ইসরাইল ও ভারতে নিরাপদে নেই সাধারণ মানুষ
সোমদীপ সেন
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সম্প্রতি ইসরাইল সফর করেছেন নরেন্দ্র মোদি। সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বুধবার ইসরাইলের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে ‘এয়ার ইন্ডিয়া ওয়ান’ থেকে নামার পর নরেন্দ্র মোদি এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যেভাবে একে অপরকে উষ্ণ আলিঙ্গন করলেন, তা দুই নেতার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। মোদির এই দুই দিনের সফরে বেশকিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা ভারত ও ইসরাইলের গভীরতর অংশীদারত্বকে আরও মজবুত করবে।
মোদি দীর্ঘদিন ধরেই এই ঘনিষ্ঠতার মূল চালিকাশক্তি। ২০১৭ সালে তার ইসরাইল সফর ছিল কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর, যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক বড় পরিবর্তনকে চিহ্নিত করেছিল। বুধবার একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্টে তিনি এই সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেন। পরবর্তী সময়ে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে তাকে দাঁড়িয়ে সম্মান জানানো হয়, যেখানে নেতানিয়াহু ঘোষণা করেন, ‘এটি দুই নেতা, দুই দেশ এবং দুই প্রাচীন জাতির মধ্যে এক অকৃত্রিম বন্ধুত্ব।’ অবশ্য এই বন্ধুত্ব কেবল চুক্তি বা সমঝোতার ওপর ভিত্তি করে টিকে নেই। বিমানবন্দরে মোদিকে স্বাগত জানানোর সময় নেতানিয়াহুর স্ত্রী সারা নেতানিয়াহু গেরুয়া রঙের পোশাক পরেছিলেন, যা হিন্দুত্বের প্রতীক। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী রসিকতা করে বলেন, তার স্ত্রীর পোশাকের রঙের সঙ্গে মোদির পকেটে থাকা গেরুয়া রুমালের মিল রয়েছে।
হিন্দুত্বের এই বিশেষ রঙের প্রাধান্য এড়িয়ে যাওয়া কঠিন ছিল। এটি মোদির রাজনীতির অন্তর্নিহিত আদর্শিক কাঠামোর প্রতি ইসরাইলের একটি স্পষ্ট সমর্থন এবং স্বস্তির ইঙ্গিত দেয়। নেতানিয়াহু ও মোদির এই আদর্শিক অংশীদারত্ব একটি বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে-তা হলো, তারা দুজনেই তথাকথিত ‘ইসলাম ও ইসলামপন্থা’র বিরুদ্ধে একটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ঢাল হিসাবে দাঁড়িয়ে আছেন। নেতানিয়াহুর ইসরাইল যেমন সব ইহুদির স্বর্গরাজ্য হওয়ার কথা, মোদির ভারত তেমনি হিন্দুদের নিরাপদ রাখার কথা বলে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইসরাইল ও ভারতে আসলে কার নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে?
গাজায় চলমান গণহত্যা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও ফিলিস্তিনি ভূমি দখল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পবিত্র ভূমিতে ফিলিস্তিনিরা কখনোই নিরাপদ নয়। ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তারা প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভাষায়, তারা ইসরাইলের ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’।
তবে ইসরাইলের সব ইহুদি নাগরিকও কিন্তু ‘নিরাপদ’ নন। মিজরাহি ইহুদিদের (মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা থেকে আসা ইহুদি) বিরুদ্ধে বর্ণবৈষম্য ইসরাইল রাষ্ট্রের পত্তন থেকেই এক দাপ্তরিক নীতি হিসাবে চলে আসছে।
সংশোধনবাদী জায়নবাদের প্রতিষ্ঠাতা জেভ জাবোটিনস্কির কথায় এই মিজরাহি ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা স্পষ্ট ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রাচ্য বা ওরিয়েন্টের সঙ্গে আমাদের ইহুদিদের কোনো মিল নেই, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। আমাদের অশিক্ষিত জনতা (অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদিরা) যদি কোনো প্রাচ্য ঐতিহ্য বহন করে থাকে, তবে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে আনতে হবে।’
অপ্রকাশিত সরকারি নথিতে দেখা গেছে, ইসরাইল সৃষ্টির পর মধ্যপ্রাচ্যের ইহুদি পরিবারগুলোর হাজার হাজার শিশুকে হাসপাতাল থেকে চুরি করে ধনী ইহুদি পরিবারগুলোকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইয়েমেনি পরিবারগুলো এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হিসাব অনুযায়ী, ইসরাইল রাষ্ট্রের বয়স যখন ছয় বছর, তখন প্রতি আটজন ইয়েমেনি শিশুর মধ্যে একজন নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল।
বর্ণবৈষম্য কেবল অতীতের বিষয় নয়। ইথিওপিয়ান ইহুদিদের ওপর চলা কাঠামোগত বর্ণবাদ আজও স্পষ্ট। যদিও তারা মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ, তবুও অর্ধেকের বেশি ইথিওপিয়ান ইহুদি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তাদের এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই এবং সেখানকার যুবকদের মধ্যে মাদকাসক্তি, সহিংসতা ও আত্মহত্যার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। ভারতের চিত্রটা খুব একটা আলাদা নয়। সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিরুদ্ধে আইনি, রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের কথা সবাই জানে। কিন্তু হিন্দু জাতীয়তাবাদী শাসনের অধীনে সব হিন্দু কি নিরাপদ? ভারতে জাতিভেদ প্রথা বা বর্ণবৈষম্য বর্তমান সরকারের সৃষ্টি না হলেও মোদির শাসনামলে তা আরও তীব্র হয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলিত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন বন্ধে ইউজিসি যখন কঠোর নিয়ম করতে চেয়েছিল, তখন সুপ্রিমকোর্টের চাপে তা স্থগিত হয়ে যায়। এই নিয়মগুলোর পেছনে রয়েছে দলিত শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার এক করুণ ইতিহাস। ২০১৬ সালে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের দলিত পিএইচডি ছাত্র রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। বিজেপির ছাত্র সংগঠন এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানির হস্তক্ষেপের পর তার ফেলোশিপ বন্ধ করা হয়েছিল এবং তাকে হোস্টেল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। সুইসাইড নোটে তিনি লিখেছিলেন, তার ‘জন্মই ছিল এক মারাত্মক দুর্ঘটনা’। ২০২১ সালের পিউ রিসার্চের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, অনেক ভারতীয় মনে করেন না যে দলিতদের ওপর বৈষম্য হচ্ছে। অথচ ২০২৫ সালের ইউজিসি ডাটা বলছে, জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ অনেক বেড়েছে। আজও ভারতের ৭৭ শতাংশ নর্দমা ও সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কারের কাজ দলিত সম্প্রদায়ের মানুষরাই করেন। এমনকি বিদেশে থাকা ভারতীয়দের মধ্যেও এই বর্ণবৈষম্য ছড়িয়ে পড়ছে।
নেতানিয়াহু ও মোদির এ ‘ব্রোম্যান্স’ বা ঘনিষ্ঠতার মধ্যে এই বৈষম্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার অর্থ কী? এর অর্থ এই নয় যে, বৈষম্য না থাকলে তাদের রাজনীতি গ্রহণযোগ্য হয়ে যেত। বরং এটি দেখানোর জন্য যে, তাদের গড়ে তোলা ক্ষমতা কেবল ফিলিস্তিনি বা মুসলমানদেরই লক্ষ্যবস্তু করে না, বরং যারা তাদের নির্দিষ্ট আদর্শের ছাঁচে খাপ খায় না, তাদেরও ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। সহজ কথায়, ইসরাইল ও ভারত-কোনো দেশেই আসলে সাধারণ মানুষ নিরাপদ নয়।
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তরিত
সোমদীপ সেন : লেখক ও গবেষক, সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ ইন আফ্রিকা, ইউনিভার্সিটি অব প্রিটোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা
