Logo
Logo
×

ইসলাম ও জীবন

মনে মনে সালামের জবাব দিলে কি ওয়াজিব আদায় হবে?

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম

মনে মনে সালামের জবাব দিলে কি ওয়াজিব আদায় হবে?

মনে মনে ও লিখিত সালামের জবাবের বিধান। ছবি: সংগৃহীত

সালাম ইসলামের অন্যতম সুন্দর নিদর্শন এবং মুসলিম সমাজে ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের প্রতীক। একজন মুসলিম অন্য মুসলিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে শান্তি ও নিরাপত্তার দোয়া করেন। এটি শুধু একটি সম্ভাষণ নয়; বরং একটি ইবাদত এবং পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

ইসলামে সালাম দেওয়া সুন্নত হলেও এর উত্তর দেওয়া ওয়াজিব। কিন্তু অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—সালামের জবাব কি মুখে উচ্চারণ করতেই হবে, নাকি মনে মনে উত্তর দিলেও দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে? কুরআন ও হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে রয়েছে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।

কুরআনের নির্দেশনা: সালামের জবাব দেওয়া আবশ্যক

সালামের উত্তর দেওয়া ওয়াজিব। একই সঙ্গে উত্তমভাবে বা বাড়িয়ে জবাব দেওয়া অধিক ফজিলতের কাজ। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ حَسِيبًا

‘আর যখন তোমাদের অভিবাদন জানানো হয়, তখন তোমরাও তার চেয়ে উত্তম অভিবাদন জানাও অথবা অনুরূপ জবাব দাও। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুর হিসাব গ্রহণকারী।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৮৬)

এই আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, সালামের উত্তর উত্তমভাবে বা বাড়িয়ে জবাব দেওয়া অধিক ফজিলতের কাজ। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি বলে—

‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ’

তাহলে উত্তরে বলা উত্তম—

‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু’

এতে কুরআনের নির্দেশিত ‘উত্তম জবাব’ দেওয়ার আমল সম্পন্ন হয়।

মনে মনে সালামের জবাব দিলে কী হবে?

ফকিহদের আলোচনায় উল্লেখ রয়েছে, সালামের উত্তর এমনভাবে দেওয়া উত্তম, যাতে সালামদাতা তা শুনতে পারেন। কারণ সালামের উদ্দেশ্য কেবল দায়িত্ব পালন নয়; বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, দোয়া ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করা।

তবে কেউ যদি কোনো কারণে মনে মনে সালামের উত্তর দেয়, তাহলে ওয়াজিবের দায়মুক্তি হওয়ার মতামত কিছু আলেম উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এতে সালামের প্রকাশ্য জবাব দেওয়ার সুন্নত আদব ও পূর্ণ ফজিলত অর্জিত হয় না। তাই সুযোগ থাকলে মুখে উচ্চারণ করে সালামের উত্তর দেওয়াই উত্তম ও পরিপূর্ণ আমল।

সালামের জবাবে বেশি সওয়াব কীভাবে?

রাসুলুল্লাহ (সা.) সালামের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন—

أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ

‘তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের ব্যাপক প্রচলন করো।’ (মুসলিম ৫৪)

সালামের প্রচলন মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বৃদ্ধি করে এবং মুসলিম সমাজে ঐক্য ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠা করে।

অমুসলিম সালাম দিলে কী জবাব দেবেন?

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِذَا سَلَّمَ عَلَيْكُمْ أَهْلُ الْكِتَابِ فَقُولُوا وَعَلَيْكُمْ

‘যখন আহলে কিতাব (ইহুদি-খ্রিস্টান) তোমাদের সালাম দেয়, তখন তোমরা বলবে— ‘ওয়া আলাইকুম’ (তোমাদের ওপরও)।’ (বুখারি ৬২৫৮, মুসলিম ২১৬৩)

অতএব অমুসলিমের সালামের উত্তরে পূর্ণ ইসলামী সালাম না বলে ‘ওয়া আলাইকুম’ বলাই সুন্নাহসম্মত।

লিখিত সালামের জবাবের বিধান

বর্তমান যুগে মেসেজ, ই-মেইল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সালাম আদান-প্রদান একটি সাধারণ বিষয়। লিখিত সালাম পেলে তার জবাব দেওয়াও প্রয়োজন। জবাব লিখেও দেওয়া যেতে পারে, আবার মুখে উচ্চারণ করেও দেওয়া যেতে পারে। উভয় ক্ষেত্রেই সালামের হক আদায় হয়ে যায়।

যেসব অবস্থায় সালামের জবাব দেওয়া হয় না

ইসলামে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে সালামের জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা রয়েছে। যেমন—

১. টয়লেট বা বাথরুমে অবস্থানকালে

এ অবস্থায় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা বা সালামের উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত।

২. জুমার খুতবা চলাকালে

খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা ওয়াজিব। তাই এ সময় সালামের জবাব দেওয়া বা কথাবার্তা বলা অনুচিত।

৩. নামাজ আদায়রত অবস্থায়

নামাজের মধ্যে সালামের জবাব মুখে দেওয়া বৈধ নয়। কারণ নামাজে অন্য কোনো কথা বলার অনুমতি নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

إِنَّ فِي الصَّلَاةِ لَشُغْلًا

‘নামাজের মধ্যে মানুষ এমন কাজে ব্যস্ত থাকে, যা তাকে অন্য কথা থেকে বিরত রাখে।’ (বুখারি ১১৯৯, মুসলিম ৫৩৮)

সালাম ইসলামের এক অনন্য সৌন্দর্য, যা মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে। তাই সালামকে শুধু সামাজিক রীতি হিসেবে নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। সালামের উত্তর দেওয়া ওয়াজিব এবং তা মুখে উচ্চারণ করে সুন্দরভাবে দেওয়া সর্বোত্তম পন্থা। মনে মনে উত্তর দিলে দায়মুক্তির কিছু আলোচনা থাকলেও সুন্নাহর পূর্ণ আদব ও ফজিলত অর্জনের জন্য প্রকাশ্যে জবাব দেওয়াই উত্তম। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সালামের সংস্কৃতি জীবন্ত রাখার এবং এর আদবসমূহ যথাযথভাবে পালনের তৌফিক দান করুন। আমিন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম