Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

ফিরে এসেছে চাটুকারিতা

Icon

মোবায়েদুর রহমান

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ফিরে এসেছে চাটুকারিতা

আজ ২৪ এপ্রিল, বিএনপি সরকারের বয়স হলো ২ মাস ৮ দিন, অর্থাৎ ৬৮ দিন। ২ মাস ৮ দিন একটি সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা যাচাই করার জন্য যথেষ্ট সময় নয়; কিন্তু তাই বলে ২ মাস বলি, আর ৬৮ দিন বলি, এর মধ্যে সরকার যদি মারাত্মক কোনো ভুল করে থাকে, তাহলে অবশ্যই সেটি পয়েন্ট আউট করা দরকার। সেটি কিন্তু এক মাস, দুই মাস বা তিন মাসের সময়সীমা সামনে রেখে নয়। জাতীয় সংসদ যেটা করতে পারে, দেশের গণমাধ্যম অর্থাৎ টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রও তাই আংশিকভাবে হলেও করতে পারে। আর সেজন্যই সংবাদপত্রকে বলা হতো রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ।

এ প্রসঙ্গে আরও একটি কথা বলে রাখা ভালো। সেই শতবর্ষ পূর্ব থেকে আজ পর্যন্ত দেখা গেছে, রাজা-বাদশাহ বলুন, আর বর্তমান গণতান্ত্রিক জামানায় রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী বলুন, তাদের অনেক সময় পথভ্রষ্ট করে একশ্রেণির চাটুকার। শুধু আমি নই, সচেতন শিক্ষিত সমাজ লক্ষ করছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তারই দলের কিছু লোক চাটুকারিতায় অনেক কিছুই ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। একদিন টেলিভিশনে এমনই একটি দৃশ্য দেখলাম। ১৮ এপ্রিল ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলছেন, ‘মন্ত্রী সাহেব, প্রশংসা একটু কম কইরেন।’ দৈনিক ইত্তেফাকের রিপোর্ট মোতাবেক, শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রশংসামূলক বক্তব্যের মাঝেই তাকে সংযত হতে বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বারবার প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করছিলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী মঞ্চ থেকেই বলেন, ‘মন্ত্রী সাহেব, প্রশংসা একটু কম কইরেন।’ এতে মিলনায়তনে উপস্থিতদের মধ্যে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। এর জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘খুব প্রশংসা করি নাই, যতটুকু আপনি করতেছেন, সামান্যই বলেছি।’

দ্বিতীয় ঘটনাটি ২২ এপ্রিল বুধবারের। সময় টেলিভিশনের অনলাইন খবরের একটি শিরোনাম, ‘দয়া করে আমাকে কেউ মহামান্য বলে ডাকবেন না : প্রধানমন্ত্রী’। খবরে বলা হয়, সংসদে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (২২ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তরপর্বে মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ-সদস্য মো. শওকতুল ইসলামের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর সংসদ-সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে তাকে স্বাগত জানান।

একটি কলেজের ছাত্রও জানে, মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীকে মাননীয় বলা হয়। সংসদের মধ্যে প্রত্যেক সংসদ-সদস্যকেও মাননীয় বলা হয়। মহামান্যরূপে অ্যাড্রেস করা হয় একমাত্র দেশের রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রপ্রধানকে। তবে অতীতে আমরা দেখেছি সুপ্রিমকোর্টে আর্গুমেন্ট করার সময় আইনজীবীরা চিফ জাস্টিস বা জাস্টিসদের মহামান্য আদালত বলে সম্বোধন করছেন। অনেক সময় তাদের My LordshipI বলা হয়। কিন্তু কী পাকিস্তান আমলে, কী ভারতে, এমনকি শেখ মুজিব যখন চরমভাবে একনায়ক ছিলেন, তখনও প্রধানমন্ত্রীকে কোনোদিন মহামান্য বলে অ্যাড্রেস করা হয়নি। তাকে সব সময় মাননীয় বলেই অ্যাড্রেস করা হয়েছে।

২.

তৃতীয় একটি ঘটনা বলছি। এটি একজন প্রতিমন্ত্রীর। নাম মীর শাহে আলম। তিনি স্থানীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রী। জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, প্রথম আলো তার শিরোনাম দিয়েছে এভাবে : “জুলাইয়ের ‘ট্রফি’ বিএনপিকে লন্ডনে দিয়ে আসেন ড. ইউনূস”। তিনি বলেছেন, ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪ তিনটি আন্দোলনের ‘ট্রফি’ই বিএনপির ঘরে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ‘ট্রফি’ লন্ডনে গিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। ‘১৯৭১, ১৯৯০ এবং জুলাই-আগস্ট, তিনটি আন্দোলনের ট্রফিই আমাদের ঘরে, এরকম ট্রফি শুধু বিএনপির ঘরে, অন্য কোনো রাজনৈতিক দল দেখাতে পারবে না। আওয়ামী লীগ একাত্তর ও নব্বইয়ের কথা বলতে পারবে। কিন্তু জুলাই-আগস্টের ট্রফি তাদের নেই। বিরোধী দলের বন্ধুরা জুলাই-আগস্ট বলতে পারবে, কিন্তু একাত্তর ও নব্বইয়ের কথা বলতে পারবে না।’

প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, এনসিপির এক নেতা বাইরে বলেছিলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা খেলেছে, আর ট্রফি নিয়েছে বিএনপি।’ এ সময় বিরোধী দলের সংসদ-সদস্যরা হইচই করতে থাকলে শাহে আলমের বক্তব্য না দেওয়ার অনুরোধ জানান স্পিকার।

এ প্রতিমন্ত্রী ভুলে গেছেন, ১৯৭১ সালে বিএনপি বলে কোনো দলের অস্তিত্ব ছিল না। শহীদ জিয়া এবং বর্তমান স্পিকার মেজর হাফিজ তখন বিএনপির নেতা হিসাবে নয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসার হিসাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। ’৭১ তথা মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতার ট্রফি বিএনপির ঘরে-এ কথা বলে প্রতিমন্ত্রী শুধু নিজের অজ্ঞতাই প্রকাশ করেননি, তিনি বিএনপিকেও খেলো করেছেন। বিরোধীদলীয় নেতা, জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এ সময় প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের কিছু বক্তব্য ‘অসত্য’ দাবি করে তা সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ (এক্সপাঞ্জ) দেওয়ার আহ্বান জানান। এ সময় বিরোধী দলের সংসদ-সদস্যরা আরও হইচই করতে থাকলে শাহে আলমকে বক্তব্য না দেওয়ার অনুরোধ জানান স্পিকার।

এ পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্র-জনতার সঙ্গে আমরা সবাই ছিলাম। ট্রফি আমরা কারও কাছে নিতে যাইনি। ক্যাপ্টেন কে? সেটা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন। এ কারণে উনি লন্ডনে গিয়ে আমাদের ক্যাপ্টেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে ট্রফি দিয়ে নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আসেন। এতে প্রমাণিত হয়, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের নেতৃত্বে মূল ভূমিকা কোন দলের ছিল, কোন নেতার ছিল।’

মুক্তিযুদ্ধের ক্যাপ্টেন হিসাবে তারেক রহমানকে স্বীকৃতি দিতে ড. ইউনূস লন্ডন গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে ইলেকশনের তারিখ নিয়ে ফিরে এসেছেন, এসব কথা বলে প্রতিমন্ত্রী কী বোঝাতে চাচ্ছেন? ড. ইউনূস কি ১৮ মাসের মধ্যে কোনোদিন তারেক রহমানকে জুলাই যুদ্ধের ক্যাপ্টেন বলেছেন? নাকি তারেক রহমান নিজে কোনোদিন এ ধরনের ক্লেইম করেছেন? একজন প্রতিমন্ত্রীর মুখে এসব কথা মানায় না। কারণ, এসব করলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে।

প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের বক্তব্য প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, ‘আজকে মাননীয় সংসদ-সদস্য (মীর শাহে আলম) রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে আমাদের জেরবার করে ফেলেছেন। অসংখ্য অসত্য তথ্য এখানে এসেছে। দু-একটার প্রতিবাদ আপনি (স্পিকার) নিজেও করেছেন। আমাদের দাবি, অসত্য কোনো তথ্য যাতে সংসদে কেউ পরিবেশন না করেন।’

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের কিছু অংশ শফিকুর রহমান কার্যপ্রণালি থেকে বাদ দেওয়ার আহ্বান জানালে স্পিকার বলেন, ‘আমি বক্তব্য পরীক্ষা করে দেখব। সেখানে কোনো অসংসদীয় এবং অসত্য তথ্য থাকলে এক্সপাঞ্জ করা হবে।’

৩.

