Logo
Logo
×

প্রথম পাতা

সাক্ষাৎকার: বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম

বিনিয়োগকে প্রাধান্য দিয়ে নীতি গ্রহণ জরুরি

সাদ্দাম হোসেন ইমরান

সাদ্দাম হোসেন ইমরান

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিনিয়োগকে প্রাধান্য দিয়ে নীতি গ্রহণ জরুরি

মোহাম্মদ হাতেম। সংগৃহীত ছবি

জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চসুদ এবং ব্যবসাবান্ধব নয় এমন রাজস্ব কাঠামো-বর্তমানে এই তিনটি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান অন্তরায়। আগামী বাজেটে এসব বিষয়ে সরকারের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তা না হলে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার সম্ভব নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। যুগান্তরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার সাদ্দাম হোসেন ইমরান।

যুগান্তর : নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ১১ জুন। এই বাজেটে আপনার প্রত্যাশা কী?

মোহাম্মদ হাতেম : নতুন সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। তাই বাজেটে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অতীতে বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল তখন অর্থনীতি ভালো ছিল এবং ব্যবসা-বাণিজ্যবান্ধব বাজেট হয়েছে। আগামী বাজেটও বিনিয়োগ এবং ব্যবসাবান্ধব হবে বলে আশা করছি।

যুগান্তর : বাজেটের সম্ভাব্য আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটা কতটুকু যৌক্তিক?

মোহাম্মদ হাতেম : বাজেটের আকার একটু বেশিই বড় হচ্ছে বলে মনে হয়। এত বড় বাজেট না দিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট দিলে সেটা দেশ ও অর্থনীতির জন্য ভালো হবে। তবে বড় বাজেটে সুবিধা-অসুবিধা দুটোই আছে। অনেক মানুষকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা যায়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া যায়। আর অসুবিধা হচ্ছে, বাজেট বাস্তবায়ন করতে না পারলে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। যেটা আমরা অতীতেও দেখেছি। সেই ভারসাম্যহীনতার ফল এখন ভোগ করছে দেশের মানুষ।

যুগান্তর : রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যে কোনো প্রভাব ফেলবে কী?

মোহাম্মদ হাতেম : বাজেটের আকার অনুযায়ী অঙ্কের হিসাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা হয়তো ঠিকই আছে। এটা কতটুকু অর্জনযোগ্য সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে এত বিশাল লক্ষ্যমাত্রার কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হবেন, এটা নিশ্চিত। কারণ অতীতে দেখা গেছে, লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও এনবিআর করজাল বাড়াতে পারেনি। তাই যারা ট্যাক্স দেয়, এনবিআর শুধু তাদের ওপরে আরও বোঝা চাপিয়েছে। ব্যবসা হোক বা না হোক, এনবিআরের লোকজন ট্যাক্স নিতে হাজির হয়ে যায়। উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার কারণে রাজস্ব ব্যবস্থা যেখানে ব্যবসাবান্ধব হওয়ার কথা, সেখানে এনবিআর শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এই মানসিকতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের আগে এনবিআরের সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

যুগান্তর : এবারও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব থাকছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হবে কিনা?

মোহাম্মদ হাতেম : সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে খুব বেশি সমস্যা হবে না। কারণ উচ্চসুদের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা নেই বললেই চলে। ১৫-১৬ শতাংশ সুদ দিয়ে কোনো ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। পৃথিবীর কোথাও ঋণের এত উচ্চসুদ আছে কিনা তা জানা নেই। এই মুহূর্তে যারা ঋণ নেবে তারা টাকা ফেরত দিতে পারবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া নিরাপদ ভেবে ব্যাংকগুলোও বেসরকারি খাতের চেয়ে সরকারি খাতে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী। এতে তাদের অপারেশনাল খরচ নেই, ঝুঁকিও কম। যেটা এই মুহূর্তে ব্যবসায়ীদের দিলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপদ হবে না। তাই আসন্ন বাজেটে বা সামনের সময়ে সরকার যদি ঋণের সুদ কমানোর কোনো মেকানিজম দিতে না পারে তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগ আর হবে না। যেসব ব্যবসা চলমান আছে, সেগুলো হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে।

যুগান্তর : বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান বাড়াতে বাজেটে কী পদক্ষেপ থাকা উচিত?

মোহাম্মদ হাতেম : জ্বালানির অপ্রতুলতা ও ব্যাংক ঋণের উচ্চসুদ-এ দুটো বর্তমানে নতুন বিনিয়োগের প্রধান বাধা। বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান হবে না, এটাই স্বাভাবিক। তাই বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সরকারকে অবশ্যই এই দুই দিকে খেয়াল করতে হবে। এজন্য সরকার ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনার নির্দেশ দিতে পারে। বিনিয়োগভেদে ঋণের সুদহার নির্ধারণ করে দিতে পারে। যে কোনো উপায়েই হোক ঋণের সুদহার কমাতেই হবে। অন্যদিকে জ্বালানি আরেকটি ইস্যু। সম্প্রতি ঢাকার আশপাশের এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে। এতে উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে। উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটলে খরচও বেড়ে যায়।

যুগান্তর : রাজস্ব খাতে প্রত্যাশা কী?

মোহাম্মদ হাতেম : রাজস্ব বিষয়ে দুটি দাবি। প্রথমত, বর্তমানে যে রাজস্ব ব্যবস্থা আছে, সেটা পুরোটাই ব্যবসা ও বিনিয়োগপরিপন্থি। একটা অনৈতিক ও বেআইনি ট্যাক্সেশন সিস্টেম চলছে দেশে। এটাকে ঢেলে সাজানোর বিকল্প নেই। রাজস্বব্যবস্থাকে অবশ্যই বাস্তবমুখী করতে হবে। আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস সংক্রান্ত যেসব আইন-কানুন আছে, সেগুলোকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজস্ব বোর্ডের ‘ম্যাসিভ’ সংস্কার দরকার। প্রতিবছর বাজেট এলে এনবিআরের ওপর একটা লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে দেওয়া হয়। আর এনবিআর সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে যারা ট্যাক্স দেয়, তাদের চেপে ধরে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাই এনবিআরকে গ্রাম-উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। করজাল বাড়াতে হলে এনবিআরকে লজিস্টিক সহায়তা দিতে হবে। নীতি বিভাগ ও ব্যবস্থাপনা বিভাগকে পৃথক করার মাধ্যমে নীতির স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম