নিলয়-আইশা খানের ‘এক পশলা বৃষ্টি’ ২.৯ মিলিয়ন ভিউ অর্জন করে ইউটিউব দৌড়ে কিছুটা অবস্থান ধরে রেখেছে।
নিলয়-হিমির মতো একই পথে হেঁটেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম। একসময় এ অভিনেতার অভিনয় মানেই দর্শকের কাছে অন্যরকম এক মুগ্ধতার নাম থাকলেও এবার নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি তিনি। ঈদে তার দুই ডজনের বেশি নাটক প্রচার হলেও অভিনেত্রীর নিলার সঙ্গে জুটি বেঁধে করা ‘বউয়ের মামলা’ গতকাল মঙ্গলবার বেলা ২টা পর্যন্ত ৪ মিলিয়ন ও ‘খাদক তোরাব আলী’ ৪ মিলিয়ন ভিউ পাওয়া ছাড়া তেমন অর্জন নেই। মোশাররফ অভিনীত বেশির ভাগ নাটকের গল্পে সংসার এবং শ্বশুরবাড়ির ঝামেলা উঠে আসে। এমনকি সেগুলোতে তার অভিনয় নিয়েও নেতিবাচক মন্তব্য করেন দর্শকরা। সব মিলিয়ে মোশাররফ ছিলেন অনেকটাই নিষ্প্রভ।
শীর্ষ অনেক তারকার নাটকে দর্শক প্রাণ খুঁজে না পেলেও এবার একাধিক নাটক নিয়ে প্রশংসায় ভেসেছেন অপূর্ব, কেয়া পায়েল, নিহা, ফারহান, জোভান, তৌসিফ, সাফা, তটিনীরা। অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব ও ফারহান আহমেদ জোভান নিয়মিতই বিভিন্ন অভিনেত্রীর সঙ্গে কাজ করছেন। তবে জোভানের সঙ্গে তানজিম সাইয়ারা তটিনীর রসায়ন কয়েক বছর ধরে বেশ আলোচনায় রয়েছে। একই কথা বলা যায় অপূর্বর সঙ্গে নাজনীন নাহার নিহার বিষয়েও। তারা জুটি বেঁধে কাজ করেছেন একাধিক নাটকে। দর্শক সেগুলো পছন্দও করছেন। এবারের ঈদেও তারা সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন।
ঈদ উপলক্ষ্যে রুবেল হাসান পরিচালিত ‘তোর মায়ায়’ নাটকে জুটি বেঁধে দর্শকের সামনে হাজির হন জোভান ও তটিনী। এটি ইউটিউবে প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই দর্শকের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় ভাসেন তারা। বিশেষ করে জোভান ও তটিনীর সাবলীল অভিনয়, আবেগ প্রকাশ এবং পর্দার রসায়ন দর্শকদের মন জয় করেছে। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ২টা পর্যন্ত নাটকটি ১০ মিলিয়ন দর্শক দেখে ফেলেন। নাটকটি দেখার পর অনেক দর্শকই মন্তব্য করেছেন, এ জুটি এখন ধারাবাহিকভাবে ভালো কাজ উপহার দিচ্ছেন। কারও মতে, জোভান-তটিনীর উপস্থিতি নাটকটিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। অনেকেই লিখেছেন, নাটকের শেষ দৃশ্য তাদের আবেগাপ্লুত করেছে এবং গল্পের গভীরতা নাড়া দিয়েছে। অনেকে আবার তাদের সেরা জুটির তকমাও দিয়ে ফেলেছেন। অন্যদিকে এ জুটি গত রোজার ঈদে নির্মাতা মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের ‘তোমাদের গল্প’ নাটকে অভিনয় করে দারুণ প্রশংসা পান। সেই ধারাবাহিকতা এ ঈদে ‘তোমাদের গল্প ২’ প্রচারের পরও ধরে রাখতে পেরেছেন তারা। প্রথম পর্বের মতোই আলোচনা, প্রশংসা এবং ইউটিউব ভিউয়ে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে নাটকটি। এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত (মঙ্গলবার বেলা ২টা) ১৩ মিলিয়ন দর্শক দেখে ফেলেছে নাটকটি। পাশাপাশি মন্তব্যের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১৫ হাজার। এর মধ্যে অধিকাংশই ইতিবাচক মন্তব্য। অনেকে আবার নাটকটির তৃতীয় কিস্তির আবদারও তুলছেন।
এবারের ঈদে বিশেষ চমক দিয়েছেন অভিনেতা অপূর্ব। নিজের লেখা গল্পে তিনি জুটি বাঁধেন অভিনেত্রী নিহার সঙ্গে। তানিম রহমান অংশু নির্মিত ‘অচেনা আমি’ শিরোনামের এ নাটকটি প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকরা লুফে নেয়। চিরাচরিত প্রেমের গল্পের পাশাপাশি এতে মানুষের জীবনের গভীর উপলব্ধি এবং প্রিয়জনকে হারিয়ে আবার খুঁজে পাওয়ার এক মানবিক গল্প দর্শকমনে জায়গা করে নিতে সময় নেয়নি। গতকাল পর্যন্ত নাটকটি ৭ মিলিয়নের বেশি মানুষ দেখেছেন। শুধু দেখা আর নাটকের গল্প নিয়ে আলোচনা নয়, এতে অপূর্ব নিহার রসায়নও প্রশংসা কুড়িয়েছে সবার।
তবে ঈদে এ জুটির সবচেয়ে আলোচিত নাটক ‘মায়াপাখি’। নির্মাতা জাকারিয়া সৌখিনের এ নাটকটি ইউটিউবে গতকাল মঙ্গলবার বেলা ২টা পর্যন্ত ১১ মিলিয়ন দর্শক লুফে নেয়। মন্তব্যের সংখ্যাও ছাড়িয়েছে ২০ হাজার। গতানুগতিক রোমান্টিক ধারার বাইরে গিয়ে সমসাময়িক করপোরেট জীবনের এক অন্ধকার বাস্তবতাকে মনস্তাত্ত্বিক ক্রাইম-থ্রিলারের আবহে পর্দায় আনেন নির্মাতা। অভিনয়ের দিক থেকে ‘সাদাত’ চরিত্রে অপূর্ব আরও একবার প্রমাণ করেছেন, কেন তিনি এ সময়ের অন্যতম শক্তিশালী ও দর্শকের প্রিয় অভিনেতা। নাটকটি দেখার পর এমনটাই মন্তব্য করেছেন অনেকে। অন্যদিকে তরুণ অভিনেত্রী নাজনীন নাহার নিহাও এ নাটকে নিজের অভিনয়ের পরিপক্বতার স্বাক্ষর রেখেছেন বলে মনে করছেন অনেকে।
এর বাইরে সবচেয়ে বেশি কাজে সফলতার মুখ দেখেছেন অভিনেত্রী কেয়া পায়েল। ঈদে প্রায় ডজনখানেক নাটকে ভিন্ন ভিন্নরূপে হাজির হন তিনি। সেই তালিকার বেশ কয়েকটি নাটক প্রশংসা কুড়ানোর পাশাপাশি ইউটিউব ভিউয়ের দৌড়েও জায়গা করে নিয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে তার ‘ডুব’ (৭ মিলিয়ন ভিউ)। নাটকটিতে তিনি অভিনেতা মুশফিক আর ফারহানের সঙ্গে তার রসায়ন বেশ উপভোগ করেন দর্শকরা। শুধু তাই নয়, এ দুই তারকার অভিনয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন অনেকেই। তবে এ নাটকটি ছাড়াও এই জুটির ‘ছুঁয়ে দে আমায়’ ৩ মিলিয়ন ও ‘বুকের ভেতর আগুন’ ৩ মিলিয়ন ভিউয়ের পাশাপাশি আলোচনায় জায়গা করে নেয়।
অন্যদিকে প্রতি ঈদে খায়রুল বাশার, তৌসিফ, সাফা, ইয়াস রোহানের একাধিক কাজ প্রশংসা কুড়ালেও এবারে সেই তালিকা ছিল একেবারে না বলার মতো। এবার তৌসিফ, সাফা ও রোহানের জুটি বেঁধে করা ‘ওয়ারিশ’ ছাড়া অন্য কোনো কাজ তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। এ নাটকটি গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ৮ মিলিয়ন ভিউয়ের সঙ্গে নেটদুনিয়ায় আলোচনার খোরাক জোগায়। একই অবস্থা অভিনেতা খায়রুল বাশারের বেলাতেও লক্ষ করা গেছে। এই অভিনেতা ঈদে ‘বনলতা সেন’ সিনেমা নিয়ে বেশ আলোচনায় থাকলেও নাটকে ছিলেন চর্চার বাইরে। প্রায় একডজন নাটকে তার দেখা মিললেও কেয়া পায়েলের সঙ্গে অভিনীত ‘নোটবুক’ নাটকটি গতকাল পর্যন্ত ৫.৮ মিলিয়ন ভিউ নিজের করে নিয়েছে।
গত রোজার ঈদে পারিবারিক গল্পের জয়জয়কার লক্ষ করা গেলেও এবারের ঈদে নানা ধরনের কাজই দর্শকরা দেখেছেন। তবে সেই সংখ্য খুবই কম। যা নিয়ে নাট্যসংশ্লিষ্টরা শঙ্কা প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন পর নাটক আশার আলো দেখালেও হঠাৎ এমন ছন্দপতন ইন্ডাস্ট্রির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে না।