একই খবর ছাপা হয়েছে ডেইলি স্টারে। খবরটি শিরোনাম, ‘BNP holds legacy of 1971, '90 '24'. খবরে বলা হয়েছে, ‘‘Chief adviser of the immediate past interim government, Prof Muhammad Yunus had travelled to London to hand over the 'trophy' of the 2024 July-August movement to Tarique Rahman and return with an election date, State Minister for LGRD Mir Shahe Alam said yesterday.

The state minister pointed to the presence of freedom fighters on the treasury benches and claimed none were on the opposition side, prompting renewed protests.

The speaker responded by noting that freedom fighters were also present on the opposition benches, citing Gazi Nazrul Islam as an example.” অর্থাৎ, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস জুলাই বিপ্লবের ট্রফি দেওয়ার জন্য লন্ডনে তারেক রহমানের কাছে গিয়েছিলেন এবং ফিরেছেন ইলেকশনের একটি তারিখ নিয়ে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারি দলে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছে; কিন্তু বিরোধী দলে একজনও নেই।

এ পর্যায়ে স্বয়ং স্পিকার বলেন, বিরোধী দলেও মুক্তিযোদ্ধা আছে। ওই যে দেখুন সাতক্ষীরার গাজী নজরুল ইসলাম একটি উদাহরণ।

‘Some of these you yourself corrected. We demand that no false information be presented in parliament. We demand expunging of false information,' he added, addressing the speaker.

In response, the speaker said: 'I will examine the speech. If there is any unparliamentary or false information, it will be expunged.’ অর্থাৎ, বিরোধী দল দাবি করে, অসংখ্য ভুল তথ্য সন্নিবেশিত প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হোক। জবাবে স্পিকার বলেন, আমি তার বক্তৃতা পরীক্ষা করব। সেখানে যদি কোনো মিথ্যা তথ্য থাকে অথবা কোনো অসংসদীয় ভাষা থাকে, তাহলে সেটি আমি কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেব।

একই খবর প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজি দৈনিক ‘নিউএজে’। খবরে বলা হয়েছে, “Referring to a statement by a National Citizen Party leader, the minister said that it had been claimed that students and the public led the July movement but the BNP took the 'trophy.” অর্থাৎ, এনসিপি নেতার বক্তব্যের জবাবে এ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ছাত্র এবং জনতা জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে; কিন্তু ট্রফিটি উঠেছে বিএনপির ঘরে। মন্ত্রীর এ বাক্যেই রয়েছে স্ববিরোধিতা।

গত ১৯ এপ্রিল ইংরেজি দৈনিক নিউএজের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। খবরের শিরোনাম, ‘Sycophancy resurfaces in JS’. অর্থাৎ, জাতীয় সংসদে চাটুকারিতা আবারও শুরু। খবরে বলা হয়েছে, ‘অতীতের পার্লামেন্টের মতো বর্তমান জাতীয় সংসদেও চাটুকারিতার পুনরাবির্ভাব ঘটেছে। এটি দেখা গেল প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জ্ঞাপক বক্তৃতা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মানার্থে কবিতা আবৃত্তি। চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি প্রধানমন্ত্রীর সম্মানার্থে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন, যদিও ওই কবিতাটির রচয়িতা কে, সেটি তিনি উল্লেখ করেননি। উল্লেখ্য, বিতাড়িত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মানেও সংসদে কবিতা আবৃত্তি করা হয় এবং গান গাওয়া হয়।

গাজীপুর-১-এর সংসদ-সদস্য মুজিবুর রহমান দাবি করেন, তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা খেতাব দেওয়া হোক। এ ব্যাপারে এটুকু বলাই যথেষ্ট, যার পিতা মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতি এবং যার মাতা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং যিনি নিজে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী (তারেক রহমান), তার কি নতুন করে শিশু মুক্তিযোদ্ধার খেতাবের প্রয়োজন আছে?

মোবায়েদুর রহমান : সিনিয়র সাংবাদিক

journalist15@gmail.com

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম