Logo
Logo
×

বাতায়ন

সোশ্যাল মিডিয়া, গ্রামবাংলা ও নতুন সামাজিক সংকট

ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার

ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩১ এএম

সোশ্যাল মিডিয়া, গ্রামবাংলা ও নতুন সামাজিক সংকট

বাংলাদেশে প্রযুক্তির বিস্তার নিঃসন্দেহে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার সহজলভ্যতা মানুষের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ করেছে, ঠিক তেমনি এর কিছু নেতিবাচক প্রভাবও ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বিশেষ করে গ্রামবাংলায় সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার এক ধরনের নতুন সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ, কর্মবিমুখতা, অস্থিরতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রবন্ধে আমরা এই সমস্যাগুলোর গভীর বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব এবং সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর ব্যাখ্যা তুলে ধরব।

প্রথমেই বলতে হয়, সোশ্যাল মিডিয়া নিজে কোনো সমস্যা নয়; বরং এর ব্যবহারই সমস্যার উৎস। গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা মানুষের মধ্যে নতুন ধরনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে। আগে যেখানে যুবসমাজ কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা বা শ্রমনির্ভর কাজে যুক্ত থাকত, এখন তাদের অনেকেই দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে ভাইরাল হওয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই কনটেন্টগুলোর বেশিরভাগই অর্থহীন, অশালীন কিংবা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত যুবকরা অভিনয় বা সৃজনশীলতার কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই ভিডিও তৈরি করছে। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে—দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন এবং অর্থ উপার্জন। ফলে কনটেন্টের মানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ‘ভাইরাল’ হওয়া।

সমাজতাত্ত্বিক E'mile Durkheim তার ‘Anomie’ ধারণায় দেখিয়েছিলেন, যখন সমাজে নিয়ম-কানুন দুর্বল হয়ে যায় এবং মানুষ দিকনির্দেশনা হারিয়ে ফেলে, তখন সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। বর্তমান পরিস্থিতি অনেকাংশে সেই ‘Anomie’-এর প্রতিফলন। গ্রামবাংলার যুবসমাজ যখন ঐতিহ্যগত পেশা ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়ে অনিশ্চিত এবঙ দ্রুত লাভের পথে ঝুঁকে পড়ছে, তখন তারা এক ধরনের সামাজিক শূন্যতায় ভুগছে।

অন্যদিকে Robert K. Merton তার ‘Stain Theory’-তে বলেছেন, যখন সমাজে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনের বৈধ উপায় সীমিত থাকে, তখন মানুষ অবৈধ বা বিকল্প পথে সেই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে। আমাদের গ্রামাঞ্চলে বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং সুযোগের অভাব অনেক যুবককে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দ্রুত অর্থ উপার্জনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু এই পথ সবসময় সৎ বা টেকসই নয়। এই Karl Marx-এর ‘Alienationation’ তত্ত্বও প্রাসঙ্গিক। তিনি দেখিয়েছিলেন, মানুষ যখন তার কাজের সঙ্গে মানসিকভাবে যুক্ত থাকতে পারে না, তখন সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আজকের অনেক তরুণ বাস্তব উৎপাদনমুখী কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভার্চুয়াল জগতে এক ধরনের কৃতিম পরিচয় তৈরি করছে। এতে তারা বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং সমাজের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অনেকেই আপত্তিকর ভাষা ব্যবহার করে, অশালীন আচরণ প্রদর্শন করে কিংবা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে ভিডিও তৈরি করছে। এসব কনটেন্ট খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। কারণ এগুলো মানুষের কৌতূহল বা বিনোদনের নিম্নমানের চাহিদাকে পূরণ করে। ফলে এক ধরনের ‘ডিজিটাল সংস্কৃতি’ তৈরি হচ্ছে, যা সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। এখানে George Gerbner-এর 'Cultivation Theory’ উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে মিডিয়ার নির্দিষ্ট ধরনের কনটেন্ট দেখলে মানুষের বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা বদলে যায়। অর্থাৎ যদি মানুষ নিয়মিত নিম্নমানের বা অশালীন কনটেন্ট দেখে, তাহলে সেটিকেই তারা স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে। আমাদের গ্রামবাংলায় এই প্রবণতা ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে।

গ্রামবাংলার সামাজিক কাঠামো ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারকেন্দ্রিক। এখানে পারিবারিক মূল্যবোধ, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সামাজিক নিয়ম-কানুন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার এই নতুন প্রবণতা পরিবারে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে সময় না কাটিয়ে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকে। আবার কেউ কেউ পরিবারের আপত্তি উপেক্ষা করে ভিডিও তৈরিতে লিপ্ত হয়, যা পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া কর্মবিমুখতা একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আগে যেখানে একজন যুবক কৃষিকাজ বা অন্য কোনো উৎপাদনশীল কাজে সময় দিত, এখন সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভিডিও বানানো, এডিটিং করা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় ব্যয় করছে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উৎপাদন কমে যাচ্ছে, শ্রমের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে Max Weber-এর ‘ Work Ethic’ ধারণা উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছিলেন, কঠোর পরিশ্রম এবং দায়িত্ববোধ একটি সমাজের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু যখন মানুষ সহজ পথে সফলতা অর্জনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন সেই নৈতিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্রামবাংলায় বর্তমানে এই পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এখানে প্রযুক্তির সহজলভ্যতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বর্তমানে খুব কম দামে স্মার্টফোন, ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট পাওয়া যায়। ফলে যে কেউ খুব সহজেই ভিডিও তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের সঠিক জ্ঞান বা নৈতিকতা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। ফলে তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি করছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— সামাজিক স্বীকৃতি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘লাইক’, ‘শেয়ার’ এবং ‘কমেন্ট’ এক ধরনের নতুন সামাজিক স্বীকৃতি তৈরি করেছে। অনেকেই এই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য যে কোনো ধরনের কনটেন্ট তৈরি করতে প্রস্তুত। এমনকি তারা নিজেদের মর্যাদা, পরিবার বা সমাজের সম্মানকেও তুচ্ছ মনে করছে। এটি এক ধরনের মানসিক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে মানুষ বাস্তব জীবনের সাফল্যের চেয়ে ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে Erving Goffman-এর ‘Dramaturgical Theory’ উল্লেখযোগ্য। তিনি মানুষের সামাজিক আচরণকে মঞ্চনাটকের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ এক ধরনের ‘পারফরম্যান্স’ করে, যেখানে তারা নিজেদের একটি নির্দিষ্ট রূপ উপস্থাপন করে। গ্রামবাংলার অনেক তরুণ এখন বাস্তব জীবনের চেয়ে এই ভার্চুয়াল ‘মঞ্চে’ বেশি সক্রিয়।

এ ছাড়া সামাজিক তুলনা (Social Comparison) একটি বড় ভূমিকা রাখছে। যখন একজন দেখে অন্য কেউ ভিডিও বানিয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে বা অর্থ উপার্জন করছে, তখন সেও সেই পথে হাঁটতে চায়। এতে করে এক ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যা সবসময় ইতিবাচক নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে। সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্র করে অপরাধের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রতারণা, ভুয়া তথ্য প্রচার, ব্ল্যাকমেইলিং, সাইবার বুলিং ইত্যাদি অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক সময় সরলমনা গ্রামীণ মানুষ এই ফাঁদে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।

গ্রামবাংলার সামাজিক পরিবর্তনের যে চিত্র আজ আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা কেবল যুবসমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে নারী সমাজ, পরিবার এবং শিশুদের মধ্যেও। সোশ্যাল মিডিয়া—বিশেষ করে টিকটক, ফেসবুক রিলস বা ইউটিউব শর্টস—গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এমনভাবে প্রবেশ করেছে যে, এটি এখন অনেক ক্ষেত্রে সময়ের অপচয়, কর্মবিমুখতা এবং পারিবারিক দায়িত্বহীনতার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আগে গ্রামাঞ্চলের নারীরা সংসারের কাজ, সন্তান লালন-পালন, সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা এবং উৎপাদনমুখী কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। তাদের এই অবদান ছিল পরিবারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। কিন্তু বর্তমানে এই চিত্র অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তিত হচ্ছে। অনেক মধ্যবয়সি এবং অপেক্ষাকৃত কমবয়সি নারী সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করছেন—কখনো ভিডিও দেখে, আবার কখনো নিজেরাই বিভিন্ন ধরনের ভিডিও তৈরি করে।

এই পরিবর্তনকে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, Talcott Parson পরিবারের মধ্যে নারীর ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার মতে, পরিবারে নারীরা মূলত “expressive role” পালন করেন—অর্থাৎ আবেগ, যত্ন, সামাজিকীকরণ এবং পারিবারিক সংহতি বজায় রাখা তাদের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু যখন এই ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন পরিবার কাঠামোতে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। বর্তমানে অনেক পরিবারে দেখা যাচ্ছে, মায়েরা সন্তানদের পড়াশোনায় আগের মতো মনোযোগ দিতে পারছেন না। শিশুরা মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে, অথচ তাদের দেখভাল করার মতো কেউ নেই। ফলে পড়াশোনায় অমনোযোগ, শৃঙ্খলার অভাব এবং মানসিক বিকাশে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি অদক্ষ এবং অনুৎপাদনশীল প্রজন্ম তৈরি করতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য হুমকি।

এ ছাড়া পারিবারিক সময়ের অপচয় একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আগে যেখানে পরিবারে একসঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা বা সামাজিক আলোচনা হতো, এখন সেই সময়টুকু অনেকেই মোবাইল ফোনে ব্যয় করছেন। এতে করে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে Anthony Giddens আধুনিকতার প্রভাবে পারিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তনের কথা বলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, প্রযুক্তি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার কারণে মানুষ ক্রমশ পরিবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং ব্যক্তিগত আনন্দ ও স্বীকৃতির দিকে বেশি ঝুঁকছে। গ্রামবাংলায় সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

অন্যদিকে অনেক নারী সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য ভিডিও তৈরি করছেন। তারা ‘লাইক’ ও ‘ভিউ’-এর মাধ্যমে এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি পাচ্ছেন, যা তাদের বাস্তব জীবনের দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এতে করে সংসারের কাজ, সন্তানের যত্ন এবং সামাজিক দায়িত্ব অবহেলিত হচ্ছে। এখানে Jean Bauddrillard-এর “Hyperreality” ধারণাটি উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, আধুনিক সমাজে মানুষ বাস্তবতার চেয়ে কৃত্রিম বা ভার্চুয়াল বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। সোশ্যাল মিডিয়ার জগতে মানুষ এক ধরনের কল্পিত জীবন উপস্থাপন করে, যা বাস্তব জীবনের সঙ্গে অনেক সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে তারা বাস্তব দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

গ্রামাঞ্চলের উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যখন পরিবারের নারী সদস্যরা গৃহস্থালি কাজ বা কৃষিকাজে কম সময় দিচ্ছেন, তখন উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে। এটি শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়; বরং সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পড়ছে।

একই সঙ্গে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক ভিডিওতে অশালীনতা, অপ্রয়োজনীয় নাটকীয়তা বা অনুকরণ প্রবণতা দেখা যায়, যা শিশু ও কিশোরদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তারা এগুলো অনুকরণ করতে গিয়ে নিজেরা ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে।

এ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে যে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। একটি সমাজ তখনই টেকসই হয়, যখন তার পরিবার ব্যবস্থা শক্তিশালী থাকে, শিশুদের সঠিকভাবে লালন-পালন করা হয় এবং নারী-পুরুষ উভয়ই উৎপাদনশীল কাজে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু যদি এই তিনটি স্তম্ভই দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সমাজের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। তাই এ সমস্যার সমাধানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এখন প্রশ্ন হলো—এ সমস্যার সমাধান কীভাবে সম্ভব?

প্রথমত সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে সোশ্যাল মিডিয়ার সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের বুঝাতে হবে যে, দ্রুত জনপ্রিয়তা বা অর্থ উপার্জনের চেয়ে টেকসই সাফল্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হবে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, নৈতিক শিক্ষা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এতে করে তরুণরা সঠিক ও ভুলের পার্থক্য বুঝতে পারবে।

তৃতীয়ত কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। যদি যুবসমাজের জন্য পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ থাকে, তাহলে তারা অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট করবে না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে জোর দিতে হবে। 

চতুর্থত আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আপত্তিকর বা ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে এটি করতে হবে এমনভাবে, যাতে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না হয়। 

পঞ্চমত ইতিবাচক কনটেন্ট তৈরিতে উৎসাহ দিতে হবে। শিক্ষামূলক, তথ্যবহুল এবং সৃজনশীল কনটেন্ট বেশি প্রচার পেলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তিত হবে। 

ষষ্ঠত কমিউনিটি ভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। গ্রামের মসজিদ, স্কুল, ক্লাব—এসব প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। এতে করে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ (Social Control) পুনরায় শক্তিশালী হবে। 

সপ্তমত অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি সন্তানের কর্মকাণ্ডের প্রতি সচেতন থাকেন এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দেন, তাহলে অনেক সমস্যাই প্রতিরোধ করা সম্ভব। 

অষ্টমত তরুণদের বিকল্প সৃজনশীল কাজে যুক্ত করতে হবে, যেমন—খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, স্বেচ্ছাসেবা ইত্যাদি। এতে করে তারা ইতিবাচকভাবে সময় ব্যয় করতে পারবে। 

নবমত স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। তারা যদি নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। 

দশমত গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি দায়িত্বশীলভাবে বিষয়টি তুলে ধরে এবং সচেতনতা সৃষ্টি করে, তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে এটি আমাদের পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই এখনই সময়—নিজেদের আচরণ পর্যালোচনা করার, সচেতন হওয়ার এবং একটি সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক জীবন গড়ে তোলার। এ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে সমাজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। প্রথমত এটি একটি কর্মবিমুখ প্রজন্ম তৈরি করছে, যারা বাস্তব জীবনের দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে। দ্বিতীয়ত এটি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। তৃতীয়ত, এটি পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বল করে দিচ্ছে। চতুর্থত এটি অপরাধ বৃদ্ধির একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। তাই এখনই সময় সচেতন হওয়ার, সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার এবং একটি সুস্থ ডিজিটাল সংস্কৃতি গড়ে তোলার।

গ্রামবাংলার সেই সহজ-সরল জীবনযাত্রা, যেখানে মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা, পরিশ্রম এবং মূল্যবোধ ছিল—সেটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নইলে ভার্চুয়াল জগতের মোহে পড়ে আমরা বাস্তব জীবনের ভিত্তিই হারিয়ে ফেলব।

ড. মো. রুহুল আমিন সরকার, অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম