Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

নিউইয়র্কের চিঠি

কনসেনট্রেশন ক্যাম্প অথবা অভিবাসী আটককেন্দ্র

Icon

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কনসেনট্রেশন ক্যাম্প অথবা অভিবাসী আটককেন্দ্র

অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি। সংগৃহীত ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশকারী অবৈধ অভিবাসী মা-বাবার কাছ থেকে তাদের শিশু সন্তানদের বিচ্ছিন্ন করার কৌশল অবলম্বন করে অবৈধ অভিবাসন বন্ধ, হ্রাস ও নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগের অংশ হিসাবে যেসব শিশুকে পৃথক করা হয়েছিল, তারা হয়তো আর কখনো তাদের বৈধ অভিভাবকের সঙ্গে মিলিত হতে পারবে না।

বিভিন্ন আমেরিকান মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, এ ধরনের বিচ্ছিন্ন শিশুর সংখ্যা ১,০০০ থেকে ১,৩৬০ হতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়ে এসব শিশুকে তাদের মা-বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ওইসব মা-বাবাকে সন্তানদের ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করে তাদের নিজ নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আন্দোলন এবং তাদের পক্ষ থেকে মামলা করার পর কিছু শিশুকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলেও বিচ্ছিন্ন করে ফেলা অধিকাংশ শিশু এখনো যুক্তরাষ্ট্রে আটক রয়েছে। অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির এ ধরনের অমানবিক ও বিতর্কিত উদ্যোগের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও মামলার রায়ের কারণে নতুন করে শিশু বিচ্ছিন্ন করার কৌশল স্থগিত রাখা হলেও ইতঃপূর্বে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের ভাগ্যে কী ঘটবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তাছাড়া এমন প্রশ্নও উঠেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের আটক রাখার ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে ডিটেনশন সেন্টার অথবা শাস্তি প্রদানের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প।

শিশুদের তাদের মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার কিছু ঘটনা এতটাই অমানবিক ছিল যে, সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর পরিবারগুলো বৈধ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী সন্তান, যাদের মধ্যে অনেক শিশু, এমনকি দুগ্ধপোষ্য ছিল, তাদেরও বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল। তাদের বেশিরভাগ অভিভাবকের বিচার হয়েছে, ফেডারেল কারাগারে আটক রাখা হয়েছে অথবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের সন্তানদের প্রাথমিকভাবে ন্যস্ত করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের তত্ত্বাবধানে।

শিশুদের স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করার আগে কিছুসংখ্যক শিশুকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত মানবেতর জীবন কাটাতে হয়েছে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলোতে; যেখানে তাদের ন্যূনতম খাদ্য পরিবেশন করা হয়েছে। তাদের পরিচ্ছন্ন জামা-কাপড় সরবরাহ করা হয়নি; গোসলের সুবিধা এবং তাদের দেখাশোনার জন্য কোনো বয়স্ক কেয়ারটেকার নিয়োজিত ছিল না। ১০ বছর বয়সি আটক অভিবাসী মেয়েরা তাদের চেয়ে বয়সে ছোট শিশুদের দেখভাল করত বলে অভিযোগ রয়েছে। ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন ল’ সেন্টার ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসী পরিবার থেকে শিশুদের বিচ্ছিন্ন করার নীতিকে যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপত্তার আশায়, এমনকি জীবন বাঁচাতে আগত ‘শিশুদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র অনুমোদিত সহিংসতা’র শামিল বলে বর্ণনা করেছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর রিপোর্ট এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, অবৈধ অভিবাসীদের কাছ থেকে তাদের সন্তানদের বিচ্ছিন্ন করার কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের সামারে। তখনো ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণার আগেই পরিবার থেকে শিশু বিচ্ছিন্ন করা শুরু হয়েছিল।

২০১৮ সালের শুরুর দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ নীতি ঘোষণার পর তা পুরো যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তজুড়ে কার্যকর করা হয়। ২০১৯ সালের শেষাবধি দুধের শিশুসহ সাড়ে ৫ হাজারের বেশি শিশুকে তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। বিচ্ছিন্ন শিশুদের সমস্যা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়, যখন অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট হয় যে, তাদের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে বিচ্ছিন্ন শিশুদের নিজ পরিবারের সঙ্গে আবারও মিলিত করার কোনো ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

আমেরিকান ‘অফিস অফ রিফিউজি রিসেটেলমেন্টের’ পরিচালক স্কট লয়েড তার অফিসকে নির্দেশ দিয়েছিলেন অভিভাবকদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা শিশুদের একটি তালিকা সংরক্ষণ করতে। প্রতিষ্ঠানটি ট্রাম্প প্রশাসনকে জানিয়েছিল, তারা এ নীতিকে সমর্থন করেনি। কারণ মা-বাবার কাছ থেকে শিশুসন্তানদের বিচ্ছিন্ন করার ফলে সংশ্লিষ্ট শিশুদের প্রচণ্ড মানসিক আঘাতের ঝুঁকি থাকবে এবং বিচ্ছিন্ন করার পরিণতি অনেক শিশুকে জীবনভর ভুগতে হবে।

অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের দায়িত্বে নিয়োজিত অভিবাসন বিভাগের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইস) প্রধান ম্যাথু অ্যালবেন্স তার সহকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, অভিভাবকরা যদি বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচ্ছিন্নকৃত শিশুদের পরিবারের আদেশ লাভ করে, অনুরূপ ক্ষেত্রে পরিবারের পুনর্মিলন ঠেকাতে হবে। তা না হলে অবৈধ অভিবাসী আগমন প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে গৃহীত ‘জিরো টলারেন্সের’ পুরো উদ্যোগ অর্থহীন হয়ে পড়বে।

আমেরিকান অভিবাসন কর্তৃপক্ষের মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা শুরু হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে স্বাক্ষরিত এক নির্বাহী আদেশে সীমান্তে পরিবার বিচ্ছিন্নকরণ কর্মসূচির অবসান ঘোষণা করার পর ড্যানা সাবরো নামে ইউএস ডিস্ট্রিক্ট আদালতের এক বিচারক অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের বিচ্ছিন্ন করার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং আমেরিকাজুড়ে প্রয়োগযোগ্য এক আদেশে বিচ্ছিন্নকৃত সব শিশুকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে পুনর্মিলিত করার আদেশ দেন।

কিন্তু বিস্ময় ও দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, আদালতের আদেশের পর হাজার হাজার অভিবাসী পরিবারের সঙ্গে তাদের বিচ্ছিন্ন সন্তানদের পুনর্মিলিত করার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ফেডারেল সরকারের কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ ঘেঁটে সমন্বিত তথ্যের ভিত্তিতে মাত্র ৬০টি শিশুকে তাদের প্রকৃত মা-বাবার কাছে ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়। একপর্যায়ে ট্রাম্প প্রশাসন পরিবার পুনর্মিলনের উদ্যোগে অর্থ জোগান দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

এ পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসে বেশকিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, যারা পরিবার পুনর্মিলিত করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখে। যেসব আইনজীবী তাদের সঙ্গে কাজ করছিলেন ২০২০ সালে, তারা জানান, ৬৬৬টি শিশুর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

২০২৪ সালের মার্চে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন তাদের রিপোর্টে প্রকাশ করে-যেসব শিশুকে তাদের অবৈধ অভিবাসী পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ২,০০০ শিশুর কোনো হদিস নেই। গত বছরের অক্টোবরের অভিবাসন বিভাগের এক পর্যালোচনা অনুযায়ী, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের অনেককে পরিবার ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারী হিসাবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে তাদের পরিবারের সঙ্গে আবারও মিলিত হওয়ার সম্ভাবনা সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে যেসব শিশুকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, তাদের বয়স বেড়েছে। ৫ বছরের শিশুর বয়স ১৫ বা ১৩ বছরে উন্নীত হয়েছে। ১০ বছর বয়সি শিশু উন্নীত হয়েছে ২০ বা ১৮ বছরে।

প্রাপ্তবয়স্কদের ‘আইসের’ ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছে অথবা জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিছু শিশুকে তাদের উৎস দেশে অভিভাবকদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের দায়ের করা আইনি প্রক্রিয়ার ফলে। তা সত্ত্বেও মানবাধিকার প্রবক্তারা আশঙ্কা করছেন, বিচ্ছিন্ন শিশুরা অনির্দিষ্টকাল ধরে বিচ্ছিন্ন থাকলে সরকার একপর্যায়ে শিশু ও তাদের পরিবারের মধ্যে যোগসূত্রগুলো হারিয়ে আরও জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের নিয়মিত ভিত্তিতে বিচ্ছিন্ন করার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল না। আগের প্রশাসনগুলোর সময়ের দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যায়, তাদের সময়ে অবৈধ অভিবাসী পরিবারগুলোকে আটককেন্দ্রে সন্তানসহ একত্রে রাখার ব্যবস্থা করা হতো, যাতে অভিবাসন আদালত কর্তৃক চূড়ান্ত বহিষ্কারাদেশ জারির আগপর্যন্ত পরিবার এক থাকে এবং কোনোভাবে, এমনকি আটককেন্দ্রে দুর্ঘটনাবশতও কোনো শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে পড়ে।

আদালত যদি কোনো কারণে শুনানি স্থগিত রাখে, সেক্ষেত্রে পরিবারকে জামিন দেওয়া হলেও পরবর্তী শুনানিতে শিশুসহ পরিবারের সব সদস্যের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করার শর্তও জামিনে অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিছু ক্ষেত্রে আগের প্রশাসনগুলোও যে ব্যতিক্রম ঘটায়নি তা নয়। সীমান্ত প্রহরায় নিয়োজিত এজেন্সি অথবা ইমিগ্রেশনে কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট এজেন্টদের যদি শিশুসহ কোনো পরিবারের ওপর মানব পাচারের সন্দেহের সৃষ্টি হয় অথবা এমন সন্দেহের কারণ ঘটে যে, কোনো পরিবার তাদের সঙ্গে থাকা শিশুকে নিজের সন্তান দাবি করে প্রতারণামূলক উপায়ে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার চেষ্টা করছে, সেক্ষেত্রে তারা শিশুকে সন্দেহভাজন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে। তবে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা নগণ্য। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ইতিহাসে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানদের বিচ্ছিন্ন করার ঘটনা কলঙ্কজনক এক অধ্যায় হিসাবে থাকবে।

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক ও অনুবাদক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম